গিয়োম লং ।। ৮০ বছর বয়সে এক অসাধারণ রাজনৈতিক জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। প্রথম দফার ভোটে সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারোর কাছে ৪৭ শতাংশের বিপরীতে ৪৫ শতাংশ ভোট পেয়ে পিছিয়ে পড়েছিলেন লুলা। কিন্তু সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে দ্বিতীয় দফায় ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে জয় নিশ্চিত করেছেন তিনি। ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ ভোট।
নির্বাচনের আগে পরিচালিত প্রায় সব জনমত জরিপের পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণ করে লুলার এই জয়। প্রচারণার শেষ পর্যায়ে তাঁর যে নাটকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটেছে, তা আগে খুব কম মানুষই ধারণা করতে পেরেছিলেন।
লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলে লুলার এই জয় শুধু উগ্র ডানপন্থীদের ক্ষমতায় ফেরার পথই রুদ্ধ করেনি, বরং গোটা অঞ্চলে ডানপন্থীদের ধারাবাহিক নির্বাচনী সাফল্যের গতিতেও আঘাত হেনেছে। একই সঙ্গে পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপমূলক রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক নীতির জন্যও এটি বড় ধাক্কা।
প্রথম দফার ভোটে ফ্লাভিও বলসোনারো অপ্রত্যাশিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার পর ব্রাজিলসহ আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সরকারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাফল্যের পরও এমন ফলাফল ছিল বিশেষভাবে বিস্ময়কর। এরপরের তিন সপ্তাহে রাজনীতির দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যায়। লুলার ওয়ার্কার্স পার্টির প্রথম দফার নিষ্প্রভ প্রচারণা নতুন গতি পায়। নির্বাচনী লড়াই রূপ নেয় ব্রাজিলের গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতে।
সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্যও নির্বাচনে পরাজয়ের অনিবার্য কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছিল না। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ব্রাজিলের অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে ৯ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিবেশী দেশগুলোর গড় প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২২ সালে দেশটির বেকারত্বের হার ছিল ৯ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা নেমে আসে ৫ দশমিক ৪ শতাংশে, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বনিম্ন।
২০২৫ সালে ব্রাজিল জাতিসংঘের ক্ষুধাপীড়িত দেশের তালিকা থেকেও বেরিয়ে আসে। জইর বলসোনারোর শাসনামলে দেশটি আবারও ওই তালিকায় ফিরে গিয়েছিল। আমাজন অঞ্চলেও বন উজাড়ের হার কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। আগের সরকারের সময়ে যে প্রবণতা বাড়ছিল, লুলার শাসনামলে তা উল্টো দিকে মোড় নেয়।
তবে লুলা সরকারের সব অর্জনের আড়ালে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সংকট চাপা পড়েনি। বিপুলসংখ্যক ব্রাজিলীয় ক্রেডিট কার্ডের ঋণে জর্জরিত। উচ্চ সুদের কারণে ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে তাঁদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর সঙ্গে অনলাইন জুয়ার ব্যাপক বিস্তার বহু পরিবারের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল করে দিয়েছে। দ্বিতীয় দফার নির্বাচনী ফলাফলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সরকারের প্রতি মানুষের একাংশের অসন্তোষও কম নয়।
এই পরিস্থিতিতে লুলা বেশ কিছু সাহসী পদক্ষেপ নেন। ঋণের বোঝা কমাতে ব্যাপক কর্মসূচি, অনলাইন বেটিংয়ে বিধিনিষেধ, সামাজিক সুবিধা সম্প্রসারণ ও জ্বালানি ভর্তুকির পাশাপাশি সপ্তাহে ছয় দিনের কর্মব্যবস্থার পরিবর্তে পাঁচ দিনের কর্মসপ্তাহ চালুর উদ্যোগ নেন তিনি। এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য ছিল সামষ্টিক অর্থনীতির সাফল্যকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করা।
অন্যদিকে ফ্লাভিও বলসোনারো ব্রাজিলের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। সরকারি ব্যয় ব্যাপকভাবে কমানো, রাষ্ট্রীয় সম্পদ বেসরকারীকরণ এবং কর হ্রাসের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। তবে তাঁর প্রচারণার সবচেয়ে জোরালো বিষয় ছিল অপরাধ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কঠোর অবস্থান।
এল সালভাদরের কুখ্যাত কারাগারব্যবস্থার আদলে পাঁচটি সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগার নির্মাণ এবং ভারী অস্ত্রে সজ্জিত অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাবও দেন ফ্লাভিও।
তাঁর আরেকটি বিতর্কিত প্রতিশ্রুতি ছিল, ২০২২ সালের নির্বাচনের ফল উল্টে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের দায়ে ২৭ বছরের কারাদণ্ড পাওয়া নিজের বাবা জইর বলসোনারোকে ক্ষমা করে দেওয়া। ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর হামলার ঘটনায় দণ্ডিত ব্যক্তিদেরও ক্ষমা করার কথা বলেন তিনি।
ফ্লাভিওর সমর্থকদের কাছে এসব প্রতিশ্রুতি ছিল তাঁদের ভাষায় বিচারিক নিপীড়নের অবসান ঘটানোর সুযোগ। কিন্তু বিরোধীদের চোখে এটি ছিল অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টাকে বৈধতা দেওয়ার এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে দুর্বল করার বিপজ্জনক উদ্যোগ।
এমন পরিস্থিতিতে লুলার প্রচারণা নতুন উদ্দীপনা ফিরে পায়। বিশেষ করে তরুণ ব্রাজিলীয়দের একটি বড় অংশ তৃণমূল পর্যায়ে প্রচারণায় যুক্ত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমেও বলসোনারোর প্রতি সুবিধাজনক প্রবণতা ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। তারপরও মেটার মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্ল্যাটফর্মে বিদ্যমান সেই প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে লুলার সমর্থকেরা নিজেদের বার্তা ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন।
শেষ পর্যন্ত নির্বাচনটি শুধু ব্রাজিলের গণতন্ত্রের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর কেন্দ্রে চলে আসে দেশটির জাতীয় সার্বভৌমত্বও।
লুলার পুরো শাসনামলজুড়েই ট্রাম্প প্রশাসন ব্রাজিলের রাজনীতিতে দৃশ্যমানভাবে হস্তক্ষেপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলের পণ্যের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করেছে, জইর বলসোনারোর বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারকের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে এবং প্রকাশ্যেই ফ্লাভিওর প্রার্থিতার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
মে মাসে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে ফ্লাভিও বলসোনারোকে স্বাগত জানান। এর মাত্র দুই দিন পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ব্রাজিলের বৃহত্তম দুটি অপরাধী সংগঠনকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেন। ফ্লাভিও প্রকাশ্যে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এই সিদ্ধান্তের প্রভাব নির্বাচনী রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত হতে থাকা তথাকথিত ‘নার্কোটেররিজমবিরোধী’ অভিযানের আওতায় ব্রাজিলের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক অভিযান চালানোর পথও এতে তৈরি হতে পারে।
বিশ্ব ইতিমধ্যে দেখেছে, কোনো সংগঠন বা গোষ্ঠীকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার সিদ্ধান্ত কীভাবে সামরিক হস্তক্ষেপের যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ এবং দেশটির ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় এ ধরনের পদক্ষেপের পরিণতি সামনে এসেছে।
ট্রাম্প যেখানে লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশকে ওয়াশিংটনের ক্রমবর্ধমান সামরিক আধিপত্যের কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে চান, সেখানে লুলা ব্রাজিলের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন রক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, সংগঠিত অপরাধ দমনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন, তবে তা অবশ্যই জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
লুলা এবারের নির্বাচনকে এমন এক লড়াই হিসেবে তুলে ধরেছেন, যেখানে একদিকে রয়েছে নিজস্ব পথ বেছে নেওয়া স্বাধীন ও সার্বভৌম ব্রাজিল, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের ভূরাজনৈতিক এজেন্ডার অধীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা। নির্বাচনের ফল বলছে, ব্রাজিলের জনগণ নিজেদের পছন্দ জানিয়ে দিয়েছেন।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লুলার এই জয় লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে ডানপন্থীদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের গতিপথ বদলে দিতে পারে। ট্রাম্প দ্বিতীয়বার হোয়াইট হাউসে ফেরার পর হন্ডুরাস, চিলি ও বলিভিয়াসহ কয়েকটি দেশে ডানপন্থীরা নির্বাচনী সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু ব্রাজিলে লুলার পুনর্নির্বাচিত হওয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই ধারার গতি হয়তো কমতে শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগে ব্রাজিলের এই ফল ট্রাম্পের নেতৃত্ব ও আঞ্চলিক প্রভাবের জন্যও উল্লেখযোগ্য ধাক্কা হয়ে উঠতে পারে। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই নিয়মিত লুলার সমালোচনা করেন এবং বলসোনারোর পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে তাঁর জনসমর্থন কমছে বলে বিভিন্ন জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। চিলির প্রেসিডেন্ট হোসে আন্তোনিও কাস্তের জনসমর্থনও আরও দ্রুত হ্রাস পেয়েছে।
অন্যদিকে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শিনবাউমের জন্য লুলার জয় স্বস্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। ব্রাজিলে লুলা হেরে গেলে এমন এক অঞ্চলে শিনবাউম ক্রমেই একা হয়ে পড়তেন, যেখানে অনেক দেশই উত্তরের প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকছিল। কিন্তু বর্তমান ফলাফলে লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে জনবহুল দুটি দেশ এবং বৃহত্তম দুই অর্থনীতির একটি করে নেতৃত্ব বামপন্থীদের হাতেই থাকছে।
অবশ্য এই ফলের ভিত্তিতে লাতিন আমেরিকায় ডানপন্থীদের উত্থান শেষ হয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি। তবে লুলার জয় অন্তত এই সম্ভাবনা তৈরি করেছে যে ডানপন্থী ঢেউটি হয়তো ইতিমধ্যে সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছে গেছে এবং এখন তার গতি কমতে পারে।
ব্রাজিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ‘শিল্ড অব দ্য আমেরিকাস’ উদ্যোগে যোগ দেবে না। ট্রাম্পের কথিত ‘ডনরো ডকট্রিন’ এখনো লাতিন আমেরিকার জন্য হুমকি হয়ে রয়েছে। কিন্তু এই অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্য বিস্তারের সেই নীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী সময় হয়তো পেছনে পড়ে যাচ্ছে।
লুলার এই জয় শুধু একটি নির্বাচনী সাফল্য নয়। সমাজের প্রান্তিক, বঞ্চিত ও অধিকারহীন মানুষের পক্ষে আজীবন লড়াই করে যাওয়া এক রাজনীতিকের দীর্ঘ সংগ্রামের স্বীকৃতিও এটি। আর এই জয়ের তাৎপর্য ব্রাজিলের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত।
গণতন্ত্র, বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের পক্ষে যাঁরা দাঁড়ান, তাঁদের জন্য লুলার জয় একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করছে। উগ্র ডানপন্থীদের অগ্রযাত্রা অনিবার্য নয়, আবার তা অপরিবর্তনীয়ও নয়।
ব্রাজিলে নয়, পৃথিবীর কোথাও নয়।



