প্যাট্রিক গাথারা ।।
ক্রীড়া তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে সম্প্রতি একটি মিমকে কেন্দ্র করে বিতর্কে জড়িয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে তাঁর মুখের সঙ্গে চীনের সাবেক নেতা মাও সে তুংয়ের মুখ জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। ছবিটি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এমবাপ্পে মাওকে একজন স্বৈরশাসক হিসেবে বিবেচনা করেন বলে মন্তব্য করেন। যদিও তিনি সরাসরি মাওয়ের নাম উল্লেখ করেননি।
তাঁর এই অনানুষ্ঠানিক মন্তব্যই দ্রুত আন্তর্জাতিক বিতর্কের জন্ম দেয়। চীনা পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানগুলো সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন লা লিগার সম্প্রচার স্থগিত করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এমবাপ্পে ও তাঁর ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ ক্ষমা চায়। একই সঙ্গে লা লিগাও এই মন্তব্যে যে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সে জন্য দুঃখ প্রকাশ করে।
এমবাপ্পে মূলত তাঁর ক্লাব ও সতীর্থদের ওপর নিজের ব্যাপক প্রভাব নিয়ে প্রচলিত রসিকতার ধারাবাহিকতায় কথাটি বলেছিলেন। চীনের ইতিহাস নিয়ে তিনি কোনো গবেষণাভিত্তিক বা সুপরিকল্পিত মূল্যায়ন দিতে বসেননি। অথচ তাঁর একটি সাধারণ মন্তব্যকে এমনভাবে দেখা হলো, যেন সেটি একটি পুরো জাতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার নামে ক্রীড়াবিদদের কীভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়, এমবাপ্পেই প্রথম সেই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হননি। প্রায় এক দশক আগে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল তারকা কলিন ক্যাপারনিক বর্ণবৈষম্য ও কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর পুলিশের প্রাণঘাতী সহিংসতার প্রতিবাদে জাতীয় সংগীত চলাকালে হাঁটু গেড়ে বসেছিলেন। এর পরিণতিতে তাঁকে কার্যত জাতীয় ফুটবল লিগ (এনএফএল) থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়।
গত মে মাসে স্পেনের ফুটবলার লামিনে ইয়ামাল বার্সেলোনার শিরোপা উদ্যাপনের সময় ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়ান। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ তোলেন এবং ক্লাবকে ওই ঘটনার সঙ্গে নিজেদের দূরত্ব স্পষ্ট করার দাবি জানান।
ক্যাপারনিক ও ইয়ামাল সচেতনভাবেই নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করেছিলেন। অন্যদিকে এমবাপ্পের মন্তব্য ছিল নিছক রসিকতা। কিন্তু এই পার্থক্যও তাঁকে বিতর্কের চাপ থেকে রক্ষা করতে পারেনি। অর্থাৎ, একজন ক্রীড়াবিদকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। কখনো কখনো অনিচ্ছাকৃত একটি মন্তব্যের কারণেও তাঁকে বুঝতে হয়, তাঁর কথাবার্তার ওপর কতটা কঠোর নজরদারি রয়েছে।
এমবাপ্পের বিপুল জনপ্রিয়তা তাঁকে সামাজিক প্রভাবের অধিকারী করেছে। একই সঙ্গে এই জনপ্রিয়তা তাঁকে বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত মূল্যবান করে তুলেছে। কিন্তু যে বাণিজ্যিক সম্পর্কগুলো তাঁকে এতটা মূল্যবান করে তুলেছে, সেগুলোই আবার তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
এই প্রবণতার শিকড় অবশ্য অনেক পুরোনো। প্রাচীন গ্রিসে বিজয়ী ক্রীড়াবিদেরা নিজ নিজ নগররাষ্ট্র থেকে বিপুল পুরস্কার পেতেন। তাঁদের জন্য অর্থ, রাষ্ট্রীয় খরচে খাবারের ব্যবস্থা এবং নাগরিক সম্মাননার মতো সুযোগ থাকত। খেলাধুলায় সাফল্য তাঁদের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের পথও খুলে দিত। একজন ক্রীড়াবিদের অর্জন তাঁর নিজের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নগরীর মর্যাদাও বাড়িয়ে দিত।
কিন্তু এই স্বীকৃতির মধ্যেই কখনো কখনো মালিকানার মনোভাব তৈরি হতো। প্রাচীন গ্রিক ভূগোলবিদ ও লেখক পসানিয়াসের বর্ণনা অনুযায়ী, অ্যাস্টিলাস নামের এক দৌড়বিদ প্রথমে ক্রোটনের প্রতিনিধিত্ব করতেন। পরে অলিম্পিক গেমসে অংশ নিতে গিয়ে নিজেকে সিরাকিউজের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর সাবেক নগরবাসীরা তাঁর মূর্তি ভেঙে ফেলেন এবং বাড়িটিকে কারাগারে রূপান্তর করেন।
আজকের ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও একই ধরনের অধিকারবোধ দেখা যায়। যাঁদের সাফল্যকে পুঁজি করে তারা নিজেদের পরিচিতি ও ব্যবসা সম্প্রসারণ করে, তাঁদের ওপরই নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। একজন ক্রীড়াবিদকে বলা হয়, তিনি দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, ক্লাবের পরিচয় বহন করেন, পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটান। এসব সম্পর্কের প্রতিটিই একসময় তাঁর স্বাধীনভাবে কথা বলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হোসে মরিনিও একবার বলেছিলেন, ‘অনেক সময় সবচেয়ে ভালো কাজ হলো মুখ বন্ধ রাখা। কারণ, আপনি যা বলেন বা মন্তব্য করেন, তার প্রায় সবকিছুতেই বিপদের আশঙ্কা থাকে।’
কোনো একটি মন্তব্য যদি বড় কোনো বাজারে প্রবেশের সুযোগ ঝুঁকির মুখে ফেলে, তখন ক্লাব ও লিগ কর্তৃপক্ষের আর্থিক স্বার্থও সেই মন্তব্যকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার পক্ষে কাজ করতে পারে। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বক্তব্য প্রত্যাহার বা ক্ষমা চাইতে বাধ্য করার চাপ তৈরি হয়।
যখন কোনো রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম একটি পুরো লিগের সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়, তখন এর শাস্তি শুধু সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়ের ওপর পড়ে না। ক্ষতিগ্রস্ত হন হাজারো খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও দর্শক, যাঁদের সঙ্গে ওই মন্তব্যের কোনো সম্পর্কই নেই। কার্যত একজন ব্যক্তির ক্ষমা চাওয়াকে কেন্দ্র করে বাকিদেরও জিম্মি করা হয়। এভাবেই বাণিজ্যিক ও বাজারভিত্তিক ক্ষমতা ব্যবহার করে সবাইকে একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে থাকতে বাধ্য করা হয়।
তারকাখ্যাতির এই বাস্তবতায় বড় ধরনের বৈপরীত্য রয়েছে। ক্রীড়াবাণিজ্য মানুষের কাছে সাহস, স্বকীয়তা ও ব্যক্তিত্বের গল্প বিক্রি করে। দর্শকদের উৎসাহিত করা হয় খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিগত সত্তার সঙ্গেও একাত্ম হতে। অথচ সেই ব্যক্তিত্বের প্রকাশই যখন ব্যবসায়িক স্বার্থের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেটিকে সমস্যা হিসেবে দেখা হয়।
একজন ক্রীড়াবিদকে নিজের মতো করে প্রকাশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে সেই প্রকাশ অবশ্যই কর্তৃপক্ষের অনুমোদনসাপেক্ষ।
দর্শকদের প্রত্যাশাও এই চাপকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এখন আমরা ক্রীড়া তারকাদের কাছে নানা নৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে অবস্থান আশা করি। তাঁরা কথা বললে যেমন বিচার করি, তেমনি নীরব থাকলেও প্রশ্ন তুলি। জনপ্রিয়তার সঙ্গে কিছু সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি হয়, এটি সত্য। কিন্তু খেলাধুলায় অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করলেই কেউ রাজনৈতিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে যান না। জনপ্রিয়তা থাকাও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার নিশ্চয়তা দেয় না।
আমরা যদি ক্রীড়াবিদদের কাছ থেকে সাহসী ভূমিকা প্রত্যাশা করি, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকেও নজর দিতে হবে, যেগুলো তাঁদের জন্য সাহসের প্রকাশকে পেশাগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
এমবাপ্পের ঘটনাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তিনি কোনো বীরত্বপূর্ণ প্রতিবাদ করতে যাননি। তাঁর মন্তব্যও ছিল না কোনো সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক অবস্থান। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেবল তাঁদের জন্য সংরক্ষিত থাকতে পারে না, যাঁরা ইতিহাস সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন, নিখুঁত ভাষায় কথা বলেন কিংবা সচেতনভাবে প্রতিবাদে শামিল হন। এই স্বাধীনতার পরিসরে একজন মানুষের অনিশ্চিত মন্তব্য কিংবা বোকামিপূর্ণ রসিকতারও জায়গা থাকতে হবে। একইভাবে জায়গা থাকতে হবে সুপরিকল্পিত প্রতিবাদের।
তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকা নয়। দর্শক-সমর্থকেরা কোনো বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন, জোরালো সমালোচনাও করতে পারেন। আপত্তিকর বক্তব্যের জন্য ক্রীড়াবিদদেরও জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু সেই বিচারের মাপকাঠি হওয়া উচিত কোনো মন্তব্য মানুষের ক্ষতি করছে কি না। কোনো রাষ্ট্র বিব্রত হচ্ছে কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাব-নিকাশে প্রভাব পড়ছে কি না, সেটি নয়।
খেলাধুলাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে বা নিরপেক্ষ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা অনেক সময় এই নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে আড়াল করে রাখে। অথচ ক্রীড়া আয়োজনের পতাকা, জাতীয় সংগীত কিংবা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, সবকিছুর মধ্যেই রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। কিন্তু কোনো ক্রীড়াবিদ যখন নিজের স্বাধীন চিন্তা ও অবস্থান প্রকাশ করেন, তখন তা অনুমোদিত রাজনৈতিক বার্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলেই তাঁর নীরবতা কামনা করা হয়।
একজন চ্যাম্পিয়ন তাঁর কৃতিত্ব দিয়ে একটি সম্প্রদায়, দেশ কিংবা নগরীর সম্মান বাড়াতে পারেন। কিন্তু সেই অর্জন তাঁকে ওই সম্প্রদায় বা রাষ্ট্রের সম্পত্তিতে পরিণত করে না। ক্লাব একজন খেলোয়াড়ের ক্রীড়াসেবা কিনতে পারে। পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান কিনতে পারে বিজ্ঞাপনের সুযোগ। কিন্তু কোনো চুক্তিই একজন ক্রীড়াবিদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস, চিন্তা কিংবা মতামত নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেয় না।
ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলো যদি মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি একজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিত্ব ও ব্যক্তিগত পরিচয়ও আমাদের কাছে বিক্রি করতে চায়, তাহলে তাঁকে নিজের মতো করে কথা বলার অধিকারও দিতে হবে। কারণ, মাঠের পারফরম্যান্সের বাইরেও একজন ক্রীড়াবিদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর ও স্বতন্ত্র সত্তা রয়েছে।



