নতুন জামালপুর ডেস্ক :
গাজীপুরে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন তৌফিক হোসেন (২৩) নামে এক শ্রমিক। ১১ মাস বয়সী ছেলের জন্য দুধ কিনে আনার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আর ফেরা হয়নি তাঁর। বাবাকে হারিয়ে শিশুটি এখন এতিম, আর স্বামীকে হারিয়ে দিশেহারা স্ত্রী সেতু মনি (১৯)।
সোমবার গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলনের সময় হামলায় গুরুতর আহত হন তৌফিক। পরে তাঁকে উদ্ধার করে বাংলাবাজার এলাকার সিং জিং জাপান হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে তাঁর মৃত্যু হয়।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে তৌফিকের বাবা মারা যান। এরপর পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে পড়াশোনা ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে গাজীপুরে যান তিনি। সেখানে একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সর্বনিম্ন মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান শ্রমিক আন্দোলনেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি।
নিহতের বন্ধু সোহরাব জানান, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামের মৃত তবি খাঁর ছেলে তৌফিকের সঙ্গে একই উপজেলার চাঁদপাড়া গ্রামের সরফালীর মেয়ে সেতু মনির চার বছর আগে বিয়ে হয়। ছোটবেলা থেকেই তাঁদের মধ্যে পরিচয় ছিল। পরে দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে হয় তাঁদের। দাম্পত্য জীবনে তাঁদের ১১ মাস বয়সী ছেলে সিয়াম বাবু রয়েছে।
তৌফিক গাজীপুরের মিজ্জাপুর মাস্টারবাড়ি এলাকার লায়লা স্টাইল গার্মেন্টসের কাটিং বিভাগে লেম্যান হিসেবে কাজ করতেন। সোহরাবের ভাষ্য অনুযায়ী, শ্রমিক আন্দোলনের একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়। এ সময় সংঘর্ষের দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করার চেষ্টা করলে তৌফিকের ওপর হামলা চালানো হয়। তাঁকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়।
তৌফিকের মৃত্যুর খবর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে স্বজনদের মধ্যে শোকের মাতম শুরু হয়। স্বামীকে হারিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন সেতু মনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ঘটনার দিন সকালে ছেলেকে কোলে নিয়ে আদর করছিলেন তৌফিক। কর্মস্থলে যাওয়ার সময় ছেলের জন্য দুধ কিনে আনার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন। কিন্তু দুধ নিয়ে আর ফেরা হয়নি তাঁর। ফিরে এসেছে স্বামীর নিথর দেহ।
সেতু মনি আরও বলেন, তাঁর বাবা মারা গেছেন। তাঁরা খাসজমিতে ঘর করে বসবাস করেন। তৌফিকের পরিবারেরও ঘরের জায়গা ছাড়া তেমন কোনো সম্পদ নেই। এখন ১১ মাসের সন্তানকে নিয়ে কীভাবে চলবেন এবং কে তাঁর সন্তানের দায়িত্ব নেবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
তিনি জানান, সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তাঁরা গাজীপুরে মাসিক তিন হাজার টাকা ভাড়ায় বাসা নিয়ে থাকতেন। সংসারের খরচ কমিয়ে কিছু টাকা সঞ্চয়ের চেষ্টা করতেন। তৌফিকের ইচ্ছা ছিল আসন্ন ঈদে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে জমি কিনবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
বুধবার সকাল ১০টার দিকে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামের বাড়িতে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তৌফিককে দাফন করা হয়।
গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না
Oplus_131072
React:




