সাকিব আল হাসান নাহিদ, জামালপুর।
বাবার মৃত্যুর পর বদলে যায় জান্নাতুল ফেরদৌস শোভার জীবনের হিসাব। যে বয়সে পড়াশোনা আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা, সে বয়সেই দেখতে হয়েছে সংসারের কঠিন বাস্তবতা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে স্ট্রোক করে মারা যান বাবা কাঞ্চন আহম্মেদ।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটির মৃত্যুতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তবে সেই প্রতিকূলতার কাছে হার মানেনি শোভা। মায়ের সংগ্রাম আর নিজের অধ্যবসায়কে সম্বল করে চালিয়ে গেছে পড়াশোনা। এবার এইচএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সে।
শোভার এই ফলাফলে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত মা মরিয়ম আহম্মেদ। স্বামীকে হারানোর পর তিন সন্তানকে নিয়ে নতুন করে জীবনসংগ্রামে নামতে হয়েছে তাঁকে। সংসারের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। শোভার কাছে মায়ের এই ত্যাগই এগিয়ে যাওয়ার বড় অনুপ্রেরণা।
শুধু ভালো ফল করেই থেমে থাকতে চায় না শোভা। তার স্বপ্ন আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে নিজের যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া। সে জন্য এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
জামালপুরের মেলান্দহ পৌরসভার কৃষি অফিস এলাকার আদিপৈত মহল্লার একটি ভাড়া বাসায় থাকে শোভার পরিবার। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সে বড়। ছোট ভাই সুয়াইব আহম্মেদ পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। আর ছোট বোন ওরনিকা সাইয়েরার বয়স মাত্র তিন বছর।
বাবা কাঞ্চন আহম্মেদ বাজারে সুতার পাশাপাশি কসমেটিকসের ব্যবসা করতেন। সেই আয়েই চলত পাঁচ সদস্যের সংসার। তাঁর মৃত্যুর পর স্বামীর রেখে যাওয়া ব্যবসার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন মরিয়ম আহম্মেদ। ব্যবসা পরিচালনা করে সংসারের খরচ জোগানোর পাশাপাশি সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করছেন তিনি। প্রয়োজনে সহযোগিতা করেন শোভার মামা।
শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী ছিল শোভা। মেলান্দহ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৪.৯৪ পেয়েছিল সে। অল্পের জন্য জিপিএ-৫ না পাওয়ার আক্ষেপ ছিল তার। সেই আক্ষেপ থেকেই পরবর্তী পরীক্ষায় আরও ভালো ফল করার সংকল্প নেয়।
কিন্তু এসএসসির পরপরই বাবার মৃত্যুতে বড় ধাক্কা আসে জীবনে। পরিবারের পরিস্থিতি বদলে গেলেও পড়াশোনা থেকে সরে দাঁড়ায়নি শোভা। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের লক্ষ্যে অবিচল ছিল। ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জনের মধ্য দিয়ে সেই চেষ্টার সফল পরিণতি পেয়েছে সে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে শোভা বলে, আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় সে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আপাতত বাড়িতে থেকেই পড়াশোনায় বেশি সময় দিতে চায়।
শোভার মতে, ভালো ফল করতে হলে শুরুতেই একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করা প্রয়োজন। শুধু মুখস্থ না করে প্রতিটি বিষয় বুঝে পড়তে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী নিয়মিত পড়াশোনা করলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব।
মেয়ে জিপিএ-৫ পাওয়ায় আনন্দিত মা মরিয়ম আহম্মেদ। তবে তাঁর কাছে সন্তানের ভালো ফলাফলের পাশাপাশি মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
মরিয়ম আহম্মেদ বলেন, ‘ওর বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব অনেকটাই আমার ওপর এসে পড়ে। ছোট ছোট দুই সন্তানও রয়েছে। স্বামীর রেখে যাওয়া ব্যবসাটা ধরে রেখেই সংসার চালানোর চেষ্টা করছি। এর মধ্যেও মেয়ের পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়, সেদিকে সব সময় খেয়াল রেখেছি। অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে ও পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। আজ ওর এই ফলাফলে আমি খুব খুশি। ওর বাবা বেঁচে থাকলে মেয়ের এমন সাফল্যে অনেক আনন্দিত হতেন।’
তিনি আরও বলেন, আমার চাওয়া, মেয়ে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াক, একজন ভালো মানুষ হোক। ওর বাবা নেই, তাই জীবনে যেন কারও ওপর নির্ভর করতে না হয়। নিজের যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এটাই আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।’
জাহানারা লতিফ মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আশরাফ হোসেন লিচু বলেন, শোভার এই সাফল্যে আমরা আনন্দিত ও গর্বিত। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও সে নিজের মেধা, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে ভালো ফল অর্জন করেছে। তার এই সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। আমরা আশা করি, ভবিষ্যতেও সে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে এবং আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে নিজের স্বপ্ন পূরণ করবে।
এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় মেলান্দহের জাহানারা লতিফ মহিলা কলেজ থেকে মোট ২৫৭ জন পরীক্ষার্থী নিবন্ধিত ছিল। এর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ২৫০ জন। পাস করেছে ৯২ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছে ১৫৮ জন। শোভাসহ জিপিএ-৫ পেয়েছে তিনজন। কলেজটির পাসের হার ৩৬ দশমিক ৮০ শতাংশ।




