জ্বালানি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য উপাদান। বিশেষ করে শহর ও মফস্বলের অসংখ্য পরিবার এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের রান্নার কাজে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এখন গুরুত্বপূর্ণ নির্ভরতা। অথচ দেশে এলপিজির বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই মূল্য ও সরবরাহ নিয়ে অস্থিরতা চলছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার না পাওয়া, সরবরাহ সংকটের অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং মূল্যতালিকা প্রদর্শন না করার অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। মাদারগঞ্জে সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি এবং মূল্যতালিকা প্রদর্শন না করায় ভ্রাম্যমাণ আদালত তিন ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেছেন। ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে ছোট হলেও এর মধ্য দিয়ে স্থানীয় এলপিজি বাজারের অনিয়ম এবং ভোক্তাদের অসহায়ত্বের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মাদারগঞ্জের বালিজুড়ী বাজারে উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে অতিরিক্ত দামে গ্যাস বিক্রির অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর তিন ব্যবসায়ীকে এক হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৩৮ ধারায় তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের এ উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অনিয়ম প্রতিরোধে প্রশাসনের এমন তৎপরতা প্রয়োজন। তবে প্রশ্ন হলো, তিন ব্যবসায়ীকে জরিমানা করলেই কি বাজারের অনিয়ম বন্ধ হবে? যাঁরা অতিরিক্ত দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, তাঁদের জন্য কি স্থায়ী কোনো সমাধান তৈরি হবে?
মাদারগঞ্জের এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দিয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন ভোক্তারা। গত ২ নভেম্বর বিইআরসি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে। এর আগে ৪ অক্টোবর একই সিলিন্ডারের দাম বাড়ানো হয়েছিল ২৫২ টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে দুই দফায় দাম বাড়ানোর পরও বাজারে নির্ধারিত মূল্য কার্যকর হচ্ছে না। সমস্যার দায় শুধু খুচরা বিক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে কোথায় সংকট তৈরি হচ্ছে, কারা বেশি দামে পণ্য সরবরাহ করছে এবং কেন সরকারি নির্ধারিত মূল্য কার্যকর থাকছে না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
এলপিজির বাজারে অনিয়মের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। একটি পরিবারের মাসিক রান্নার বাজেটে গ্যাসের বাড়তি ব্যয় নতুন চাপ তৈরি করছে। একইভাবে হোটেল, রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকানসহ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উৎপাদন খরচ বাড়ছে। অথচ তাঁরা সহজে পণ্যের দাম বাড়াতে পারছেন না। ফলে কেউ মুনাফা কমিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন, আবার কেউ ভোক্তার ওপর বাড়তি ব্যয় চাপিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পুরো বাজারেই ছড়িয়ে পড়ছে।
এলপিজির বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিইআরসি, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নির্ধারিত মূল্য বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। সরবরাহ সংকটের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ভোক্তাদের অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তিও জরুরি।

