অসুস্থতা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া একজন মানুষ সুস্থ হয়ে ফিরবেন, এটাই প্রত্যাশা। কিন্তু চিকিৎসায় অবহেলা, ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা রোগীর সম্মতি ছাড়া অস্ত্রোপচারের মতো অভিযোগ যখন সামনে আসে, তখন তা শুধু একজন রোগীর দুর্ভোগের প্রশ্ন থাকে না, চিকিৎসাব্যবস্থার জবাবদিহি নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
জামালপুরের বেসরকারি একটি হাসপাতালের দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে এক সরকারি কর্মকর্তার করা মামলা এমনই গুরুতর প্রশ্ন সামনে এনেছে। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর অনুমতি ছাড়াই তাঁর জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের অংশবিশেষ কেটে ফেলা হয়। পরে সংক্রমণ ও নানা জটিলতায় তাঁকে আরও তিনবার অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে। চিকিৎসার পেছনে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বলেও দাবি করেছেন ভুক্তভোগী । অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তা হবে চিকিৎসাগত দায়িত্বহীনতার এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত।
তবে মনে রাখতে হবে, মামলা দায়ের হওয়া মানেই অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, এমন নয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন নিরপেক্ষ, নির্ভরযোগ্য ও পেশাদার তদন্ত। আদালত ইতিমধ্যে জামালপুরের সিভিল সার্জনকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এখন এই তদন্ত যাতে স্বচ্ছতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
এই ঘটনায় বিশেষভাবে প্রশ্ন উঠেছে অস্ত্রোপচারে রোগীর সম্মতির বিষয়টি নিয়ে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগীর সম্মতি একটি মৌলিক নৈতিক ও আইনগত অধিকার। অস্ত্রোপচারের ধরন, সম্ভাব্য ঝুঁকি, বিকল্প চিকিৎসা এবং শরীরের কোন অঙ্গ অপসারণ বা পরিবর্তন করতে হতে পারে, সে বিষয়ে রোগীকে যথাসম্ভব স্পষ্টভাবে জানানো চিকিৎসকের দায়িত্ব। জরুরি পরিস্থিতিতে জীবন রক্ষার প্রয়োজনে কিছু ব্যতিক্রম থাকতে পারে। কিন্তু সেই ব্যতিক্রমকে সাধারণ নিয়ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। রোগীর সম্মতি ছাড়া তাঁর প্রজননস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ জীবনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে, এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার অভিযোগ তাই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
চিকিৎসায় ভুল ও অবহেলার অভিযোগের বিচার শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতিপূরণ বা শাস্তির প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি আস্থা। একজন রোগী যখন চিকিৎসকের কাছে যান, তখন তাঁর পক্ষে চিকিৎসার প্রতিটি সিদ্ধান্তের যথার্থতা যাচাই করা সম্ভব হয় না। এই আস্থার জায়গাটির মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্ব চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। সেই দায়িত্বে অবহেলা হলে তার জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
জামালপুরের এই মামলার নিষ্পত্তি হোক স্বচ্ছ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগের কোনো অংশ প্রমাণিত না হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসাসেবার মান নিয়ন্ত্রণ, রোগীর সম্মতি নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ দ্রুত তদন্তের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যাতে এ ধরনের ঘটনা জওয়াবদিহিতার আওতায় আসে।

