শ্রমিকের শ্রমে সচল থাকে শিল্পকারখানা, সমৃদ্ধ হয় অর্থনীতি। অথচ সেই শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, চাকরির নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা না গেলে শিল্পের ভিতও দুর্বল হয়ে পড়ে। সাভারের আশুলিয়ায় পোশাকশ্রমিকদের নতুন করে আন্দোলন এবং অন্তত ৫০টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।
ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি শ্রমিকের জীবনধারণের অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। একজন শ্রমিক সারাদিন পরিশ্রম করেও যদি পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে না পারেন, তাহলে সেই কর্মসংস্থানকে মর্যাদাপূর্ণ বলা যায় না। একই সঙ্গে শ্রমিকের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া কিংবা ব্যক্তিগত অসন্তোষের জেরে ইচ্ছামতো ছাঁটাইয়ের সংস্কৃতি শ্রমিকের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও ক্ষোভ তৈরি করে।
তবে শ্রমিকের দাবি আদায়ের আন্দোলন যেন সংঘাত ও সহিংসতার দিকে না যায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। আশুলিয়ায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পালটাধাওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক। আন্দোলনের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলে শ্রমিক, মালিক এবং দেশের অর্থনীতি, সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এখানে মজুরি বোর্ড গঠনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবির মধ্যেই রোববার মজুরি বোর্ড গঠনের খবর এসেছে। এখন বোর্ডের দায়িত্ব হবে বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, শ্রমিকের পরিবারের সদস্যসংখ্যা, শিল্পের সক্ষমতা এবং রপ্তানি আয়ের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে যৌক্তিক মজুরি নির্ধারণ করা। শুধু মালিকপক্ষের সক্ষমতা কিংবা বাজারের প্রতিযোগিতার যুক্তি দিয়ে শ্রমিকের জীবনযাত্রার বাস্তবতা উপেক্ষা করা যাবে না। আবার শিল্পের টিকে থাকার বিষয়টিও বিবেচনার বাইরে রাখা সমীচীন হবে না।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এ খাতের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে।
শিল্পের উন্নয়ন আর শ্রমিকের কল্যাণ পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক। যে শিল্প শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে পারে না, তার স্থিতিশীল ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। তাই আশুলিয়ার শ্রমিক অসন্তোষকে নিছক উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঘটনা হিসেবে না দেখে শ্রমিকের জীবনমান ও শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। শ্রমিকের মুখে হাসি এবং শিল্পের চাকা সচল রাখা, দুটোই নিশ্চিত করাই হোক সংশ্লিষ্ট সবার অগ্রাধিকার।

