দেশের জ্বালানি বাজারে এলপিজি এখন আর বিকল্প কোনো জ্বালানি নয়, বরং বিপুলসংখ্যক পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য উপকরণ। বিশেষ করে শহরাঞ্চল ও গ্যাস-সংযোগবিহীন এলাকার মানুষের রান্নার প্রধান অবলম্বন এই তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস। অথচ দেড় মাসের বেশি সময় ধরে বাজারে এলপিজি সরবরাহে ঘাটতি, নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েক শ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কেনা এবং সর্বশেষ সরকারি মূল্যবৃদ্ধি ভোক্তাদের জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একদিকে বাজারে সংকট, অন্যদিকে দাম বৃদ্ধি, দুইয়ের চাপে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহকেরা।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে। এর আগে গত মাসেও দাম বেড়েছিল ২১২ টাকা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নির্ধারিত মূল্য কার্যকর থাকার পরও দেড় মাস ধরে বাজারে এই সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ সরকারি মূল্যবৃদ্ধির আগেই ভোক্তাদের বাড়তি অর্থ গুনতে হয়েছে। নতুন মূল্য নির্ধারণের পরও বাজারে প্রকৃত মূল্য কত হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বাজারে সরবরাহ ঘাটতির কারণ কী? এলপিজি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। অথচ বাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। প্রায় এক কোটি গ্রাহকের চাহিদা পূরণে আমদানি করা এলপিজি কোথায় যাচ্ছে, সরবরাহব্যবস্থার কোন পর্যায়ে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। আমদানি স্বাভাবিক থাকার পরও বাজারে সংকট তৈরি হলে সেখানে মজুতদারি, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কিংবা সরবরাহের কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধান করতে হবে।
এলপিজি খাতের প্রায় ৯৯ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে। বেসরকারি বিনিয়োগ ও আমদানিনির্ভর এই বাজারে সরকারের নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিইআরসি প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম নির্ধারণ করলেও সেই দাম কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। শুধু মূল্য ঘোষণা করেই দায়িত্ব শেষ করা যায় না। নির্ধারিত দামে পণ্য পাওয়া নিশ্চিত না হলে মূল্য নির্ধারণের পুরো প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে এলপিজির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানির বাজারে সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর তদারকি না থাকলে তার দায় শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই বহন করতে হয়। ব্যবসায়ীরা সরবরাহ সংকটের অজুহাতে বাড়তি দাম আদায় করলে এবং প্রশাসন তা প্রতিরোধে ব্যর্থ হলে বাজারে একধরনের অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি তৈরি হয়। এতে শুধু নিম্ন আয়ের মানুষ নয়, মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যায়।
এ পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদে এলপিজি আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি কমানো, সংরক্ষণ ও বিতরণ অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, একটি অপরিহার্য জ্বালানির বাজার অল্পসংখ্যক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল থাকলে সরবরাহ ও মূল্য নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যায়।
বাজারে পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে বাড়তে পারে, কিন্তু সেই অজুহাতে ভোক্তার কাছ থেকে ইচ্ছামতো মূল্য আদায়ের সুযোগ থাকতে পারে না। মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং নির্ধারিত দাম কার্যকর করা সরকারের দায়িত্ব। এলপিজির বাজারে এখন সবচেয়ে জরুরি হলো সংকটের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং ভোক্তার স্বার্থ সুরক্ষা। নিত্যপ্রয়োজনীয় এই জ্বালানির বাজারে অনিয়ম গুরুত্বের সাথে নিতে হবে।

