আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধ দমনে পুলিশের ভূমিকা অপরিহার্য। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের নামে আইনবহির্ভূত কোনো পদ্ধতির ইঙ্গিত যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি পুলিশের কার্যকারিতা নিয়ে সমালোচনাকারীদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ তোলাও দায়িত্বশীল আচরণের পরিচয় বহন করে না। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের সাম্প্রতিক দুটি বক্তব্য তাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একদিকে প্রয়োজন হলে সরকার অনুমতি দিলে ‘ক্রসফায়ার’ চালানোর কথা বলেছেন তিনি, অন্যদিকে মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে কিছু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অর্থ না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। দুটি বক্তব্যই আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, মানবাধিকার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।
চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংকের ইসলামি ব্যাংকিং সেবা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আইজিপি বলেছেন, আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রয়োজন হলে এবং সরকার অনুমতি দিলে পুলিশ ক্রসফায়ার করবে। তাঁর বক্তব্যে আইন ও সংবিধান মেনে চলার অঙ্গীকার থাকলেও ক্রসফায়ারের প্রসঙ্গটি উদ্বেগের অবকাশ তৈরি করেছে। কারণ, রাষ্ট্রের কোনো সংস্থার জন্যই আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ নেই। সরকারের অনুমতি কোনো কাজকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনসম্মত করে তোলে না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের প্রতিটি পদক্ষেপকে সংবিধান, প্রচলিত আইন এবং মানবাধিকারের মানদণ্ডের মধ্যে থাকতে হয়।
ক্রসফায়ার শব্দটি বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত। অতীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে মৃত্যুর ঘটনাগুলো নিয়ে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠন প্রশ্ন তুলেছে। এসব ঘটনার ক্ষেত্রে অপরাধের অভিযোগ, গ্রেপ্তার, বিচার এবং শাস্তির নির্ধারিত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণের দাবি বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তি গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত হলেও তাঁর জীবন ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার বিলুপ্ত হয় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আত্মরক্ষায় বা অন্যের জীবন রক্ষায় প্রয়োজনীয় ও আইনসম্মত বল প্রয়োগ করতে হতে পারে। কিন্তু সেটিকে বিচারবহির্ভূত শাস্তি কার্যকরের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
অপরাধ দমনে কঠোরতা প্রয়োজন, কিন্তু কঠোরতার অর্থ আইনকে পাশ কাটানো নয়। বরং প্রকৃত কঠোরতা হলো অপরাধীকে শনাক্ত করা, নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহ করা, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করা এবং আদালতের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করা। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের আশঙ্কা তৈরি হলে অপরাধ দমনের পাশাপাশি নিরপরাধ মানুষের নিরাপত্তা, পুলিশের জবাবদিহি এবং বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে আইজিপির বক্তব্যে ক্রসফায়ারের পরিবর্তে আইনসম্মত অভিযান, দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিই গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল।
আইন ও সংবিধান মেনে পুলিশকে কাজ করতে দেওয়ার যে আহ্বান আইজিপি জানিয়েছেন, তার সঙ্গে দ্বিমত করার কারণ নেই। পুলিশকে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ দিতে হবে। অপরাধীকে রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে রক্ষা করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। পুলিশের ওপর অযৌক্তিক হামলা, দায়িত্ব পালনে বাধা এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনাও প্রতিরোধ করতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে পুলিশকেও মনে রাখতে হবে, আইন প্রয়োগের ক্ষমতা জনগণের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, জনগণের অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য। রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো পুলিশের ক্ষমতাও আইনের অধীন এবং সেই ক্ষমতার প্রয়োগের জন্য জবাবদিহি অপরিহার্য।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনীর কার্যক্রম পুনর্গঠন, জনআস্থা ফিরিয়ে আনা এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এই বাস্তবতায় পুলিশের প্রতিটি বক্তব্য ও পদক্ষেপে আইনের প্রতি অঙ্গীকার স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। অতীতের বিতর্ক থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন পুলিশব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে অপরাধী আইনের ফাঁক গলে পার পাবে না, আবার নিরপরাধ কেউ ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকারও হবে না। পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের দায়িত্ব পালনের নিরাপত্তাও দিতে হবে।
আইজিপির বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের দায়িত্ব হলো স্পষ্ট করা, অপরাধ দমনে কোনো আইনবহির্ভূত পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে না এবং প্রতিটি অভিযান আইন ও মানবাধিকারের মানদণ্ড মেনে পরিচালিত হবে।

