Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
জাতীয়

নিষেধাজ্ঞা শেষে জালে ধরা পড়া ৯৫ শতাংশ ইলিশই ডিমওয়ালা, নেপথ্যে কী?

নিষেধাজ্ঞা শেষে জালে ধরা পড়া ৯৫ শতাংশ ইলিশই ডিমওয়ালা, নেপথ্যে কী?

প্রজনন মৌসুমের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে মাছ ধরতে নেমেছেন জেলেরা। তবে জালে মিলছে না প্রত্যাশিত পরিমাণ ইলিশ। তার ওপর ধরা পড়া মাছের অধিকাংশের পেটেই রয়েছে ডিম। এক প্রতিবেদনে এমনটি জানিয়েছে জাগো নিউজ। জেলেদের দাবি, প্রতি ১০০টি ইলিশের মধ্যে প্রায় ৯৫টিই ডিমওয়ালা। এমনকি কিছু মাছের ডিম ছাড়ার সময় ঘনিয়ে এলেও জালে আটকা পড়ায় সেগুলো ডিম ছাড়তে পারেনি।

জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমের নিষেধাজ্ঞা যথাসময়ে কার্যকর না হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, নিষেধাজ্ঞার সময় আরও পরে নির্ধারণ করা হলে অধিকাংশ মা ইলিশ ডিম ছাড়ার সুযোগ পেত। তবে মৎস্যবিজ্ঞানীদের ধারণা, আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও ইলিশের প্রজনন মৌসুমে পরিবর্তন আসতে পারে। যথাযথভাবে ডিম ছাড়তে না পারলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।

জালে মিলছে কম ইলিশ, অধিকাংশই ডিমওয়ালা

ভোলার বিভিন্ন মৎস্যঘাট ঘুরে জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর দল বেঁধে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে মাছ ধরতে নেমেছেন তারা। জেলায় প্রায় তিন লাখ জেলে ইলিশ আহরণের সঙ্গে জড়িত। নিষেধাজ্ঞা শেষে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে মিলছে কম মাছ। আবার যে মাছ পাওয়া যাচ্ছে, তার অধিকাংশের পেটে ডিম রয়েছে।

ভোলা সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের জেলে সুজন মাঝি জানান, নিষেধাজ্ঞা শেষে পাঁচজন মিলে প্রতিদিন মেঘনা নদীতে মাছ ধরতে যাচ্ছেন। ভোর ও বিকেলে মাছ ধরে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০টি ইলিশ পাচ্ছেন তারা। এর মধ্যে কোনো দিন এক-দুটি মাছ ডিম ছাড়া পাওয়া গেলেও অধিকাংশের পেট ডিমে ভরা। কিছু মাছের ডিম ছাড়তে মাত্র এক-দুই দিন বাকি ছিল।

সুজন মাঝির মতে, নিষেধাজ্ঞা আরও পরে দেওয়া উচিত ছিল। নভেম্বর মাসে ২২ দিনের অভিযান পরিচালনা করা হলে অধিকাংশ ইলিশ ডিম ছাড়ার সুযোগ পেত। এতে ভবিষ্যতে নদীতে ইলিশের পরিমাণ বাড়ত।

রাজাপুর ইউনিয়নের জনতা বাজার এলাকার জেলে জহির মাঝিও একই অভিজ্ঞতার কথা জানান। সাতজন মিলে একটি ট্রলারে প্রতিদিন দুই দফায় নদীতে মাছ ধরতে গেলেও প্রত্যাশিত পরিমাণ ইলিশ পাচ্ছেন না। যে কয়টি মাছ পাওয়া যাচ্ছে, তার প্রায় সবগুলোর পেটেই ডিম রয়েছে। কয়েকটি মাছের ডিম আংশিক ছাড়া অবস্থায় জালে উঠেছে।

একই ইউনিয়নের জেলে কালাম মাঝি জানান, আটজন মিলে মাছ ধরতে নেমে গত ১ নভেম্বর বিকেল পর্যন্ত বিভিন্ন আকারের প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০টি ইলিশ পেয়েছেন। তবে বেশিরভাগই ছোট আকারের। বড় ইলিশ ছিল হাতে গোনা কয়েকটি। সব মিলিয়ে মাত্র ১২ থেকে ১৫টি ডিম ছাড়া ইলিশ পেয়েছেন তারা। কিছু পুরুষ ইলিশও ছিল। বাকি মাছগুলোর পেটে ডিম পাওয়া গেছে।

ডিমওয়ালা ইলিশের এত আধিক্য আগে দেখেননি জেলেরা

ধনিয়া ইউনিয়নের তুলাতুলি এলাকার জেলে জামাল মাঝি এবং ভোলার শিবপুরের খাল এলাকার জেলে ভূট্ট মাঝি জানান, দীর্ঘদিন ধরে মাছ ধরলেও নিষেধাজ্ঞা শেষে এ বছর যত বেশি ডিমওয়ালা ইলিশ পেয়েছেন, আগে কখনো এমন অভিজ্ঞতা হয়নি। আগের বছরগুলোতে জালে ডিম ছাড়া ইলিশের সংখ্যাই বেশি থাকত।

তাদের ধারণা, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে শুরু হলে ইলিশের ডিম ছাড়ার সুযোগ বাড়ত। জেলেদের ভাষ্য, তারা নিজেরাও ডিমওয়ালা ইলিশ ধরতে চান না। কারণ এসব মাছ ডিম ছাড়তে পারলেই ভবিষ্যতে নদীতে বড় ইলিশের সংখ্যা বাড়বে।

ভেদুরিয়া ইউনিয়নের জেলে মো. হানিফ মাঝি ও ফরিদ মাঝিও ভবিষ্যতে ইলিশের সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন কষ্ট করে নদীতে মাছ ধরা থেকে বিরত থেকেও যদি মা ইলিশ ডিম ছাড়ার সুযোগ না পায়, তাহলে এর ক্ষতি শেষ পর্যন্ত জেলেদেরই বহন করতে হবে। ভবিষ্যতে নদী ও সাগরে ইলিশের পরিমাণ কমে গেলে তাদের জীবিকা সংকটে পড়বে।

মৎস্যঘাটেও ডিমওয়ালা ইলিশের আধিক্য

পূর্ব ইলিশ মৎস্যঘাটের আড়তদার মো. সাহাবুদ্দিন ফরাজী জানান, প্রজনন মৌসুমের আগে নিষেধাজ্ঞার সময় যথাযথভাবে নির্ধারণের জন্য প্রতিবছরই তারা মৎস্য বিভাগের কাছে অনুরোধ জানান। এবারও একই দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা শেষে জেলেদের নিয়ে আসা ইলিশের অধিকাংশই ডিমওয়ালা।

তিনি বলেন, প্রতিদিন ঘাটে জেলেরা ইলিশ নিয়ে আসছেন এবং নিলামের মাধ্যমে হাজার হাজার মাছ বিক্রি হচ্ছে। তবে এবার ডিমওয়ালা ইলিশের আধিক্য অনেক বেশি। ডিম ছাড়া মাছের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুবই কম। তার অভিজ্ঞতায়, গত বছরের তুলনায় এবার অর্ধেকেরও কম ইলিশ ডিম ছেড়েছে।

সাহাবুদ্দিন ফরাজীর মতে, ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণ যথাযথ হয়নি। নভেম্বরের ১ তারিখ বা প্রথম সপ্তাহ থেকে নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ ইলিশ ডিম ছাড়তে পারত বলে মনে করেন তিনি। আগামী বছর নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণে ভোলার জেলে ও মৎস্যজীবীদের অভিজ্ঞতা ও মতামত বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন এই আড়তদার।

গবেষণা ইনস্টিটিউটের সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয় নিষেধাজ্ঞার সময়

ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসাইন বলেন, ইলিশ সারা বছরই ডিম ছাড়ে। তবে নির্দিষ্ট সময়ে বেশি পরিমাণে ডিম ছাড়ে। নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেও এখনো কিছু ইলিশের ডিম ছাড়ার সময় রয়েছে। কিছু মাছ ডিম ছাড়বে, আবার কিছু মাছ জেলেদের জালে ধরা পড়বে।

তিনি জানান, ইলিশের প্রজনন মৌসুমের নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণ করে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট। জেলা মৎস্য বিভাগ এ বিষয়ে প্রস্তাবনা দিয়ে থাকে। তবে এবারের নিষেধাজ্ঞার সময় যথাযথ ছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত মন্তব্য করেননি তিনি।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক, জ্যেষ্ঠ মৎস্যবিজ্ঞানী ও ইলিশ গবেষক ড. মো. আনিছুর রহমান বলেন, নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ ইলিশের পেটে ডিম ছিল। অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় ইলিশ যথাযথভাবে ডিম ছাড়তে পেরেছে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

তার মতে, আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইলিশের প্রজনন মৌসুমে পরিবর্তন আসতে পারে। আগের তুলনায় প্রজনন মৌসুমে কিছুটা ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। এর প্রভাব ভবিষ্যতে নদী ও সাগরে ইলিশের প্রাপ্যতায় পড়তে পারে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাটকা সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এই মৎস্যবিজ্ঞানী। তিনি বলেন, জাটকা নিধন বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে অবৈধ জালের ব্যবহার রোধে কঠোর অভিযান পরিচালনা জরুরি।

ইলিশের প্রজনন চক্র সুরক্ষিত রাখতে নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণ, জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত প্রভাব পর্যবেক্ষণ এবং জাটকা সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ মা ইলিশ পর্যাপ্ত ডিম ছাড়ার সুযোগ না পেলে তার প্রভাব শুধু চলতি মৌসুমে নয়, ভবিষ্যতের ইলিশ উৎপাদন ও জেলেদের জীবিকাতেও পড়তে পারে।

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies