প্রিয়াঙ্কা শঙ্কর ।।
ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের দেশে গত এক যুগে দারিদ্র্য হ্রাসের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা বিশ্ব অর্থনীতিতে বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশটিতে প্রায় ৫০ কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। একই সময়ে চরম দারিদ্র্যের হার ২৭ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৬ শতাংশে।
এত বিপুলসংখ্যক মানুষের দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের নজির বিশ্বে খুব বেশি নেই। তুলনীয় উদাহরণ হিসেবে রয়েছে চীন। দেশটি প্রায় ৪০ বছরে ৮০ কোটির বেশি মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে বের করে এনেছে।
তবে দারিদ্র্য হ্রাসের এই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির পাশাপাশি ভারতে আয় ও সম্পদের বৈষম্যও বেড়েছে। ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে অর্থনীতি উন্মুক্ত করার পর থেকে এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়েছে। ২০২৬ সালের বিশ্ব বৈষম্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে অসমতাপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে ভারত অন্যতম।
দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে ভারত কীভাবে এত বড় সাফল্য অর্জন করল, আর সেই সাফল্যের পরও কেন দেশটিতে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে, তা নিয়ে রয়েছে নানা আলোচনা।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছে?
বিশ্বব্যাংক দৈনিক ৩ ডলার আয়কে চরম দারিদ্র্যের সীমা হিসেবে বিবেচনা করে ভারতের দারিদ্র্যের চিত্র বিশ্লেষণ করেছে। এই হিসাবে ২০১১ সালে দেশটির ২৭ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে ছিল। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৬ শতাংশে।
চরম দারিদ্র্য বলতে খাদ্য, পানি, বাসস্থান ও পোশাকের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম অর্থের অভাবকে বোঝায়।
ভারতের তিনটি সরকারি পারিবারিক জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, দৈনিক ৪ দশমিক ২০ ডলারের নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০১১ সালে এই হার ছিল ৫৭ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে নেমে এসেছে ১৬ দশমিক ১ শতাংশে। এ হিসাবে প্রায় ৪৯ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক দারিদ্র্য অর্থনীতিবিদ আয়াগো ওয়ামবিলে নেতৃত্বাধীন গবেষক দল বলেছে, ভারতে দারিদ্র্য কমার ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, যদিও অগ্রগতির গতি কিছুটা ধীর হতে পারে। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দৈনিক ৪ দশমিক ২০ ডলারের দারিদ্র্যসীমায় থাকা মানুষের হার ২০২৬ সালে ১৪ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ২০২৮ সালে ১২ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।
প্রতিবেদনে দারিদ্র্য কমার পেছনে কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মানুষের ভোগব্যয় বৃদ্ধি, বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থান বাড়া এবং খাদ্য ভর্তুকিসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ।
দারিদ্র্য হ্রাসের এই অগ্রগতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
১২ বছরে প্রায় ৫০ কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনার ঘটনাকে বিশ্বব্যাংক ভারতের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করেছে। সংস্থাটির মতে, বিশ্বে দারিদ্র্য হ্রাসের দ্রুততম ঘটনাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।
ভারতের দারিদ্র্যের হার নির্ধারণে বিশ্বব্যাংক দেশটির সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে অর্গানাইজেশনের (এনএসএসও) পরিচালিত পারিবারিক ভোগব্যয় জরিপের তথ্য ব্যবহার করেছে।
২০২২ সালে বিশ্বব্যাংক ও চীনের অর্থ মন্ত্রণালয়ের যৌথ এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, চীন প্রায় ৪০ বছরে ৮০ কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে এনেছে। ভারতের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম সময়ে প্রায় ৫০ কোটি মানুষের দারিদ্র্য থেকে উত্তরণ ঘটেছে।
এদিকে গত মাসে বিশ্বব্যাংক ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৭ দশমিক ১ শতাংশ করেছে।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দারিদ্র্য হ্রাসের এই অগ্রগতির প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, দারিদ্র্যের ঐতিহাসিক পতনের মধ্য দিয়ে সুযোগের ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মের জন্য সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
গত বছরের নভেম্বরে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালা নিজেদের চরম দারিদ্র্যমুক্ত ঘোষণা করে। স্বাধীনতার পর থেকে রাজ্যটি কখনো কংগ্রেস, আবার কখনো বামপন্থী জোটের শাসনে রয়েছে। ভারতের বড় রাজ্যগুলোর মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সূচকে কেরালার অবস্থানও তুলনামূলক ভালো।
ভারতের সাবেক পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য এবং বর্তমানে মস্কোর হায়ার স্কুল অব ইকোনমিকসের ভিজিটিং অধ্যাপক অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রা বলেন, জি-২০ সদস্যদের মধ্যে ভারতই একমাত্র নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ। অন্য সদস্য দেশগুলো উচ্চমধ্যম বা উচ্চ আয়ের পর্যায়ে রয়েছে।
তাঁর মতে, ভারতের জনসংখ্যা বিশাল হওয়ায় দেশটিতে দরিদ্র মানুষের মোট সংখ্যাও এখনো বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। ফলে দারিদ্র্যের হার কমানোর পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের প্রকৃত সংখ্যাও কমিয়ে আনা গেলে তা বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ সুরজিত ভাল্লার মতে, বিশ্বব্যাংকের এই বিশ্লেষণের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ কম। তাঁর ভাষায়, বিশ্বব্যাংকের তথ্যকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তিনি বলেন, ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি (পিপিপি) বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি দেশের মাথাপিছু ভোগব্যয়ের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক দারিদ্র্য বিশ্লেষণ করে।
কীভাবে দারিদ্র্য কমাল ভারত?
ভারতের দারিদ্র্য হ্রাসের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘ সময়ের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্মিলিতভাবে এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে ভারত অর্থনীতিকে উন্মুক্ত করার পর থেকেই দারিদ্র্য কমার প্রবণতা শুরু হয়। সে সময় ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস সরকার। অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে পরবর্তী তিন দশকের বেশি সময় ধরে দেশটিতে দ্রুত প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়।
এর পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় থাকা সরকারগুলো দারিদ্র্য মোকাবিলায় নানা সামাজিক কর্মসূচি চালু করেছে, পুরোনো কর্মসূচির পরিধি বাড়িয়েছে কিংবা সেগুলো নতুনভাবে সাজিয়েছে।
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সরকার গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি চালু করেছিল। এর আওতায় গ্রামীণ পরিবারগুলোকে বছরে ন্যূনতম ১০০ দিনের মজুরিভিত্তিক কাজের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়।
২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর নরেন্দ্র মোদির সরকারও দারিদ্র্য মোকাবিলায় একাধিক কর্মসূচি চালু করে। এর মধ্যে রয়েছে সরাসরি নগদ অর্থ সহায়তা, বিনা মূল্যে খাদ্যশস্য বিতরণ এবং আবাসন সুবিধা।
তবে মনমোহন সিংয়ের আমলে চালু হওয়া গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা কর্মসূচির পরিধি মোদি সরকার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। অন্যদিকে বর্তমানে দেশটির প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে বিনা মূল্যে খাদ্যশস্য দেওয়া হচ্ছে।
মোদি সরকারের আমলে গ্রামীণ এলাকায় শৌচাগার নির্মাণের কাজও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। ভারতের অনেক গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে খোলা জায়গায় মলত্যাগের প্রচলন ছিল। পাশাপাশি নিরাপদ পানি সরবরাহেও অগ্রগতি হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালের আগস্টে গ্রামীণ পরিবারের মাত্র ১৭ শতাংশ পাইপলাইনের মাধ্যমে পানির সংযোগ পেত। বর্তমানে এই হার ৮০ শতাংশের বেশি।
অর্থনীতিবিদ সুরজিত ভাল্লা ও করণ ভাসিন ২০২৪ সালের মার্চে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের জন্য প্রকাশিত এক গবেষণায় লিখেছিলেন, নিরাপদ পানির সহজলভ্যতার ফলে মানুষের অসুস্থতা কমে থাকতে পারে। এতে পরিবারগুলোর আয় উপার্জনের সক্ষমতাও বেড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই ২০২৫ সালের শুরুর দিকে ভারতীয়দের ভোগব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে ভাল্লা ও ভাসিন একই ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন। তাঁদের গবেষণায়ও ভারতে চরম দারিদ্র্য কমার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা বলা হয়েছিল।
দারিদ্র্য কমলেও অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ কেন?
দারিদ্র্য হ্রাসের পরিসংখ্যান আশাব্যঞ্জক হলেও এর পেছনে থাকা বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
ভাল্লা ও ভাসিন তাঁদের ২০২৫ সালের গবেষণায় উল্লেখ করেছিলেন, ভারত সরকারের দেওয়া বিনা মূল্যের খাদ্যশস্য প্রায় ৮০ কোটি মানুষের ক্যালরির চাহিদা পূরণে সহায়তা করছে। তবে শুধু ক্যালরির চাহিদা পূরণ করলেই সুষম পুষ্টি নিশ্চিত হয় না।
তাঁদের মতে, প্রকৃত দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে আরও ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্য সহায়তা দেওয়া হলে পুষ্টির মান উন্নত করা সম্ভব। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও এটি কার্যকর হতে পারে।
এ ছাড়া দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষকে অনির্দিষ্টকাল বিনা মূল্যে খাদ্য সরবরাহ করা সরকারের পক্ষে কতটা টেকসই হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এমন কর্মসূচি দেশের গভীর অর্থনৈতিক সংকটকে আড়াল করছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন কেউ কেউ।
অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রার উদ্বেগ আরও ভিন্ন জায়গায়। তাঁর মতে, ভারত সরকার এখন আর নিজস্ব পদ্ধতিতে দারিদ্র্যের হার ও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা নির্ধারণ করছে না। ২০১৪ সালে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশটি দারিদ্র্য পরিমাপের ক্ষেত্রে অনেকটাই বিশ্বব্যাংকের হিসাবের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
মেহরোত্রা বলেন, একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার নির্ধারিত দারিদ্র্যসীমাকে নিজেদের দেশের মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়টি অস্বাভাবিক।
তাঁর মতে, ভারতের মতো বিশাল ও বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশের দারিদ্র্য পরিমাপের জন্য শুধু আন্তর্জাতিক সংস্থার নির্ধারিত মানদণ্ড যথেষ্ট নয়। মানুষের জীবনযাপন ও ভোগের ধরন সময়ের সঙ্গে বদলায়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ১০ বছর আগে সবার হাতে মোবাইল ফোন ছিল না। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলেও মোবাইল ফোনের ব্যবহার ব্যাপক। ফলে মানুষের ভোগের ঝুড়ি বা কনজাম্পশন বাস্কেট বদলেছে। দারিদ্র্য ও মূল্যসূচক নির্ধারণে এই পরিবর্তন বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
তবে সুরজিত ভাল্লা এই সমালোচনার সঙ্গে একমত নন। তাঁর দাবি, বিশ্বব্যাংকের পদ্ধতি ও হিসাব চূড়ান্ত প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মাধ্যমে যাচাই করা হয়। ভারতের ক্ষেত্রেও দেশটির গবেষক ও সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করেছেন। তাই তথ্যের পেছনে রাজনৈতিক বা আদর্শিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলে প্রশ্ন তোলার ভিত্তি নেই।
অন্যদিকে ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ জয়তী ঘোষ ভারতের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তাঁর মতে, ভারত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ১ শতাংশের কিছু বেশি জনস্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করে। মাথাপিছু স্বাস্থ্য বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশটি বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে। ফলে সরকারি হাসপাতালগুলো প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে ভুগছে এবং অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
চিকিৎসার মোট ব্যয়ের বড় অংশ নাগরিকদের নিজেদের বহন করতে হয়। এতে প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে দারিদ্র্য কিংবা ঋণের ঝুঁকিতে পড়ছে।
জয়তী ঘোষ আরও বলেন, ভারতে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির হার দীর্ঘদিন ধরে স্থবির। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনেও দারিদ্র্য কমার পাশাপাশি মজুরির ক্ষেত্রে বড় ধরনের ব্যবধানের কথা উঠে এসেছে। ২০২৩ সালে দেশটির সর্বোচ্চ আয়কারী ১০ শতাংশ শ্রমিকের মধ্যম আয়ের তুলনায় সর্বনিম্ন আয়কারী ১০ শতাংশ শ্রমিকের মধ্যম আয় ছিল প্রায় ১৩ গুণ কম।
তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতি গতিশীল ও সমতাভিত্তিক অর্থনীতির লক্ষণ নয়।
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক নীতিন কুমার ভারতী বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনকে উৎসাহব্যঞ্জক বলে মনে করেন। তবে তাঁর মতে, চরম দারিদ্র্য কমে যাওয়াকে দারিদ্র্য সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, দৈনিক ৪ দশমিক ২০ ডলারের দারিদ্র্যসীমার নিচে এখনো প্রায় ২৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ বসবাস করছে।
২০২৪ সালে প্রকাশিত ভারতের আয় ও সম্পদের বৈষম্যবিষয়ক ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাবের একটি গবেষণার সহলেখক ভারতী বলেন, দারিদ্র্য কমলেও মানুষের সামগ্রিক জীবনমান কতটা উন্নত হয়েছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ভারতে আয়বৈষম্য বাড়ছে কেন?
অর্থনীতিবিদ ভারতীর মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সবার মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না। বরং জাতীয় আয়ের ক্রমবর্ধমান অংশ চলে যাচ্ছে সমাজের উচ্চ আয়ের মানুষের হাতে। এ কারণেই আয়বৈষম্য বাড়ছে।
২০২৬ সালের বিশ্ব বৈষম্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের সর্বোচ্চ আয়কারী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে জাতীয় আয়ের প্রায় ৫৮ শতাংশ। বিপরীতে, সর্বনিম্ন আয়ের ৫০ শতাংশ মানুষের অংশ মাত্র ১৫ শতাংশ।
ভারতীর মতে, দেশটির দীর্ঘদিনের কাঠামোগত বৈষম্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ঐতিহাসিক বর্ণপ্রথা, সম্পদের অসম মালিকানা এবং প্রাথমিক শিক্ষায় দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ সীমিত করে রেখেছে।
মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি বিনিয়োগের ঘাটতিও বৈষম্য বাড়াচ্ছে। এই দুটি খাত মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার ব্যবধান কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সুযোগের অভাবে পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যই নির্ধারণ করে দিচ্ছে কে ভালো শিক্ষা, চিকিৎসা, দক্ষতা অর্জন ও ভালো চাকরির সুযোগ পাবে।
আয়বৈষম্য ও কর্মসংস্থানের অভাব ভারতের তরুণদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি করছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় তরুণদের একাধিক বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটেছে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতে তরুণদের বেকারত্বের হার ২০২৫ সালের এপ্রিলে ছিল ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৬ সালের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ২ শতাংশে।
বেঙ্গালুরুভিত্তিক আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্টেট অব ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া ২০২৬’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী স্নাতক ডিগ্রিধারী তরুণদের প্রায় ৪০ শতাংশ বেকার। ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এই হার প্রায় ২০ শতাংশ। ডিপ্লোমা ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৪ শতাংশে।
দারিদ্র্য কমলেও বৈষম্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
অর্থনীতিবিদদের মতে, দারিদ্র্য কমার পাশাপাশি আয়বৈষম্যের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ভারতীর ব্যাখ্যা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি। জাতীয় গড় আয় একই থাকলেও আয় যদি তুলনামূলক সমানভাবে বণ্টিত হয়, তাহলে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের সংখ্যা সাধারণত কম হয়।
বৈষম্যের আরেকটি বড় দিক হলো সুযোগের অসমতা। আয়বৈষম্য বাড়লে পরিবারগুলোর মধ্যে শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, ব্যবসা শুরুর মূলধন কিংবা ভালো চাকরির সন্ধানে ব্যয় করার সক্ষমতায় বড় ব্যবধান তৈরি হয়।
এ ছাড়া সম্পদের অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। বিপুল সম্পদের মালিক একটি ছোট গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে নীতি ও প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবিত করার সুযোগ পায়। এতে সাধারণ মানুষের স্বার্থ উপেক্ষিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
দারিদ্র্য ও বৈষম্য একসঙ্গে মোকাবিলা করবে কীভাবে ভারত?
আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ দীপা সিনহার মতে, দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্য কমাতে ভারতকে সম্পদের পুনর্বণ্টনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, ভারতে দারিদ্র্য দূরীকরণ নিয়ে আলোচনা হলেও বৈষম্য কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত উদ্যোগ যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে আরও প্রগতিশীল করব্যবস্থা চালু করা জরুরি, যাতে উচ্চ আয়ের মানুষ ও সম্পদের মালিকদের কাছ থেকে তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী কর আদায় করা যায়।
পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক সেবায় সর্বজনীন সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসা সবার জন্য নিশ্চিত করা গেলে একই সঙ্গে দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমানো সম্ভব।
নীতিন কুমার ভারতীর মতে, দারিদ্র্য হ্রাসের জন্য বিচ্ছিন্ন কোনো কর্মসূচি যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অগ্রগতির জন্য একাধিক নীতিকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তর থেকে ভারতের শেখার সুযোগ রয়েছে। কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, দ্রুত শিল্পায়ন, গ্রাম থেকে শহরে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং অবকাঠামো ও মানবসম্পদে ব্যাপক বিনিয়োগের মাধ্যমে চীন দারিদ্র্য কমাতে সক্ষম হয়েছে।
ভারতের বর্তমান নীতিগত অগ্রাধিকারে ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে করেন ভারতী। তাঁর মতে, অনেক ক্ষেত্রে এই বিনিয়োগের সুবিধা সমাজের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ মানুষের কাছে বেশি পৌঁছাচ্ছে, অথচ বাকি ৯০ শতাংশ মানুষের প্রয়োজনও সমান গুরুত্ব দাবি করে।
সড়ক, পরিবহন ও অন্যান্য অবকাঠামো মানুষের অর্থনৈতিক সুযোগের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে। তবে এর পাশাপাশি মানসম্মত সরকারি বিদ্যালয় ও হাসপাতাল গড়ে তোলাও জরুরি। কারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নিশ্চিত না হলে সাধারণ মানুষ অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুফল পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারবে না।
ভারতীর মতে, সরকারকে দারিদ্র্য হ্রাসের পাশাপাশি বৃহত্তর অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার নীতি গ্রহণ করতে হবে। আর এই বিনিয়োগের অর্থ জোগাতে প্রগতিশীল করব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এতে নাগরিকদের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী উন্নয়নের ব্যয় বহনের সুযোগ তৈরি হবে।
ভারতের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সমন্বয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব। কিন্তু দারিদ্র্যের হার কমে গেলেই অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না। সম্পদ ও সুযোগের সুষম বণ্টন, মানসম্মত শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবা এবং মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে না পারলে প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের বড় একটি অংশের কাছে অসমভাবে পৌঁছানোর ঝুঁকি থেকেই যায়।



