শামছুল হুদা || রাষ্ট্র ও সমাজের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, বৈষম্য এবং মানুষের অধিকারহরণের ঘটনা জনসমক্ষে তুলে ধরাই সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান কাজ। এসব কাজ না করে অনেকেই গণমাধ্যমের পরিচয়পত্র প্রদর্শন করে নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে চলেছেন। ফলে বর্তমান সময়ে অনেকের কাছে সাংবাদিকতার পরিচয় নির্ধারণে একটি পরিচয়পত্রই যেন যোগ্যতার মাপকাঠি হয়ে উঠেছে।
একজন সাংবাদিকের দক্ষতার প্রকাশ ঘটে অনুসন্ধানে, সততার পরিচয় মেলে তথ্য যাচাইয়ে, নিরপেক্ষতা ফুটে ওঠে সব পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরায় এবং সাহসের প্রমাণ পাওয়া যায় জনস্বার্থের প্রশ্নে আপসহীন থাকায়। সাংবাদিকতা ক্ষমতাবানদের প্রশংসা করার জন্য নয়, বরং তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য। গুজব ছড়ানো নয়, নির্ভরযোগ্য তথ্যে সত্য উদ্ঘাটনই সাংবাদিকের লক্ষ্য।
গণমাধ্যম থেকে পাওয়া পরিচয়পত্র সংশ্লিষ্টতার একটি প্রমাণ মাত্র। কিন্তু সেটিই সাংবাদিকতার দক্ষতা বা যোগ্যতার চূড়ান্ত সনদ নয়। পরিচয়পত্র কাউকে সংবাদ সংগ্রহের কৌশল, তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা কিংবা পেশাগত নৈতিকতা শেখায় না। নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, বস্তুনিষ্ঠতা ও জনস্বার্থে কাজ করার মধ্য দিয়েই একজন সাংবাদিকের পেশাগত পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
উদ্বেগের বিষয় হলো, সাংবাদিকতার সঙ্গে নিয়মিত সম্পৃক্ততা ও পেশাগত অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও লবিং, গ্রুপিং কিংবা আর্থিক প্রভাবে সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্বে চলে আসার বিষয় । এর ফলে নিয়মিত মাঠে কাজ করা সাংবাদিকরা সংগঠনে যথাযথ প্রতিনিধিত্ব ও নেতৃত্বের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে, কখনো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যারা সংবাদ সংগ্রহ করেন, তাদের অবদান যদি সংগঠনের নেতৃত্ব নির্ধারণে যথাযথ গুরুত্ব না পায়, তবে তা পেশাদার সাংবাদিকতার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের চোখে পুরো সাংবাদিক সমাজের ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
গণমাধ্যমের পরিচয়পত্রধারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে অযোগ্য বলা যেমন অন্যায্য, তেমনি পরিচয়পত্র থাকলেই কাউকে দক্ষ সাংবাদিক হিসেবে বিবেচনা করাও যুক্তিসংগত নয়। মূল্যায়নের ভিত্তি হওয়া উচিত তার কাজ, পেশাগত সম্পৃক্ততা, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতা—পরিচয়পত্রের বাহ্যিক প্রদর্শন নয়।
এই গ্লানি থেকে সাংবাদিকতা পেশাকে মুক্ত করার সময় এখনই। প্রথমত, মিডিয়া হাউসগুলোকে পরিচয়পত্র ইস্যু করার ক্ষেত্রে কঠোর নীতি ও দায়বদ্ধতা বজায় রাখতে হবে। একজন সংবাদকর্মী সত্যিই সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত কি না, তার নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, সাংবাদিকদের বিভিন্ন ইউনিয়ন ও প্রেস ক্লাবগুলোকে তাদের সদস্যপদ প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। যারা বছরের পর বছর কোনো নিউজ করেননি, তাদের অতিসত্বর চিহ্নিত করে নেতৃত্ব ও সংগঠন থেকে বাদ দিতে হবে।
সাংবাদিকতা কোনো ক্ষমতার হাতিয়ার নয়, ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির মাধ্যমও নয়। এটি জনগণের জানার অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্র ও সমাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। পরিচয়পত্র সাংবাদিকতার সহায়ক পরিচয় মাত্র, কিন্তু কখনোই সাংবাদিকতার বিকল্প নয়। পেশাগত যোগ্যতা, সততা ও জনস্বার্থে কাজ করার মানসিকতাই হোক একজন সাংবাদিকের প্রকৃত মূল্যায়নের ভিত্তি।
সাংবাদিকতাকে ক্ষমতার হাতিয়ার বা ব্যক্তিগত স্বার্থোদ্ধারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার এই অপসংস্কৃতি রুখে দিতে না পারলে, একদিন গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের ন্যূনতম বিশ্বাসটুকুও হারিয়ে যাবে। সুস্থ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার স্বার্থে এই ‘কার্ডধারী ছদ্মবেশী’ সাংবাদিকদের বর্জন করা এখন সময়ের দাবি।



