জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে শুধু ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে দেখলে তাঁর সাহিত্যচিন্তার একটি বড় অংশ অগোচরে থেকে যায় বলে মন্তব্য করেছেন কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও নজরুল গবেষক আবদুল হাই শিকদার। তাঁর মতে, অন্যায়, শোষণ, পরাধীনতা ও ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে নজরুল যেমন তীব্র কণ্ঠে কথা বলেছেন, তেমনি তাঁর সাহিত্যজুড়ে রয়েছে প্রেম, প্রকৃতি, মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা, নারী স্বাধীনতা ও সাম্যের গভীর অনুষঙ্গ।
বাংলা সাহিত্যে নজরুলের যুগান্তকারী প্রভাব, জাতীয় জীবনে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা এবং তাঁর সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা নিয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন আবদুল হাই শিকদার।
তিনি বলেন, মাত্র এক দশকের মধ্যে, ১৯২০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে, নজরুল বাংলা সাহিত্যে কবি থেকে যুগের নায়কে পরিণত হন। তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় মানুষের যে প্রতিবাদী ভাষার প্রয়োজন ছিল, নজরুল তাঁর কবিতা, গান ও সাংবাদিকতার মাধ্যমে সেই শূন্যতা পূরণ করেন।
আবদুল হাই শিকদারের ভাষায়, নজরুলের সৃষ্টিতে পরাধীনতা, শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে তীব্র প্রতিবাদ উঠে এসেছে, তা তাঁকে সমকালীন অন্য অনেক সাহিত্যিকের থেকে স্বতন্ত্র করে তুলেছিল। ১৯২২ সালেই তিনি সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক চেতনা, নারী মুক্তি ও মুক্ত সাংবাদিকতায়ও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
নজরুলের সাহিত্যেই যুগের দাবি
নজরুলের প্রতিভার যথার্থ মূল্যায়ন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর করেছিলেন বলেও উল্লেখ করেন আবদুল হাই শিকদার। ১৯২২ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সী নজরুলকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য উৎসর্গ করেছিলেন।
আবদুল হাই শিকদারের মতে, নজরুলের সাহিত্য শুধু তৎকালীন সময়ের রাজনৈতিক প্রতিবাদকে ধারণ করেনি, বরং মানুষের গভীর আত্মিক আকাঙ্ক্ষাকেও ভাষা দিয়েছে। এ কারণেই তিনি একই সঙ্গে যুগের নায়ক ও জনগণের নায়ক হয়ে উঠেছিলেন।
জাতীয় কবি কেন নজরুল
কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি হিসেবে দেখার ব্যাখ্যায় আবদুল হাই শিকদার বলেন, একটি জাতির আশা, আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, সংগ্রাম, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য যার রচনায় পূর্ণাঙ্গভাবে উঠে আসে, তিনিই সেই জাতির জাতীয় কবি।
তাঁর মতে, নজরুলের সাহিত্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, গণমুখী সাংবাদিকতা ও অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি শ্যামাসঙ্গীত, ভজন, কীর্তনের পাশাপাশি ইসলামী গান, হামদ ও নাত রচনা করেছেন। কোনো ধর্ম বা সম্প্রদায়কে ছোট না করে সব মানুষের প্রতি সমান মর্যাদার দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর সৃষ্টির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
প্রেম ও প্রকৃতির কবিও নজরুল
নজরুলকে কেবল বিদ্রোহী কবির পরিচয়ে সীমাবদ্ধ রাখা তাঁর সাহিত্যিক সত্তার প্রতি সুবিচার নয় বলে মনে করেন এই গবেষক।
তিনি বলেন, নজরুলের প্রেম ও প্রকৃতির সাহিত্যিক রূপটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘দোলনচাঁপা’, ‘ছায়ানট’, ‘চক্রবাক’ ও ‘সিন্ধু-হিন্দোল’-এর মতো কাব্যগ্রন্থে তাঁর ভিন্ন এক সৃষ্টিসত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। বাংলা সাহিত্যে প্রথম সফল ও পূর্ণাঙ্গ গজলের প্রবর্তনও তাঁর হাত ধরে হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
প্রকৃতিও নজরুলের কবিতা ও গানে বিশেষভাবে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। সংগ্রামী চেতনার পাশাপাশি প্রেম, প্রকৃতি, বিপ্লব, বিদ্রোহ এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার সমন্বয় তাঁর সাহিত্যকে স্বতন্ত্র মাত্রা দিয়েছে।
মানবতা ও সাম্যের কবি
আবদুল হাই শিকদারের মতে, নজরুলের বিদ্রোহ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর বিদ্রোহ ছিল সাম্রাজ্যবাদ, অন্যায়, শোষণ ও অনাহারের বিরুদ্ধে এবং মানবতার মুক্তির পক্ষে।
নজরুলের ‘সাম্যবাদী’, ‘সর্বহারা’, ‘ভাঙার গান’ ও ‘প্রলয়শিখা’সহ বিভিন্ন রচনায় শোষিত মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তাঁর মতে, নজরুলের আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল বিস্তৃত। দেশ ও সময়ের সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বের নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের পক্ষে তাঁর কণ্ঠ উচ্চারিত হয়েছে।
নারী স্বাধীনতায়ও উচ্চকণ্ঠ নজরুল
নারীর মর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রশ্নেও নজরুলের অবস্থান ছিল স্পষ্ট। আবদুল হাই শিকদার বলেন, নজরুল নারীকে শুধু কন্যা, মাতা কিংবা জায়া হিসেবে দেখেননি; নর-নারীকে পরস্পরের পরিপূরক ও পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে দেখেছেন।
ইতিহাসে নারীর অবদান তুলে ধরার পাশাপাশি তিনি নারীর জাগরণের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর ‘নারী’ কবিতাকে বাংলা সাহিত্যে নারীকে নিয়ে রচিত গুরুত্বপূর্ণ কবিতাগুলোর একটি হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি।
তরুণদের কাছেও নজরুল প্রাসঙ্গিক
ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগেও তরুণদের মধ্যে নজরুলের সাহিত্য ও সংগীতের চর্চা রয়েছে বলে মনে করেন আবদুল হাই শিকদার।
তাঁর মতে, সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাপন ও সাংস্কৃতিক অভ্যাস বদলালেও নজরুলের সৃষ্টির আবেদন শেষ হয়ে যায়নি। নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা আধুনিক পরিবেশনার মাধ্যমে নজরুলের গানকে নতুন শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, নজরুল নিজেই বাংলা আধুনিক গানের বিকাশে বড় ভূমিকা রেখেছেন এবং তাঁর সৃষ্টিতে কোনো নির্দিষ্ট ছাঁচের বন্দিত্ব ছিল না। ফলে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের নতুন আঙ্গিকে নজরুলকে উপস্থাপনের মধ্য দিয়েও তাঁর সৃষ্টির ধারাবাহিকতা বজায় থাকছে।
জাতীয় কবির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিষয়টি স্থায়ী করার আহ্বান
২০২৪ সালে সরকারি গেজেটের মাধ্যমে কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হলেও এ স্বীকৃতিকে পৃথক আইনের মাধ্যমে স্থায়ী করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন আবদুল হাই শিকদার।
তিনি বলেন, গেজেটের মাধ্যমে দেওয়া স্বীকৃতিকে চূড়ান্ত আইনি কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তাঁর মতে, নজরুল বর্ষের মতো একটি সময়ে এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে জাতীয় কবিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানানোর প্রক্রিয়া আরও পূর্ণতা পাবে।
আবদুল হাই শিকদারের মতে, নজরুলের সাম্য, মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শোষণবিরোধী চেতনা শুধু অতীতের বিষয় নয়। দেশ ও বিশ্বের পরিবর্তিত বাস্তবতায়ও এসব মূল্যবোধের প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে।
নজরুলকে নতুন করে পড়া ও তাঁর সাহিত্যচর্চা বাড়ানোর মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্মের কাছে তাঁর বহুমাত্রিক সৃষ্টিসত্তা আরও গভীরভাবে তুলে ধরা সম্ভব বলেও তিনি মনে করেন।



