সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন গ্রেডভেদে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে নতুন বেতন কাঠামোর পুরোপুরি বাস্তবায়ন হবে ধাপে ধাপে।
শনিবার দুপুরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে ‘সরকারি চাকুরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ শিরোনামে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে এতে স্বাক্ষর করেন অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে। গ্রেড অনুযায়ী মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের বেতন কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
তিন ধাপে বাড়বে মূল বেতন
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নতুন পে স্কেলের মূল বেতন ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হবে। তবে বেতন বৃদ্ধির আর্থিক সুবিধা একবারে দেওয়া হবে না। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭ সালের মধ্যে মোট তিন ধাপে নতুন মূল বেতন বাস্তবায়ন করা হবে।
অর্থাৎ, প্রজ্ঞাপন জারি হলেও সব গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারী একসঙ্গে নতুন কাঠামোর পূর্ণ বেতন পাবেন না। নির্ধারিত ধাপ অনুযায়ী ধীরে ধীরে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হবে।
সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধি
নতুন বেতন কাঠামোতে প্রথম থেকে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ প্রায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি।
২০তম গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ এ গ্রেডে মূল বেতন বেড়েছে ১৪২ শতাংশের বেশি।
অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের কর্মকর্তাদের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতনও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
নতুন কাঠামোয় গ্রেডভেদে বেতন বৃদ্ধির হার ভিন্ন হওয়ায় প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ নির্ভর করবে তার বর্তমান গ্রেড ও নির্ধারিত ধাপের ওপর।
ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সাল থেকে
শুধু মূল বেতন নয়, সরকারি চাকরিজীবীদের বিভিন্ন ভাতাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে এসব ভাতা নতুন মূল বেতনের সঙ্গে একসঙ্গে কার্যকর হবে না।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর করার কথা রয়েছে। ফলে নতুন পে স্কেলের আর্থিক প্রভাব পুরোপুরি অনুভূত হতে আরও সময় লাগবে।
পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও নতুন কাঠামোর প্রভাব পড়বে। তাদের নিট পেনশনও ধাপে ধাপে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাড়বে সরকারের ব্যয়
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ফলে সরকারের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বাড়ানোর কারণে সরকারের বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে জানানো হয়েছে।
এই অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে সরকারের বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান রাখা হবে। নতুন পে স্কেলের আর্থিক প্রভাব সামাল দিতে রাজস্ব আয়, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং বাজেট পরিকল্পনার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হবে।
দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর গেজেট
নতুন পে স্কেল অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু হয় বেশ কিছুদিন আগে। গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন দেওয়া হয়।
এরপর প্রজ্ঞাপনের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভেটিং শেষে প্রজ্ঞাপনটি বিজি প্রেসে পাঠানো হয়। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর শনিবার অর্থ বিভাগ থেকে তা প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করা হলো।
এর আগে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর নতুন বেতন কাঠামো দ্রুত প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশের কথা জানানো হয়েছিল।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় পরিবর্তন
নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন বৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্য হওয়ায় তাদের মাসিক আয় আগের তুলনায় বাড়বে।
তবে বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং বিভিন্ন ভাতার কার্যকর হওয়ার সময়ও সরকারি চাকরিজীবীদের আর্থিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কারণ মূল বেতন বাড়লেও ভাতাগুলোর পূর্ণ সুবিধা পেতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
নতুন পে স্কেলের মাধ্যমে একদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এসেছে, অন্যদিকে এর বাস্তবায়ন, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দেওয়াও সামনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।




