মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষকে আলো ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রণ এবং এর মাধ্যমে মস্তিষ্কের কার্যক্রম বোঝার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী অবদানের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ বছর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কার্ল ডেইসেরথ এবং জার্মানির পিটার হেগেমান ও জর্জ নাগেল।
অপ্টোজেনেটিকস নামে পরিচিত এই প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষে আলো প্রয়োগ করে সেগুলো সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করা যায়। এর ফলে শেখা, ভয়, আসক্তি ও চলাফেরার মতো আচরণের সঙ্গে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোষ ও স্নায়ুপথের সম্পর্ক বোঝার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নোবেল অ্যাসেম্বলি বলেছে, স্নায়ুকোষের জন্য একটি ‘আণবিক সুইচ’ আবিষ্কারের জন্য তিন বিজ্ঞানীকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কার্ল ডেইসেরথ বলেন, এই সম্মান তাঁর কাছে অবিশ্বাস্য এবং অপ্রত্যাশিত। নোবেল কমিটির ফোন পাওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে গভীর রাত ছিল। তিনি ঘুমাতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
অপ্টোজেনেটিকস প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকেরা এখন মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুপথ আলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন। এর মাধ্যমে স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত স্নায়ু সার্কিট শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। স্নায়বিক ও মানসিক বিভিন্ন রোগের কারণ ও কার্যপ্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
মানুষের চিকিৎসায় এখনো এর ব্যবহার সীমিত। বিশেষ করে নির্দিষ্ট ধরনের অন্ধত্বের চিকিৎসায় পরীক্ষামূলকভাবে এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে। ভবিষ্যতে পারকিনসনস রোগ ও মৃগীরোগের মতো জটিল স্নায়বিক রোগের চিকিৎসায় অপ্টোজেনেটিকস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।
জর্জ নাগেল বলেন, মানুষের চিকিৎসায় প্রযুক্তিটির ব্যবহার এখনো সীমিত হওয়ায় তিনি মনে করেছিলেন নোবেল পুরস্কারের জন্য সময়টা হয়তো এখনো আসেনি। পুরস্কারের ঘোষণা পাওয়ার সময় তিনি ইতালিতে ছিলেন।
নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান পার স্ভেনিংসন বলেন, অপ্টোজেনেটিকস মস্তিষ্ক সম্পর্কে মানুষের বোঝাপড়ায় মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে এমনভাবে মস্তিষ্কের মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যা একসময় কেবল কল্পনা করা যেত।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের নিউরোটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক সাইমন শুলৎস বলেন, এই নোবেল পুরস্কার অনেক দিন ধরেই প্রত্যাশিত ছিল। আলো ও জেনেটিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে নির্দিষ্ট কোষ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
সবুজ শৈবাল থেকে যুগান্তকারী আবিষ্কার
অপ্টোজেনেটিকসের ভিত্তি তৈরি হয় সবুজ শৈবাল নিয়ে গবেষণা থেকে। ২০০০-এর দশকের শুরুতে পিটার হেগেমান ও জর্জ নাগেল একটি শৈবালে এমন একটি প্রোটিন আবিষ্কার করেন, যা নীল আলো পড়লে কোষে বৈদ্যুতিক চার্জ তৈরি করতে পারে।
পরে কার্ল ডেইসেরথ ওই প্রোটিন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় জিন স্নায়ুকোষে প্রবেশ করান। ইঁদুরের ওপর পরীক্ষায় দেখা যায়, আলো প্রয়োগ করলে ওই স্নায়ুকোষে বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি হয়।
২০০৫ সালে তিনি এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশ করেন। এর দুই বছর পর জীবিত ইঁদুরের মস্তিষ্কে আলো ব্যবহার করে স্নায়ুকোষ নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিও সফলভাবে প্রয়োগ করেন।
ডেইসেরথ একই সঙ্গে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে গুরুতর মানসিক ও স্নায়ুবিক সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা করেন। তাঁর মতে, রোগীদের চিকিৎসার অভিজ্ঞতা গবেষণাগারের কাজকে বাস্তব মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত রাখতে সহায়তা করে।
জার্মানির হুমবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিটার হেগেমানের বয়স ৭১ বছর। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কার্ল ডেইসেরথের বয়স ৫৪ এবং জার্মানির ভুরৎসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োফিজিকসের অধ্যাপক জর্জ নাগেলের বয়স ৭৩ বছর।
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্ৎস এ পুরস্কারকে জার্মান গবেষণার উচ্চমানের স্বীকৃতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে বিজ্ঞান গবেষণায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেছেন।
নোবেল পুরস্কারের অংশ হিসেবে তিন বিজয়ী একটি সনদ, স্বর্ণপদক এবং মোট ১২ লাখ মার্কিন ডলার অর্থ পাবেন। আগামী ১০ ডিসেম্বর নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হবে। ১৮৯৬ সালের এই দিনে পুরস্কারের প্রতিষ্ঠাতা বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেল মারা যান।- এএফপি




