Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
আন্তর্জাতিক

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে ডেমোক্র্যাটরা: যেভাবে জয়, ট্রাম্পের জন্য কী বার্তা

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে ডেমোক্র্যাটরা: যেভাবে জয়, ট্রাম্পের জন্য কী বার্তা

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক সাফল্য পেয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ, কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে দলটি। এর ফলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর নজরদারি, তদন্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ আটকে দেওয়ার মতো ক্ষমতা পাবে বিরোধী দল। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কংগ্রেসের ক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এমনকি যেসব অঙ্গরাজ্যে কয়েক দশক ধরে দলটি সিনেট নির্বাচনে জিততে পারেনি, সেখানেও এসেছে বড় সাফল্য। ১০০ আসনের সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা ৫৪টি আসনে জয় পেয়েছে এবং আরও দুটি আসনে এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪৩৫ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদেও প্রয়োজনীয় ২১৮ আসনের বেশি পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে দলটি।

এ ফলাফলের মধ্য দিয়ে বারাক ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদের পর প্রথমবারের মতো এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, যখন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের কোনো কক্ষেই নিজ দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারলেন না।

বেশ কয়েকটি আসনের ফল তখনো চূড়ান্ত না হওয়ায় পূর্ণাঙ্গ ফল জানতে আরও কয়েক দিন লাগতে পারে। তবে ডেমোক্র্যাটদের এই বিজয়কে ইতিমধ্যে ট্রাম্পের রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখছেন দলটির নেতারা। খোদ ট্রাম্পও স্বীকার করেছেন, নির্বাচনী প্রচারে বিরোধীরা তাদের চেয়ে ভালো করেছে।

সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়

সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসন নিজেদের দখলে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এর মধ্যে এমন কিছু অঙ্গরাজ্য রয়েছে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে দলটি জয় পায়নি।

টেক্সাসে রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকো। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প এই অঙ্গরাজ্যে ১৪ শতাংশ ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন। প্যাক্সটন ছিলেন ট্রাম্পের সমর্থনপুষ্ট প্রার্থী। তাঁর বিরুদ্ধে অতীতে জালিয়াতির অভিযোগে মামলা হয়েছিল এবং অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় অভিশংসিতও হয়েছিলেন তিনি। এবার অধিকাংশ ভোট গণনা শেষে ১১ শতাংশের বেশি ব্যবধানে এগিয়ে থেকে জয় নিশ্চিত করেন টালারিকো। ৩২ বছর পর টেক্সাসে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সিনেট নির্বাচনে জয় পেলেন।

কানসাসেও ইতিহাস গড়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটন। রিপাবলিকান রজার মার্শালকে হারিয়ে সিনেট আসনটি দখল করেছেন তিনি। কানসাসে সর্বশেষ ১৯৩২ সালে সিনেট নির্বাচনে জয় পেয়েছিল ডেমোক্র্যাটরা।

আইওয়ায় রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতে জয় পেয়েছেন জশ তুরেক। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প এই অঙ্গরাজ্যে ১৪ শতাংশ ব্যবধানে জিতেছিলেন। এবার সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীকে ৪ শতাংশ ব্যবধানে হারিয়েছেন তুরেক।

দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণে থাকা সিনেট আসনটিও হাতছাড়া হয়েছে। আসনটির সাবেক সিনেটর ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুর পর তাঁর বোন ডারলিনকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ট্রাম্পের জোরালো সমর্থনও ছিল তাঁর প্রতি। তবে নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজ অন্তত ৪ শতাংশ ব্যবধানে জয় পেয়েছেন।

উত্তর ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক হোয়াটলিকে প্রায় ২০ শতাংশ ব্যবধানে হারিয়ে জয় পেয়েছেন রয় কুপার। মেইনে সুসান কলিন্সকে প্রায় ৭ শতাংশ ব্যবধানে পরাজিত করে আসনটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে এনেছেন ট্রয় জ্যাকসন। ওহাইওতে জন হাস্টেডকে প্রায় ৪ শতাংশ ব্যবধানে হারিয়েছেন শেরড ব্রাউন।

অন্যদিকে, মিশিগানে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করেছেন আবদুল এল-সাইয়েদ। আসনটি আগে থেকেই ডেমোক্র্যাটদের দখলে থাকলেও তাঁর বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ, এল-সাইয়েদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর হতে যাচ্ছেন।

প্রতিনিধি পরিষদেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা

সিনেটের পাশাপাশি প্রতিনিধি পরিষদেও জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪৩৫ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২১৮ আসনের সীমা অতিক্রম করেছে দলটি। এর মধ্য দিয়ে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা বেশ কয়েকটি আসনও পুনরুদ্ধার করেছে তারা।

দুই কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ হারানো ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাটরা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না।

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে কী করতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা?

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুটি কক্ষই আইন প্রণয়ন ও সরকারি ব্যয় অনুমোদনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে কোনো একটি কক্ষ এককভাবে আইন পাস করতে পারে না। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, উভয় কক্ষের অনুমোদনের পরই কোনো বিল প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের জন্য পাঠানো হয়।

সিনেটের হাতে রয়েছে প্রেসিডেন্টের গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ অনুমোদন বা আটকে দেওয়ার বিশেষ ক্ষমতা। ফলে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় ট্রাম্পের মনোনীত মন্ত্রিসভার সদস্য, রাষ্ট্রদূত এবং ফেডারেল বিচারকদের নিয়োগ আটকে দিতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও তাদের বাধা দেওয়ার সুযোগ থাকবে।

এ ছাড়া সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ পায়। এসব কমিটির মাধ্যমে সরকারি কর্মকাণ্ডের তদন্ত, প্রয়োজনীয় নথি তলব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হাজির করার ক্ষমতা রয়েছে।

কংগ্রেসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা হলো অভিশংসন। প্রতিনিধি পরিষদ কোনো প্রেসিডেন্ট বা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাকে অভিশংসিত করলে সিনেটে তাঁর বিচার অনুষ্ঠিত হয়। সেই বিচারে দোষী সাব্যস্ত হলে পদ থেকে অপসারণের সুযোগ রয়েছে।

ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে ২০১৯ ও ২০২১ সালে দুবার অভিশংসিত হয়েছিলেন। তবে দুইবারই সিনেটে তিনি দায়মুক্তি পান।

আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান শক্তিশালী হবে। তবে এ ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন ট্রাম্প। কোনো বিল কংগ্রেসের দুই কক্ষে পাস হলেও প্রেসিডেন্ট তাতে ভেটো দিতে পারেন। ট্রাম্প ইতিমধ্যে তাঁর ভেটো ক্ষমতা ব্যাপকভাবে ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। সোমবার একটি পডকাস্টে তিনি বলেন, ‘আমি সবকিছুতেই ভেটো দেব।’

প্রেসিডেন্টের ভেটো অকার্যকর করতে হলে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। ফলে ডেমোক্র্যাটদের নিজেদের পাশাপাশি কিছু রিপাবলিকান সদস্যের সমর্থনও আদায় করতে হবে।

ট্রাম্প প্রশাসনকে কি জবাবদিহির মুখে ফেলতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা?

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্স ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো লরা ব্লেসিং মনে করেন, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর তদন্ত ও নজরদারির ক্ষমতা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করবে ডেমোক্র্যাটরা।

তিনি আলজাজিরাকে ই-মেইলে বলেন, সময় ব্যয় ও সংবাদমাধ্যমে আলোচনার পরিমাণ বিবেচনায় ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তই হবে ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে বড় তৎপরতা।

সিনেটের স্থায়ী তদন্ত উপকমিটির বর্তমান শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য রিচার্ড ব্লুমেনথাল নতুন পরিস্থিতিতে কমিটির চেয়ারম্যান হতে পারেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সেপ্টেম্বর মাসে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনে নথি ও তথ্য তলবের ক্ষমতাও ব্যবহার করা হবে।

কংগ্রেসের তদন্ত পরিচালনার জন্য হোয়াইট হাউসের অনুমতির প্রয়োজন হয় না। ফলে এ ক্ষমতা ব্যবহার করে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি করতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা।

গত দুই বছরে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ক্রিপ্টোকারেন্সি, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রেডিকশন মার্কেটসহ বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত হয়েছে। এ সময়ে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পদ আনুমানিক ২২০ কোটি ডলার বেড়েছে বলে চলতি বছর প্রকাশিত আর্থিক বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডেমোক্র্যাট সিনেটররা ইতিমধ্যে সম্ভাব্য তদন্তের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। বিভিন্ন কোম্পানি ও সরকারি দপ্তরে চিঠি পাঠিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংরক্ষণের নির্দেশনা দিয়েছেন তাঁরা। ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসের জন্য নির্মিতব্য বলরুমের অর্থায়নে বেসরকারি অনুদান সংগ্রহ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্তের অভিযোগও তাঁদের নজরদারির আওতায় রয়েছে।

তবে তদন্তের জন্য তলব করা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা করবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা আদালতে কংগ্রেসের সমন বা তলবের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। এতে তদন্ত কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছর পর্যন্ত বিলম্বিত হতে পারে।

লরা ব্লেসিং মনে করেন, ট্রাম্পের পরিবারের সদস্যরা তদন্তে হাজির না-ও হতে পারেন। তবে সরকারি কর্মকর্তা, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মীসহ আরও অনেককে জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ রয়েছে।

এসব তদন্তের মাধ্যমে ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অনিয়মের তথ্য সামনে আসতে পারে। তবে তদন্তে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়। ডেমোক্র্যাটরা কোনো অপরাধের তথ্য প্রসিকিউটরদের কাছে পাঠাতে পারলেও মামলা পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিতে হবে ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণাধীন বিচার বিভাগকে।

অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগও থাকবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো প্রেসিডেন্ট অভিশংসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পদ থেকে অপসারিত হননি।

এ কারণে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও প্রশ্ন রয়েছে, ট্রাম্পকে তদন্তের পেছনে কতটা সময় ব্যয় করা উচিত এবং ভোটারদের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা সমাধানে কতটা মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

ডেমোক্র্যাট সিনেটর শেলডন হোয়াইটহাউস দ্য হিলকে বলেন, তদন্তের ক্ষেত্রে কৌশলী ও বিচক্ষণ হতে হবে। একই সঙ্গে মার্কিন পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত তাৎক্ষণিক সমস্যাগুলো সমাধানের বিষয়টি যেন আড়ালে চলে না যায়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করতে পারবে কি ডেমোক্র্যাটরা?

নির্বাচনে জিতলেও আগামী ৩ জানুয়ারির আগে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ আনুষ্ঠানিকভাবে নিতে পারবে না ডেমোক্র্যাটরা। ফলে এর মধ্যবর্তী দুই মাস ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি মনে করেন, নির্বাচনে পরাজয়ের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটদের দায়িত্ব গ্রহণের আগেই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করতে পারেন।

তাঁর ভাষায়, রাজনৈতিক অপমান ও পরাজয়ের মুখে ট্রাম্পের আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠার প্রবণতা রয়েছে।

ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করতে উদ্যোগী হতে পারেন। এর অন্যতম উপায় হতে পারে যুদ্ধের জন্য বরাদ্দ অর্থ আটকে দেওয়া বা নতুন করে অর্থ বরাদ্দের বিরোধিতা করা।

বর্তমানে সামরিক অভিযানের জন্য আগে থেকে বরাদ্দ করা অর্থ ব্যয় করতে পারবে ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে থাকায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়তে পারে প্রশাসন।

ত্রিতা পারসির মতে, যুদ্ধ পরিচালনার জন্য নতুন করে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হলে তা সহজে অন্য খাত থেকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না। ফলে অর্থায়নে বাধা সৃষ্টি করে যুদ্ধের সময়সীমা সীমিত করার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে এ ক্ষেত্রেও প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা বড় বাধা। সামরিক ব্যয় কমানোর উদ্যোগে ডেমোক্র্যাটরা কতটা ঐক্যবদ্ধ হবেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের লরা ব্লেসিংয়ের মতে, মার্কিন সেনাদের দুর্বল করার অভিযোগ উঠতে পারে, এমন আশঙ্কায় ঐতিহাসিকভাবে ডেমোক্র্যাটরা সামরিক খাতে অর্থায়ন বন্ধ করার বিষয়ে সতর্ক থেকেছেন।

তবে যুদ্ধের বিরুদ্ধে চাপ তৈরির আরও পথ রয়েছে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান এবং এ ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন আইন মেনে চলছে কি না, তা নিয়ে তদন্ত করতে পারে দলটি।

সরকারি নজরদারিবিষয়ক স্বাধীন প্রতিষ্ঠান প্রজেক্ট অন গভর্নমেন্ট ওভারসাইটের নীতিবিশ্লেষক ডেভিড জানোভস্কির মতে, এ ধরনের কঠোর তদন্ত সরাসরি সামরিক অভিযান বন্ধ করতে পারবে না। তবে যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে প্রেসিডেন্ট ও তাঁর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হতে পারেন।

যুদ্ধ বন্ধের প্রশ্নে ডেমোক্র্যাটরা কতটা ঐক্যবদ্ধ হবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ত্রিতা পারসি সতর্ক করে বলেছেন, ডেমোক্র্যাটরা যদি ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো উদ্যোগ না নেন, তাহলে রাজনৈতিকভাবে তাঁদেরও এর দায় নিতে হবে। তাঁর মতে, তখন এটি আর শুধু ট্রাম্পের যুদ্ধ থাকবে না; যুদ্ধ বন্ধ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নিষ্ক্রিয় থাকার কারণে ডেমোক্র্যাটরাও এর অংশীদার হয়ে উঠবেন।

জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে কী করতে পারে ডেমোক্র্যাটরা?

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মার্কিন ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানি ও স্বাস্থ্যসেবার খরচ। এসব ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের জন্য কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে।

সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চের সহপ্রতিষ্ঠাতা অর্থনীতিবিদ ডিন বেকারের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর অন্যতম উপায় হতে পারে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া।

গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও সার বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে অস্থিরতার কারণে জ্বালানির বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে।

বেকারের মতে, যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সিনেটে তদন্ত হলে যুদ্ধ বন্ধের রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে। এতে পেট্রলের দাম কমার পাশাপাশি পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর চাপও কিছুটা কমতে পারে।

স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানোর বিষয়টিও ডেমোক্র্যাটদের অগ্রাধিকারে থাকতে পারে। ২০২৫ সালে সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা আইন বা অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের আওতায় বর্ধিত ভর্তুকির মেয়াদ শেষ হওয়ায় অনেক মার্কিন নাগরিকের স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়াম বেড়েছে। ডেমোক্র্যাটরা এ ভর্তুকি পুনর্বহাল এবং স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি মেডিকেইডে ট্রাম্প প্রশাসনের কাটছাঁট প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিতে পারেন।

সরকারি ব্যয়সংক্রান্ত আলোচনা ও বাজেট অনুমোদনের প্রক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে এসব বিষয়ে রিপাবলিকানদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করতে পারে দলটি। এসব উদ্যোগে দ্বিদলীয় সমর্থন এবং জনসমর্থন থাকায় ট্রাম্পের পক্ষে ভেটো দেওয়া রাজনৈতিকভাবে কঠিন হতে পারে বলে মনে করেন ডিন বেকার।

এ ছাড়া ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্ক প্রত্যাহারের উদ্যোগও নিতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। তবে এর জন্য প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের সমর্থনের পাশাপাশি প্রেসিডেন্টের অনুমোদন অথবা ভেটো অকার্যকর করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হবে।

এসব উদ্যোগ সফল হলেও পণ্যের দাম রাতারাতি কমবে না। গ্রাউন্ডওয়ার্ক কোলাবরেটিভের নীতি ও অ্যাডভোকেসি বিভাগের প্রধান অ্যালেক্স জ্যাকেজের মতে, পণ্যের দাম রকেটের মতো দ্রুত বাড়লেও পালকের মতো ধীরে কমে। ফলে শুল্ক প্রত্যাহার করলেও বাজারে তার প্রভাব পড়তে সময় লাগবে।

তবে প্রেসিডেন্টের অনুমোদন ছাড়াও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। সিনেটের বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় নিত্যপণ্যের দাম, বাড়িভাড়া ও বিদ্যুতের বিল বৃদ্ধির মতো বিষয় নিয়ে কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারবেন তাঁরা।

জ্যাকেজের মতে, কংগ্রেসের তদন্ত কমিটির নেতৃত্ব ও তথ্য তলবের ক্ষমতা ব্যবহার করে বড় কোম্পানির প্রধান নির্বাহীদের জবাবদিহির মুখোমুখি করা সম্ভব। অতীতেও এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে বাস্তব কিছু পরিবর্তন আনার নজির রয়েছে।

সব মিলিয়ে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি বাড়বে। তবে তদন্ত, নিয়োগ অনুমোদন এবং বাজেট নিয়ন্ত্রণের মতো ক্ষমতা থাকলেও সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা নেই। প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা, রিপাবলিকানদের অবস্থান এবং ডেমোক্র্যাটদের নিজেদের মধ্যে ঐকমত্যের ওপর নির্ভর করবে আগামী দিনের মার্কিন রাজনীতির গতিপথ।

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies