ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ২৭ অক্টোবরের জাতীয় নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন শিবির যেমন একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে দূরে, তেমনি বিরোধী দলগুলোও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন নিশ্চিত করতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের আরব দলগুলো হয়ে উঠেছে নির্বাচনের অন্যতম বড় আলোচ্য বিষয়।
২৮ অক্টোবর বুধবার ভোট গণনার প্রাথমিক হিসাবে আরব-প্রধান দুটি নির্বাচনী তালিকা সম্মিলিতভাবে ১৮ থেকে ১৯টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। ১২০ সদস্যের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। ফলে আরব দলগুলোর আসনসংখ্যা এবং তারা সরকার গঠনের প্রশ্নে কী অবস্থান নেয়, তা পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগে এই হিসাবকে নিশ্চিত ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এবারের নির্বাচনে আরব দলগুলোর সাফল্যের পেছনে রয়েছে আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভোটার উপস্থিতি বৃদ্ধি। প্রাথমিক প্রতিবেদনে এসব এলাকায় ভোটদানের হার প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং সংসদে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষা নতুন করে সামনে এসেছে।
কারা ইসরায়েলের আরব দল?
ইসরায়েলের আরব দল বলতে মূলত সেই রাজনৈতিক দলগুলোকে বোঝানো হয়, যেগুলোর সমর্থক ও প্রতিনিধিদের বড় অংশ দেশটির আরব নাগরিক। এই জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ নিজেদের ফিলিস্তিনি পরিচয়ের সঙ্গেও যুক্ত মনে করে। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতিতে তাদের প্রতিনিধিত্ব জনসংখ্যার অনুপাতে ছিল না।
আরব দলগুলোর মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্য রয়েছে। কোনো দল ইসলামপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাসী, কোনোটি বামপন্থী ও আরব-ইহুদি যৌথ আন্দোলনের পক্ষে, আবার কোনোটি ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের পুনর্বিন্যাসকে গুরুত্ব দেয়। তবে বৈষম্য, অপরাধ, আবাসন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সরকারি পরিষেবা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার তাদের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের সবাই অবশ্য আরব দলকে ভোট দেন না। কেউ কেউ ইহুদি-প্রধান ইসরায়েলি দলগুলোকেও সমর্থন করেন। ফলে আরব দলগুলোর নির্বাচনী শক্তি নির্ভর করে শুধু জনসংখ্যার অনুপাতের ওপর নয়, ভোটার উপস্থিতি, দলগুলোর ঐক্য এবং নির্বাচনী কৌশলের ওপরও।
২০২৬ সালের নির্বাচনে কী ঘটল?
ইসরায়েলের ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন ছিল নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব, নিরাপত্তানীতি, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পরবর্তী পরিস্থিতি এবং গাজায় যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে জনমত যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
২৮ অক্টোবর ভোট গণনার বিভিন্ন পর্যায়ে প্রকাশিত প্রাথমিক হিসাবে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন শিবির প্রায় ৫৪টি আসন পেতে পারে বলে দেখা যায়। বিরোধী শিবিরের আসনসংখ্যা ছিল আনুমানিক ৪৭ থেকে ৫০-এর মধ্যে। অন্যদিকে, আরব-প্রধান জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম সম্মিলিতভাবে ১৮ থেকে ১৯টি আসন পেতে পারে বলে হিসাব করা হচ্ছিল। এসব সংখ্যা গণনার অগ্রগতির সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছিল।
এই ফলাফলের রাজনৈতিক তাৎপর্য হলো, নেতানিয়াহুর শিবির আগের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারছে না বলে প্রাথমিক ইঙ্গিত মিলেছে। কিন্তু বিরোধীরাও এককভাবে সরকার গঠনের অবস্থানে নেই। ফলে সরকার গঠনের জন্য নতুন জোট, সমঝোতা কিংবা দীর্ঘ রাজনৈতিক দর-কষাকষির প্রয়োজন হতে পারে।
আরব দলগুলোর সামনে তাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: তারা কি বিরোধী শিবিরকে সরকার গঠনে সহায়তা করবে, নাকি নিজেদের দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য সংসদের বাইরে থেকে চাপ সৃষ্টি করবে? তাদের আসনসংখ্যা বড় হলেও অন্য দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক দূরত্ব এই সম্ভাবনাকে জটিল করে তুলেছে।
নির্বাচনের আগে আরব দলগুলোকে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা
নির্বাচনের আগে আরব দলগুলোর অংশগ্রহণ নিয়েও বড় ধরনের বিতর্ক হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখার পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে হাদাশের সংসদ সদস্য ওফের কাসিফ এবং বালাদের নেতা সামি আবু শাহাদেহের প্রার্থিতা নিয়েও সিদ্ধান্ত হয়।
আবেদনকারীদের অভিযোগ ছিল, সংশ্লিষ্ট দল ও প্রার্থীদের কিছু বক্তব্য ও অবস্থান ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় পরিচয় অস্বীকার কিংবা সশস্ত্র সংগ্রাম সমর্থনের পর্যায়ে পড়ে। তবে সংশ্লিষ্ট দলগুলো এসব অভিযোগের বিরোধিতা করে।
২ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করে। আদালত ওফের কাসিফের প্রার্থিতাও বহাল রাখে। ফলে দুই প্রধান আরব-প্রধান নির্বাচনী তালিকা ভোটে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়।
এই আইনি লড়াইয়ের গুরুত্ব ছিল সুস্পষ্ট। আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব শুধু নির্বাচনে কতটি আসন পাওয়া যাবে, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; বরং কোন রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে এবং কোন মতাদর্শ সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পাবে, সেই প্রশ্নও এর সঙ্গে যুক্ত।
কেন সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ আরব দলগুলো?
ইসরায়েলের সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকার গঠনের জন্য ১২০ আসনের নেসেটে অন্তত ৬১ জন সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। কোনো দল এককভাবে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে কয়েকটি দলের মধ্যে জোট গঠন করতে হয়।
২০২৬ সালের প্রাথমিক ফলাফলে নেতানিয়াহুর শিবির এবং বিরোধী শিবির, কোনোটিই ৬১ আসনের সীমায় পৌঁছাতে পারেনি। আরব দলগুলোর সম্মিলিত আসনসংখ্যা তাই সম্ভাব্য সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এখানে একটি বড় বাধা রয়েছে। নেতানিয়াহুর শিবির আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছে। বিরোধী শিবিরের মধ্যেও আরব দলগুলোকে আনুষ্ঠানিক জোটে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে আপত্তি রয়েছে। ফলে আরব দলগুলোর আসন থাকলেই তারা সরাসরি সরকার গঠনের অংশীদার হবে, এমন নয়।
তারা বিকল্পভাবে আস্থা ভোটে সমর্থন, বাইরে থেকে সরকারকে সহযোগিতা কিংবা নির্দিষ্ট আইন ও বাজেটের বিনিময়ে সমর্থন দেওয়ার কৌশল নিতে পারে। এ ধরনের ব্যবস্থা সরকার গঠনে সহায়ক হতে পারে, যদিও তা স্থিতিশীল সরকার নিশ্চিত করে না।
আরব ভোটারদের অংশগ্রহণ কেন বেড়েছে?
এবারের নির্বাচনে আরব-অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভোটার উপস্থিতি বৃদ্ধি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। প্রাথমিক প্রতিবেদনে কিছু এলাকায় ভোটদানের হার প্রায় ৮০ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আরব দলগুলোর আসনসংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এই অংশগ্রহণের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। আরব জনপদে অপরাধ ও সহিংসতা, সরকারি পরিষেবার ঘাটতি, ভূমি ও আবাসনসংক্রান্ত সমস্যা এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। একই সঙ্গে নেতানিয়াহুর সরকার ও উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির বিরোধিতাও নির্বাচনী অংশগ্রহণ বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
সামনে কী হতে পারে?
নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, ইসরায়েলের রাজনীতি এখন কয়েকটি সম্ভাব্য পথের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রথমত, নেতানিয়াহুর শিবির ছোট দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারে। দ্বিতীয়ত, গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবির বিভিন্ন দলের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের চেষ্টা করতে পারে। তৃতীয়ত, কোনো পক্ষই প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারলে সরকার গঠনের আলোচনা দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং নতুন নির্বাচনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এই প্রতিটি পরিস্থিতিতেই আরব দলগুলোর অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। তবে তাদের সমর্থন আদায়ের জন্য শুধু আসনের হিসাব যথেষ্ট নয়; নাগরিক অধিকার, স্থানীয় উন্নয়ন, নিরাপত্তা, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে সমঝোতার প্রয়োজন হবে।




