বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরি হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হেলিকপ্টারে দেশত্যাগের যে ভিডিও তাহসিফ শেয়ার করেছিলেন, সেটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোনোভাবে সম্পর্কিত কি না, তা তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে। সেদিনের অন্য কোনো ঘটনার ভিডিও ফুটেজও তার কাছে ছিল কি না, সেটিও যাচাই করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
বুধবার (৪ নভেম্বর) ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলামের আদালতে তাহসিফ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার এক নারী আসামির রিমান্ড শুনানি শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, শেখ হাসিনার হেলিকপ্টারে দেশত্যাগের ভিডিওটি তাহসিফ শেয়ার করেছিলেন। ভিডিওটি দেশের মানুষের কাছে ওই সময়ের দৃশ্য তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এ কারণে তাহসিফের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি জানান, তদন্ত কর্মকর্তা নির্দিষ্ট কোনো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে তদন্ত সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাহসিফের শেয়ার করা ভিডিও, সেদিনের অন্য কোনো ঘটনার ফুটেজ তার কাছে ছিল কি না এবং এসবের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র রয়েছে কি না, সব দিক বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এর আগে শুনানির শুরুতে তদন্ত কর্মকর্তা আগের রিমান্ডে পাওয়া তথ্য আদালতে তুলে ধরেন। পরে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, তদন্তে দুজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে তারা বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছেন। ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে তাদের আরও জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, তার মক্কেলকে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হলেও নিহত তাহসিফ নিজেই তাকে বাসায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে কোনো সমস্যা থাকলে এমনটি হওয়ার কথা নয় বলেও যুক্তি দেন তিনি। আসামির নারী ও শিক্ষার্থী পরিচয় বিবেচনায় নিয়ে তার পক্ষে আদালতে আবেদন জানান আইনজীবী।
উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত ওই নারী আসামির তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
দীপের ১৫ থেকে ২০ মিনিটের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন
তাহসিফ হত্যা মামলায় তার বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের ভূমিকা ও ঘটনার সময় তার অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে রাষ্ট্রপক্ষ। বিশেষ করে ঘটনার দিন নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে অবস্থানের সময় ১৫ থেকে ২০ মিনিটের জন্য অন্যদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার বিষয়টি তদন্তকারীদের নজরে এসেছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসান শাহাদাতের আদালতে দীপের রিমান্ড শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। চার দিনের রিমান্ড শেষে পুলিশ তাকে আবারও সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেছিল। শুনানি শেষে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন বলেন, নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে অবস্থানের সময় দীপ ১৫ থেকে ২০ মিনিটের জন্য অন্যদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান। ওই সময়ে তিনি কোথায় গিয়েছিলেন এবং কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, তা জানা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ, মুঠোফোনের কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) এবং আসামির বক্তব্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য, ঘটনার সময় আসামিদের অবস্থান এবং তাদের পারস্পরিক যোগাযোগের বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে আরও জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।
তবে দীপের আইনজীবী রিমান্ডের বিরোধিতা করেন। তার দাবি, আগের চার দিনের রিমান্ডেই তার মক্কেল প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়েছেন। নতুন করে রিমান্ড চাওয়ার যৌক্তিকতা নেই। এ ছাড়া রিমান্ডে তার স্বাস্থ্য ও খাবারের সুবিধা যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও উদ্বেগ জানান তিনি।
যেভাবে আলোচনায় আসে ভিডিওর বিষয়টি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময় হেলিকপ্টারে তার চলে যাওয়ার একটি ভিডিও তাহসিফ শেয়ার করেছিলেন। সম্প্রতি আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর বক্তব্যের পর ভিডিওটি আবারও আলোচনায় এসেছে। ভিডিওটি প্রকাশের পর শেখ হাসিনার দেশত্যাগের দৃশ্য দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
তবে ওই ভিডিওর সঙ্গে তাহসিফ হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তদন্তকারীরা বিষয়টিকে সম্ভাব্য একটি দিক হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে অনুসন্ধান করছেন।
উল্লেখ্য, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। পরদিন ২৮ অক্টোবর টঙ্গীর কাছে তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।




