একটি পাঠাগারের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার বই নয়, পাঠক। বইয়ের তাক যত সমৃদ্ধই হোক, চেয়ার-টেবিল যত সুন্দরই হোক, ভবন যত দৃষ্টিনন্দনই হোক, সেখানে যদি পাঠকের পদচারণা না থাকে, তবে সেই পাঠাগার তার মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
গতকাল দৈনিক নতুন জামালপুরের প্রতিবেদন অনুযায়ী জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ সরকারি গণগ্রন্থাগারের চিত্র আমাদের সামনে এমনই একটি প্রশ্ন হাজির করেছে। ভবন আছে, প্রায় ২০ হাজার বই আছে, সংবাদপত্র আছে, পাঠের পরিবেশ আছে। অথচ নিয়মিত পাঠক নেই। দেওয়ানগঞ্জে পরিস্থিতি আরও হতাশাজনক। বকশীগঞ্জে কিছু শিক্ষার্থী মাঝেমধ্যে এলেও বড় পরিসরের পাঠাগারের তুলনায় পাঠকের সংখ্যা অত্যন্ত কম।
এটি শুধু দুটি পাঠাগারের সমস্যা নয়। এটি আমাদের সমাজে বই ও পাঠাভ্যাসের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কতটা বদলে গেছে, তারও একটি প্রতিচ্ছবি।
একসময় পাঠাগার ছিল জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, ইতিহাস, বিজ্ঞান কিংবা পত্রিকা পড়তে শিক্ষার্থী ও তরুণদের ভিড় দেখা যেত। এখন সেই জায়গার বড় একটি অংশ দখল করেছে স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন বিনোদন। প্রয়োজনীয় কোনো তথ্য জানতে বইয়ের পাতা উল্টানোর বদলে কয়েক সেকেন্ডেই ইন্টারনেটে উত্তর পাওয়া যাচ্ছে।
প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করেছে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তথ্য পাওয়া আর জ্ঞান অর্জন এক বিষয় নয়। কয়েকটি সার্চের মাধ্যমে তথ্য জানা যায়, কিন্তু গভীরভাবে পড়ার অভ্যাস, চিন্তা করার ক্ষমতা, কল্পনাশক্তি ও মনন তৈরি হয় দীর্ঘ পাঠের মধ্য দিয়ে। একটি সমাজ যদি বই পড়ার অভ্যাস হারায়, তার প্রভাব শুধু পাঠাগারের খালি চেয়ার-টেবিলে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা সমাজের চিন্তা ও সংস্কৃতিতেও পড়ে।
তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত শুধু ‘পাঠক কেন আসছে না’ নয়, বরং ‘পাঠক তৈরি হচ্ছে না কেন’।
এ জন্য নতুন চিন্তা দরকার।
স্কুল-কলেজের সঙ্গে সমন্বয় করে শিক্ষার্থীদের পাঠাগারে নিয়ে আসা যেতে পারে। মাসে অন্তত একটি পাঠচক্র, বই পরিচিতি অনুষ্ঠান, কুইজ, বিতর্ক, রচনা প্রতিযোগিতা কিংবা শিশু-কিশোরদের বইপাঠ কর্মসূচি আয়োজন করা যেতে পারে। স্থানীয় লেখক, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়ে নিয়মিত পাঠ ও আলোচনা সভার আয়োজন করা যেতে পারে। পাঠকদের কাছ থেকে বইয়ের চাহিদা ও মতামত নেওয়া যেতে পারে।
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। সরকারি অফিসের সময়ের সঙ্গে পাঠাগারের সময় সবসময় মিলবে না। একজন চাকরিজীবী বা ব্যবসায়ী দিনের কর্মঘণ্টায় পাঠাগারে আসতে পারবেন না। ফলে অন্তত কিছুদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত পাঠাগার খোলা রাখার সুযোগ তৈরি করা গেলে নতুন পাঠকশ্রেণি যুক্ত হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পাঠাগার ব্যবস্থাপনায় ‘পাঠক’কে কেন্দ্রীয় জায়গায় ফিরিয়ে আনা। কত হাজার বই আছে, ভবন কত সুন্দর, কতগুলো চেয়ার রয়েছে, এসবের পাশাপাশি প্রতি মাসে কতজন পাঠক আসছেন, কতজন নতুন সদস্য হচ্ছেন, কোন ধরনের বই পড়ছেন, কী ধরনের কার্যক্রমে মানুষ সাড়া দিচ্ছে, সেসবের হিসাবও থাকা প্রয়োজন।
কারণ পাঠাগার কোনো নিছক সরকারি অবকাঠামো নয়। এটি একটি সমাজের জ্ঞানচর্চার স্থান। একটি পাঠাগারের দরজা খোলা থাকা মানেই সেখানে জ্ঞানচর্চা হচ্ছে না। বইয়ের তাক থেকে বই মানুষের হাতে পৌঁছালেই তার সার্থকতা।
দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জের সরকারি গণগ্রন্থাগারের খালি চেয়ার-টেবিল তাই আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখনই উদ্যোগ না নিলে হয়তো ভবিষ্যতে আরও বড় ভবন হবে, আরও বই আসবে, আরও আধুনিক আসবাব বসবে, কিন্তু পাঠক ফিরবে না।
আমরা চাই, পাঠাগার দুটির দরজা শুধু খোলা থাকুক না, সেখানে মানুষের পদচারণায় প্রতিদিন প্রাণ ফিরে আসুক। বই হোক অবসরের বিকল্প, চিন্তার সঙ্গী এবং নতুন প্রজন্মের জ্ঞানচর্চার অন্যতম মাধ্যম।

