কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সামাজিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ক্রমেই উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। কিশোরদের একটি অংশের অপরাধে জড়িয়ে পড়া, দলবদ্ধভাবে হামলা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদকসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা পরিবার ও সমাজকে ভাবিয়ে তুলছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের সব উপজেলায় কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) সভাপতি এবং সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) সদস্যসচিব করে কমিটি গঠনের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে শুধু কমিটি গঠন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এই উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তার ওপরই নির্ভর করবে এর সাফল্য।
কিশোর গ্যাং কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক সমস্যা নয়। এর পেছনে রয়েছে নানা ধরনের পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কারণ। পারিবারিক অবহেলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়মিত উপস্থিতি, মাদক ও অপরাধপ্রবণ পরিবেশের সংস্পর্শ, সুস্থ বিনোদনের অভাব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবশালীদের প্রশ্রয় অনেক ক্ষেত্রে কিশোরদের অপরাধের পথে ঠেলে দিতে পারে। আবার বন্ধুদের প্রভাব, দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং শক্তি প্রদর্শনের প্রবণতাও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। ফলে কেবল পুলিশি অভিযান কিংবা গ্রেপ্তারের মাধ্যমে কিশোর গ্যাংয়ের সমস্যা স্থায়ীভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন প্রতিরোধ, পুনর্বাসন ও সামাজিক সচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগ।
নতুন কমিটিগুলোকে প্রথমেই প্রতিটি উপজেলার কিশোর গ্যাংয়ের প্রকৃতি ও বিস্তার সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। কোন এলাকায় দলবদ্ধ কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা বেশি, কোথায় মাদক কেনাবেচা বা সেবনের ঝুঁকি রয়েছে, কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে অনিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়েছে এবং কোন সামাজিক কারণে কিশোরেরা অপরাধী চক্রের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, তা চিহ্নিত করা জরুরি। তবে এ ধরনের তথ্য সংগ্রহের নামে কোনো কিশোরকে প্রমাণ ছাড়া অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। কিশোরদের ব্যক্তিগত মর্যাদা, গোপনীয়তা ও আইনগত অধিকারও সুরক্ষিত রাখতে হবে।
কমিটির কার্যক্রম হতে হবে নিয়মিত ও জবাবদিহিমূলক। মাসে অন্তত একবার সভা আয়োজন, আগের সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন পর্যালোচনা, অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলো পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোনো এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বাড়লে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি কমিটির নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, দায়িত্ব বণ্টন এবং অগ্রগতি মূল্যায়নের পদ্ধতি থাকা প্রয়োজন। শুধু সভা আয়োজন ও প্রতিবেদন তৈরির মধ্যে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকলে এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।
কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের প্রশ্রয় বন্ধ করা বিশেষভাবে জরুরি। অনেক সময় অপরাধে জড়িত কিশোরেরা নিজেদের প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আশ্রয়ে নিরাপদ মনে করে। অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা পারিবারিক প্রভাব বিবেচনা না করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিরপরাধ কিশোরদের হয়রানি, গণহারে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা কিংবা আইনবহির্ভূত শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা কঠোরভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ ও প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা না গেলে কমিটির কার্যকারিতা নিয়ে মানুষের আস্থা তৈরি হবে না।
কিশোরদের সুস্থ বিকাশের জন্য খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, পাঠাগার, বিতর্ক, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। উপজেলা পর্যায়ে পরিত্যক্ত বা অব্যবহৃত মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানগুলোকে খেলাধুলা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের উপযোগী করে তোলা যেতে পারে। স্থানীয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করে নিয়মিত প্রতিযোগিতা ও অনুষ্ঠান আয়োজন করা সম্ভব। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের কিশোরদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। অপরাধ থেকে দূরে থাকার মতো ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি না করে শুধু অপরাধ দমনের আহ্বান জানালে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

