সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষত- ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানুষের নৈতিকতা, মানবিকতা ও মূল্যবোধ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। অভিভাবকেরা সন্তানকে ধর্মীয় শিক্ষকের কাছে পাঠান বিশ্বাস নিয়ে। তাঁদের প্রত্যাশা, সন্তান ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি ন্যায়-অন্যায়, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার শিক্ষা পাবে। কিন্তু সেই বিশ্বাসের জায়গায় যখন শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন তা কেবল একটি অপরাধের ঘটনা থাকে না, পুরো ব্যবস্থার জবাবদিহি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করে।
জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে মসজিদে আরবি পড়তে যাওয়া এক শিশুকে ধর্ষণের মামলায় মুছা মিয়া ওরফে মুছা হুজুরকে আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। ২০২০ সালের নভেম্বরে সংঘটিত এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর। আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এ রায় দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। শিশুর প্রতি এমন অপরাধ নিঃসন্দেহে নিন্দনীয়। পরিচয় কিংবা পেশার আড়ালে কোনো অপরাধীর দায় আড়াল করার সুযোগ নেই।
এ ঘটনা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হাজির করে: শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের পরিবেশ কতটা নিরাপদ? মসজিদ ও মাদ্রাসায় অসংখ্য শিক্ষক নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের অবদানকে খাটো করার সুযোগ নেই। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ উঠলে কিংবা অপরাধ প্রমাণিত হলে তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়াও দায়িত্বশীলতা নয়। বরং এমন ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করা জরুরি।
ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে শিশুদের প্রতি দয়া, আমানত রক্ষা, জুলুম থেকে বিরত থাকা এবং দুর্বলের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গভীরভাবে সম্পর্কিত। যে ব্যক্তি শিক্ষার্থীর আস্থা ও নির্ভরশীলতার সুযোগ নিয়ে তার ক্ষতি করে, সে শুধু শিশুর প্রতি অপরাধ করে না, শিক্ষকের মর্যাদা এবং ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি মানুষের বিশ্বাসকেও আঘাত করে।
এ ক্ষেত্রে আলেমসমাজের দায়িত্ব বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মসজিদের ইমাম, খতিব, মাদ্রাসার শিক্ষক, পরিচালনা কমিটি এবং ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সম্মিলিতভাবে শিশু সুরক্ষার বিষয়ে এগিয়ে আসা উচিত। শুধু অপরাধের নিন্দা জানানো যথেষ্ট নয়; অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি। ধর্মীয় শিক্ষার পরিবেশে নৈতিকতা ও জবাবদিহির চর্চা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
প্রথমত, মসজিদ ও মাদ্রাসায় শিশুদের সঙ্গে শিক্ষকদের আচরণের সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে পরিচয় ও যোগ্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পটভূমি যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা উচিত। প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিকে নিয়মিত তদারকি করতে হবে। কোনো অভিযোগ উঠলে তা গোপন করে রাখা, অভিযুক্তকে প্রভাব খাটিয়ে রক্ষা করা কিংবা ভুক্তভোগীকে চুপ থাকতে বাধ্য করা যাবে না। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, শিশুদের নিজেদের নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, ভয় দেখানো, প্রলোভন কিংবা অনুপযুক্ত আচরণের শিকার হলে তারা যেন নির্ভয়ে মা-বাবা, অভিভাবক বা বিশ্বস্ত দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে জানাতে পারে, সে পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শিশুদের এমনভাবে বোঝানো জরুরি যে অন্যায় আচরণের জন্য তারা দায়ী নয় এবং অভিযোগ জানালে তাদের অপমানিত বা দোষারোপ করা যাবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংস্কারের উদ্যোগ যেন কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা সম্প্রদায়কে সামগ্রিকভাবে সন্দেহের চোখে দেখার কারণ না হয়। অপরাধ ব্যক্তির, কিন্তু প্রতিরোধের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সমাজেরও। একইভাবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষার নামে অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সবার অগ্রাধিকার।

