Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
অন্যান্য

কেন আমার দেশ-এর ‘ভালো’ সংবাদপত্র হয়ে ওঠার প্রয়োজন নেই

নায়েল রহমান ।।

মাহমুদুর রহমান সম্পাদিত আমার দেশ পত্রিকাটি যথেষ্ট মানসম্পন্ন সংবাদপত্র নয়, এমন অভিযোগ অনেকের। কেউ কেউ আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, এটি আদৌ সংবাদপত্রের মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। সাধারণত এসব সমালোচনার ভিত্তি হলো, আমার দেশ একটি ডানপন্থী রাজনৈতিক অবস্থানের পত্রিকা এবং এর সাংবাদিকতা প্রচলিত পেশাগত মানদণ্ড পূরণ করতে পারে না।

তবে আমার দেশ-এর মতো একটি সংবাদপত্রের উদ্দেশ্য কী, তা বুঝতে না পারার কারণেই হয়তো এ ধরনের সমালোচনা করা হয়।

সব সংবাদপত্রের সাফল্যের সংজ্ঞা এক নয়। কোনো কোনো সংবাদপত্র সংবাদ পরিবেশন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও সম্পাদকীয় স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে। আবার কিছু সংবাদপত্রের প্রধান লক্ষ্য থাকে ঘটনাপ্রবাহকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করা, একটি আদর্শিক জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত রাখা এবং জনপরিসরের বিতর্কে প্রভাব বিস্তার করা। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে সাংবাদিকতা থাকে ঠিকই, তবে সেটিই তাদের মূল চালিকাশক্তি নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের কথা ধরা যাক। নির্ভরযোগ্য ও কর্তৃত্বপূর্ণ সংবাদ পেতে পাঠকেরা সাধারণত দ্য নিউইয়র্ক টাইমস কিংবা দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের দিকে ঝোঁকেন। অন্যদিকে, দ্য নিউইয়র্ক পোস্ট ও দ্য ওয়াশিংটন টাইমস দেশটির সংবাদমাধ্যমের জগতে ভিন্ন অবস্থান তৈরি করেছে। পত্রিকা দুটি নিজস্ব সংবাদও প্রকাশ করে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রতিবেদনও রয়েছে। তবে পাঠকের কাছে তাদের রাজনৈতিক পরিচয় ও অবস্থান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাজ্যের উদাহরণ আরও স্পষ্ট। ডেইলি মেইল ও ডেইলি এক্সপ্রেস অভিবাসন এবং সাংস্কৃতিক রাজনীতির মতো বিষয়ে সুস্পষ্ট সম্পাদকীয় অবস্থান নিয়ে বিপুল পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করেছে। তাদের পাঠকেরা অনেক সময় নিজেদের বিদ্যমান বিশ্বাস ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাখ্যা খুঁজতেই এসব পত্রিকা পড়েন।

এর অর্থ এই নয় যে, পক্ষপাতদুষ্ট সাংবাদিকতার কোনো মূল্য নেই। কিংবা আদর্শিক অবস্থান থাকলেই ভালো সাংবাদিকতা অসম্ভব হয়ে পড়ে। বরং এর অর্থ হলো, এ ধরনের সংবাদপত্রের সঙ্গে পাঠকের সম্পর্কের ধরন কিছুটা ভিন্ন।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমস কিংবা দ্য গার্ডিয়ানের গ্রহণযোগ্যতার বড় ভিত্তি তাদের সংবাদ পরিবেশনের নির্ভরযোগ্যতা। অন্যদিকে, একটি পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদপত্রের প্রভাবের উৎস হতে পারে রাজনৈতিক বিষয়ে তার সক্রিয় অবস্থান ও সম্পৃক্ততা। উভয়েই পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় থাকলেও তাদের মূল আকর্ষণ এক নয়।

আমার দেশ এই দ্বিতীয় ধারার সংবাদপত্রের কাছাকাছি।

মাহমুদুর রহমান সম্ভবত এই ব্যবস্থার অর্থনীতি ভালোভাবেই বোঝেন। সীমিত জনবল নিয়ে, কয়েকজন দক্ষ সাংবাদিকের সহযোগিতায় এমন একটি সংবাদপত্র পরিচালনা করা সম্ভব, যার রাজনৈতিক প্রভাব তার সম্পাদকীয় সামর্থ্যের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে। বিনিয়োগের বিপরীতে প্রাপ্তি এখানে মন্দ নয়।

বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রগুলোর সঙ্গে প্রতিটি সংবাদ বিভাগে প্রতিযোগিতা করা আমার দেশ-এর জন্য জরুরি নয়। বরং পত্রিকাটিকে দৃশ্যমান থাকতে হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ মহলে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করার মতো সক্ষমতা ধরে রাখতে হবে।

এখানে একটি অদ্ভুত সুবিধার বিষয় রয়েছে। যে সংবাদপত্রকে সমালোচকেরা পড়ার অযোগ্য বলে দাবি করেন, সেই পত্রিকার প্রকাশিত বিষয়বস্তু নিয়েই তাঁদের অনেক সময় প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়। কোনো জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা যদি দাপ্তরিক কাজ ফেলে একটি সংবাদপ্রতিবাদের জন্য প্রকাশ্যে পত্রিকাটির সমালোচনায় নামেন, তাহলে সংবাদপত্রটি ইতিমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অর্জন করেছে। তুলনামূলক কম খরচে প্রকাশিত একটি সম্পাদকীয় বক্তব্যকে সে রাজনৈতিক আলোচনার ঘটনায় পরিণত করতে পেরেছে।

ওই কর্মকর্তা হয়তো মনে করেন, তাঁর প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংবাদপত্রটির দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। অন্যদিকে, সংবাদপত্রটি পেয়েছে বাড়তি প্রচার এবং রাজনৈতিক ক্ষমতাকেন্দ্রকে অস্বস্তিতে ফেলার সক্ষমতার স্বীকৃতি।

এটি সম্পদ ও মনোযোগের এক অসম লড়াই। সংবাদপত্রটি তুলনামূলক কম বিনিয়োগ করছে, অথচ একজন সরকারি কর্মকর্তাকে এর চেয়ে অনেক বেশি সময় ও মনোযোগ ব্যয় করতে হচ্ছে। বিতর্কের ফলে পত্রিকাটির দৃশ্যমানতা বাড়ছে, প্রকাশিত সংবাদের সত্যতা কিংবা গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও। যে সংবাদপত্রের প্রধান পুঁজি রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা, তার জন্য বিতর্কও একধরনের সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।

আমার দেশ অতীতেও এই সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলনের সময় মাহমুদুর রহমান তাঁর পত্রিকার মাধ্যমে আন্দোলনের বিরোধী অবস্থান তুলে ধরেন এবং বিশেষ করে ধর্মীয় রক্ষণশীল জনগোষ্ঠীর মধ্যে সেই অবস্থানকে জোরালোভাবে প্রচার করেন। পত্রিকাটির সংবাদ পরিবেশন রাজনৈতিক বৈধতা ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে বৃহত্তর এক বিতর্কের অংশ হয়ে ওঠে।

ইতিবাচক অর্থেই বলা যায়, আমার দেশ তখন কেবল একটি ঘটনা বর্ণনা করেনি, বরং সেই ঘটনার রাজনৈতিক পরিসরে নিজেও সক্রিয় অংশ নিয়েছিল। সম্ভবত এটিই পত্রিকাটির জনপ্রিয়তার একটি ব্যাখ্যা। একটি পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদপত্রের সাংবাদিকতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সেটি রাজনৈতিক সংহতি ও জনমত সংগঠনের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। এর সমর্থকদের কাছে পত্রিকাটির গুরুত্বের একটি কারণ হলো, মূলধারার সংবাদমাধ্যম যেসব অবস্থান উপেক্ষা করে কিংবা যথাযথভাবে তুলে ধরে না বলে তাঁরা মনে করেন, আমার দেশ সেসব অবস্থান প্রকাশে আগ্রহী।

অবশ্য এই মডেলেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ধারাবাহিকভাবে ভুল তথ্য প্রকাশ করলে নিজস্ব অনুগত পাঠকগোষ্ঠীর বাইরেও পত্রিকাটির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। রাজনৈতিক প্রভাব কখনোই জবাবদিহির বিকল্প নয়। তবে এসব সমস্যা থাকলেও একটি পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদপত্রের প্রভাব যে একেবারে বিলীন হয়ে যাবে, এমন নয়।

বরং এর চেয়ে বড় বিপদ হলো মানুষের উদাসীন হয়ে পড়া। বাংলাদেশ এরই মধ্যে দেখেছে, একসময় প্রভাবশালী একটি আদর্শিক সংবাদপত্র জাতীয় আলোচনায় নিজের অবস্থান হারালে কী ঘটতে পারে।

দৈনিক ইনকিলাব একসময় দেশের রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যমের পরিসরে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছিল। পত্রিকাটির সম্পাদকীয় অবস্থান বিতর্ক তৈরি করত, রাজনৈতিক আলোচনাকে প্রভাবিত করত এবং উদারপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলোকে পাল্টা অবস্থান নিতে বাধ্য করত। কিন্তু বর্তমানে পত্রিকাটির বক্তব্য ও অবস্থান আগের মতো ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে না।

পত্রিকাটি এখনো প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমেছে। আমার দেশ-এর ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে সমালোচকদের অভিযোগের চেয়ে এই পতন অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। পক্ষপাত, অতিরঞ্জন কিংবা দুর্বল সাংবাদিকতার অভিযোগ নিয়েও একটি সংবাদপত্র টিকে থাকতে পারে। কিন্তু যে পাঠকগোষ্ঠী তার সঙ্গে আলোচনা ও বিতর্কে আগ্রহী, তাদের হারিয়ে ফেললে টিকে থাকা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে এ প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। বাংলার বাণী, দৈনিক কল্যাণ ও সংগ্রামের মতো সরাসরি রাজনৈতিক দলের মুখপত্রগুলো সাধারণত নিজেদের রাজনৈতিক সমর্থকগোষ্ঠীর বাইরে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। অন্যদিকে, জনকণ্ঠ ও নয়াদিগন্তের মতো তুলনামূলক বিস্তৃত রাজনৈতিক অবস্থানসম্পন্ন সংবাদপত্র আনুষ্ঠানিক দলীয় কাঠামোর বাইরেও পাঠক তৈরি করতে পেরেছে।

এর পেছনে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের সঙ্গে সংবাদপত্রগুলোর দূরত্বের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কোনো রাজনৈতিক দলের মুখপত্র মূলত পাঠককে জানায়, দলটি কী ভাবছে। অন্যদিকে, একটি পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদপত্র পাঠকের সামনে বৃহত্তর একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। সেখানে কিছুটা সম্পাদকীয় স্বাধীনতা, বৈচিত্র্য এবং কখনো কখনো অনিশ্চয়তা থাকে, যা পাঠকের আগ্রহ ধরে রাখতে সাহায্য করে।

তাই আমার দেশ-এর দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা নির্ভর করছে না সমালোচকদের কাছে নিজেদের সাংবাদিকতার মানদণ্ড প্রমাণ করার ওপর। বরং নির্ভর করছে, পত্রিকাটি তার কাঙ্ক্ষিত পাঠকগোষ্ঠীর কাছে কতটা অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে এবং সেই গণ্ডির বাইরেও কতটা মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে, তার ওপর। সমালোচনা, এমনকি বিদ্রূপও পত্রিকাটিকে সেই অবস্থানে টিকিয়ে রাখতে পারে।

একটি সংবাদপত্রকে মূল্যহীন বলা হলেও সেটি টিকে থাকতে পারে। প্রকৃত সংকট শুরু হয় তখন, যখন সেটি নিয়ে আলোচনা করার মতো আগ্রহও আর কারও থাকে না।- ডেইলি ওয়াদা

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies