Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
অন্যান্য

মানুষের কর্মকাণ্ডে থেমে গেল পরবর্তী বরফযুগের সূচনা- বলছেন বিজ্ঞানীরা

লরা প্যাডিসন ||

প্রায় ২০ হাজার বছর আগে বিশাল লরেন্টাইড বরফস্তর উত্তর মেরুবৃত্ত থেকে দক্ষিণে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্য পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কোনো কোনো স্থানে এর পুরুত্ব ছিল প্রায় দুই মাইল। একসময় উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সেই বরফস্তরের এখন অবশিষ্ট রয়েছে কেবল কানাডার নুনাভুট অঞ্চলের ব্যাফিন দ্বীপে অবস্থিত বার্নস আইস ক্যাপ। আয়তনে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়ার অঙ্গরাজ্যের প্রায় সমান।

প্রায় দুই হাজার বছর আগে এই বরফস্তরটি ধীরে ধীরে আবার সম্প্রসারিত হতে শুরু করে। নতুন এক গবেষণা বলছে, তাপমাত্রা কমে আসার কারণে বরফের এই বিস্তার পৃথিবীতে নতুন একটি হিমবাহ যুগ বা বরফযুগের সূচনার ইঙ্গিত দিচ্ছিল।

কিন্তু ১৯৬০ সালের দিকে পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে যায়। মানুষের কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে বরফস্তরটি সংকুচিত হতে শুরু করে।

গবেষণার অন্যতম লেখক এবং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যামন্ট-ডোহার্টি আর্থ অবজারভেটরির ভূরসায়নবিদ নিকোলাস ইয়ং বলেন, বরফের সম্প্রসারণ তখন কেবল শুরু হয়েছিল। সবকিছুই স্বাভাবিক নিয়মে চলছিল এবং পরবর্তী হিমবাহ যুগের সূচনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ সেই প্রক্রিয়া থেমে যায়। পৃথিবীর প্রাকৃতিক ব্যবস্থায় মানুষ কতটা বড় পরিবর্তন ঘটিয়েছে, এটি তার শক্তিশালী উদাহরণ।

লক্ষ লক্ষ বছর ধরে পৃথিবীতে বরফযুগ এসেছে এবং শেষ হয়েছে। পৃথিবীর কক্ষপথের পরিবর্তনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে এই চক্র পরিচালিত হয়। লরেন্টাইড বরফস্তরকে এ ধরনের পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেন বিজ্ঞানীরা।

নিকোলাস ইয়ং ও তাঁর সহকর্মীরা জানতে চেয়েছিলেন, অতীতে এই বরফস্তর কখনো বর্তমানের চেয়েও ছোট হয়ে গিয়েছিল কি না এবং পরবর্তী সময়ে আবার সম্প্রসারিত হয়েছিল কি না। বিষয়টি অনুসন্ধান করা কঠিন। কারণ, কোনো অঞ্চলে বরফ আবার বিস্তৃত হলে আগের ভূতাত্ত্বিক নিদর্শন অনেক সময় চাপা পড়ে যায় কিংবা মুছে যায়।

তবে বার্নস আইস ক্যাপের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে গবেষকেরা এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন। এই বরফস্তরটি নিচের পাথুরে ভূমির সঙ্গে জমাটবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। ফলে এটি অন্য অনেক হিমবাহের মতো ভূমির ওপর দিয়ে পিছলে সরে যায় না। বরং সম্প্রসারিত হওয়ার সময় যেসব উদ্ভিদকে বরফের নিচে চাপা দিয়েছে, সেগুলোও সংরক্ষিত থেকেছে।

গবেষকেরা বরফস্তরের প্রান্তবর্তী এলাকা থেকে দীর্ঘদিন আগে মারা যাওয়া শ্যাওলা সংগ্রহ করেন। পরে সেগুলোর বয়স নির্ধারণ করে বোঝার চেষ্টা করেন, সেগুলো সর্বশেষ কখন জীবিত ছিল।

ইয়ং বলেন, বরফের প্রান্ত ক্রমশ এগিয়ে এসে কীভাবে শ্যাওলাগুলোকে ঢেকে ফেলেছে এবং সেগুলোর মৃত্যু ঘটিয়েছে, তা বিশ্লেষণ করেই বরফের সম্প্রসারণের ইতিহাস পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়েছে।

এ ছাড়া আশপাশের পাথর পরীক্ষা করেও বরফস্তরের অতীত সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন বিজ্ঞানীরা। এ জন্য তাঁরা একটি বিরল তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের উপস্থিতি পরীক্ষা করেন, যা কোনো পাথর দীর্ঘ সময় বায়ুমণ্ডলের সংস্পর্শে থাকলে ধীরে ধীরে জমা হয়। এর মাধ্যমে পাথরগুলো কতদিন বরফমুক্ত অবস্থায় ছিল, তা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে।

গবেষণায় পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, প্রায় তিন হাজার বছর আগে বার্নস আইস ক্যাপ সবচেয়ে ছোট আকারে পৌঁছেছিল। এরপর তাপমাত্রা কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় দুই হাজার বছর আগে এটি আবার সম্প্রসারিত হতে শুরু করে।

গবেষকদের মতে, এই সম্প্রসারণকে নতুন একটি বরফযুগের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায় অতিক্রম করার আগেই ১৯৬০-এর দশকে সেই প্রক্রিয়া উল্টো দিকে মোড় নেয়।

নিকোলাস ইয়ং বলেন, ঠিক একই সময়ে বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ঘটনা ঘটেছে। দুটি ঘটনার সময়গত মিলকে তাঁরা কাকতালীয় বলে মনে করেন না। মানুষের কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট জলবায়ুদূষণ ওই অঞ্চলকে শীতল করার জন্য কাজ করা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াগুলোকে কার্যত অতিক্রম করে গেছে।

তবে গবেষণাটির ব্যাখ্যা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ডার্টমাউথ কলেজের ভূবিজ্ঞান অধ্যাপক মেরিডিথ কেলি গবেষণাটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। তাঁর মতে, উদ্ভিদের রেডিওকার্বন পদ্ধতিতে বয়স নির্ধারণসহ আধুনিক কিছু কৌশল ব্যবহার করে গবেষকেরা বার্নস আইস ক্যাপের সম্প্রসারণ ও সংকোচনের একটি গ্রহণযোগ্য চিত্র তুলে ধরেছেন।

তবে এই বরফস্তরের সম্প্রসারণকে নতুন বরফযুগের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। একই সময়ে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের হিমবাহগুলোও সম্প্রসারিত হচ্ছিল কি না, তা তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করলে এর পেছনের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াগুলো আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব হবে।

পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের পদার্থবিদ আন্দ্রে গানোপলস্কি বলেন, কার্বন নিঃসরণের কারণে পরবর্তী বরফযুগের সূচনা উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে যেতে পারে কি না, তা নিয়ে আগে থেকেই অনেক গবেষণা হয়েছে।

তবে তাঁর নিজের গবেষণাসহ বিভিন্ন জলবায়ু মডেলভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন না ঘটলেও পরবর্তী বরফযুগ শুরু হতে আরও প্রায় ৫০ হাজার বছর সময় লাগতে পারে।

তাঁর মতে, বার্নস আইস ক্যাপের সম্প্রসারণের তথ্যের ভিত্তিতে নতুন একটি হিমবাহ চক্র শুরু হয়েছিল এবং পরে তা থেমে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যথেষ্ট নয়।

তবে নিকোলাস ইয়ং ও তাঁর সহগবেষকেরা বলছেন, লরেন্টাইড বরফস্তরের পুনরায় সম্প্রসারণকেই বরফযুগের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। বিশাল বরফস্তর তৈরি না হওয়া পর্যন্ত কোনো হিমবাহ যুগ শুরু হয়েছে বলে স্বীকার করতে অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই।

গবেষণাটির ফলাফল ১৯৭০-এর দশকের একটি বিতর্কিত সময়কেও নতুনভাবে আলোচনায় এনেছে। সে সময় কয়েকজন বিজ্ঞানী আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, পৃথিবী হয়তো নতুন একটি বরফযুগের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। গণমাধ্যমেও বিষয়টি ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল। বিশেষ করে নিউজউইক সাময়িকীর ‘দ্য কুলিং ওয়ার্ল্ড’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন সে সময় আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেখানে পৃথিবী শীতল হয়ে পড়লে খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছিল।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সংশয়বাদী ও অস্বীকারকারীরা প্রায়ই ওই সময়ের পূর্বাভাসকে বিজ্ঞানীদের ভুল এবং অতিরঞ্জিত আশঙ্কার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। তবে নিকোলাস ইয়ং মনে করেন, নতুন গবেষণা সেই সময়ের বিজ্ঞানীদের ধারণার পক্ষে কিছুটা প্রমাণ হাজির করেছে। তাঁর মতে, তখন সত্যিই নতুন একটি হিমবাহ যুগের সূচনা হয়েছিল। তবে সেটি ছিল একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে, যা এখন থেমে গেছে।

তবে ইয়ং সতর্ক করে বলেছেন, এই গবেষণার অর্থ এমন নয় যে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মানবজাতিকে বরফযুগের বিপদ থেকে রক্ষা করেছে।

বরফযুগের পরিবর্তন অত্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে ঘটে। বার্নস আইস ক্যাপ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলার মতো বড় আকার ধারণ করতে আরও কয়েক হাজার বছর সময় লাগত। ফলে এর সূচনা থেমে যাওয়ার তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব মানুষের জীবনে পড়ার কথা ছিল না।

বরং গবেষণাটি দেখিয়েছে, মানুষের কর্মকাণ্ড পৃথিবীর প্রাকৃতিক ব্যবস্থায় কতটা গভীর পরিবর্তন ঘটিয়েছে। নিকোলাস ইয়ংয়ের মতে, মানুষ শুধু সম্ভাব্য একটি বরফযুগের সূচনাই থামিয়ে দেয়নি, বরং ভবিষ্যতে পৃথিবীতে নতুন কোনো হিমবাহ যুগ শুরু হওয়ার সম্ভাবনাও বহু দীর্ঘ সময়ের জন্য পিছিয়ে দিয়েছে।

এ গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো ও গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের মাধ্যমে মানুষ এখন পৃথিবীর এমন সব প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করছে, যেগুলো হাজার হাজার বছর ধরে নিজেদের নিয়মে পরিচালিত হয়ে আসছে। এর প্রভাব কেবল বর্তমান জলবায়ুতে সীমাবদ্ধ নয়, পৃথিবীর সুদূর ভবিষ্যতের জলবায়ুচক্রও এর ফলে বদলে যেতে পারে। – সিএনএন

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies