পর্যটননগরীতে নিরাপত্তার এমন অবহেলা কেন?
কক্সবাজার বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিবছর দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক এখানে আসেন। পর্যটনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও নানা ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো মানুষের জীবিকা এবং দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। কিন্তু পর্যটনশিল্পের এমন গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে যদি অধিকাংশ ভবনে পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকে, অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হয়, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, মানুষের জীবন নিয়ে ভয়াবহ অবহেলাও বটে।
সম্প্রতি কক্সবাজারের ইনানীর পাটোয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনা এই অবহেলার নির্মম পরিণতি সামনে এনেছে। বিশেষ করে প্রাণহানির ঘটনায় শিশুদের মৃত্যুর তথ্য আমাদের আরও গভীরভাবে নাড়া দেয়। একটি পরিবার যখন ছুটি কাটাতে গিয়ে মৃত্যুর মুখে পড়ে, তখন সেই শোক শুধু সংশ্লিষ্ট পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পর্যটনকেন্দ্রের নিরাপত্তা, প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি নিয়ে গোটা সমাজের সামনে প্রশ্ন দাঁড়ায়।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, কক্সবাজারের বিপুলসংখ্যক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও অন্যান্য আবাসন প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও ছাড়পত্রের ঘাটতিও রয়েছে। অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যেখানে ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন, জরুরি নির্গমনপথ, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, ধোঁয়া শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষিত কর্মী থাকা জরুরি, সেখানে এসব ব্যবস্থার অনুপস্থিতি পর্যটকদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়।
হোটেল বা রিসোর্ট কেবল একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়। সেখানে মানুষ রাতযাপন করেন, পরিবার নিয়ে অবস্থান করেন, ঘুমিয়ে থাকেন। আগুন লাগলে ঘুমন্ত অতিথিরা দ্রুত বিপদ বুঝতে নাও পারেন। বহুতল ভবনে বিকল্প সিঁড়ি বা জরুরি বের হওয়ার পথ না থাকলে, করিডর সংকীর্ণ হলে কিংবা অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকলে সামান্য আগুনও ভয়াবহ বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। তাই অগ্নিনিরাপত্তাকে বাড়তি খরচ বা আনুষ্ঠানিক কাগজপত্রের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মানুষের জীবন রক্ষার ন্যূনতম শর্ত।
এ ক্ষেত্রে শুধু হোটেল-রিসোর্টের মালিকদের দায়ী করলেই চলবে না। যেসব প্রতিষ্ঠান অনুমোদন ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি প্রশ্ন তুলতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি নিয়েও। নিয়মিত পরিদর্শন, লাইসেন্স নবায়ন, ভবনের নিরাপত্তা যাচাই এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যেসব দপ্তরের দায়িত্ব, তারা কতটা দায়িত্ব পালন করছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বছরের পর বছর অনিয়ম চলতে থাকলে তা কোনোভাবেই কেবল ব্যবসায়ীদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
একই সঙ্গে প্রতিটি আবাসন প্রতিষ্ঠানে কার্যকর অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম, জরুরি বহির্গমনপথ, স্পষ্ট নির্দেশনাচিহ্ন এবং নিয়মিত অগ্নিনির্বাপণ মহড়ার ব্যবস্থা থাকা দরকার। কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে আগুন লাগলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত ও সঠিকভাবে অতিথিদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া যায়। পর্যটকদেরও আবাসনে প্রবেশের পর জরুরি নির্গমনপথ সম্পর্কে জানার সুযোগ থাকা উচিত।
পর্যটনশিল্পের স্বার্থেই নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস করা যাবে না। অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে ব্যবসায়ীদের ব্যয় কিছুটা বাড়তে পারে, কিন্তু নিরাপত্তার ঘাটতিতে প্রাণহানি ঘটলে তার ক্ষতি অপূরণীয়। মানুষের জীবন হারানোর পর ক্ষতিপূরণ, তদন্ত বা আশ্বাস দিয়ে সেই শূন্যতা পূরণ করা সম্ভব নয়।
কক্সবাজারকে নিরাপদ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং ব্যবসায়ীদের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। অনিয়মের দায় নির্ধারণ করতে হবে, প্রয়োজন হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার অগ্রগতি নিয়মিত জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
ইনানীর অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানো মানুষদের স্মরণ করার সবচেয়ে অর্থবহ উপায় হবে এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে আর কোনো পরিবারকে পর্যটনে গিয়ে স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে ফিরতে না হয়। কক্সবাজারের সৌন্দর্য যেমন পর্যটকদের আকর্ষণ করে, তেমনি সেখানে নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও থাকতে হবে। মানুষের জীবনের চেয়ে বড় কোনো ব্যবসা নেই, পর্যটনশিল্পের উন্নয়নও মানুষের জীবনের নিরাপত্তার ঊর্ধ্বে হতে পারে না।

