Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
জাতীয়

কক্সবাজার ভ্রমণ: অগ্নিঝুঁকি, নিরাপত্তাহীন অধিকাংশ ভবন

কক্সবাজার ভ্রমণ: অগ্নিঝুঁকি, নিরাপত্তাহীন অধিকাংশ ভবন

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতকে কেন্দ্র করে কক্সবাজারে দ্রুত বাড়ছে পর্যটন অবকাঠামো। গড়ে উঠছে একের পর এক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও বহুতল ভবন। কিন্তু পর্যটন ব্যবসার এই বিস্তারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিশ্চিত হয়নি ভবনের অনুমোদন, পরিবেশ ছাড়পত্র ও অগ্নিনিরাপত্তা। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের প্রায় ৯০ শতাংশ ভবনে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানের নেই ফায়ার লাইসেন্স ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রও।

সম্প্রতি মেরিন ড্রাইভের ইনানীর পাটুয়ারটেকে টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শিশুসহ ১০ জনের মৃত্যুর পর বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। দুর্ঘটনার পর প্রশাসন তৎপর হলেও দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদনহীন আবাসন ব্যবসা চলতে থাকায় তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কক্সবাজার শহর, রামুর পেচারদ্বীপ এবং উখিয়ার ইনানী ও আশপাশের এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে এক হাজারের বেশি হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। এর বড় অংশই সংশ্লিষ্ট পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুধু ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে।

অনুমোদন ছাড়াই চলছে শত শত প্রতিষ্ঠান

কক্সবাজারের কলাতলী থেকে লাবণী পর্যন্ত কয়েক বর্গকিলোমিটার এলাকাতেই রয়েছে চার শতাধিক ভবন। ৩২ দশমিক ৯০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের শহরটিতে বহুতল ভবনের সংখ্যা সাড়ে তিন হাজারের বেশি। কিন্তু এসব ভবনের কতটিতে অনুমোদিত নকশা, পরিবেশ ছাড়পত্র ও কার্যকর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে।

শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে ইনানীর পাটুয়ারটেকে কাঠ ও বাঁশ দিয়ে নির্মিত টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর জানা গেছে, সেখানে থাকা শতাধিক রিসোর্ট ও কটেজের অনেকগুলোরই নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকের ফায়ার লাইসেন্স, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র এবং কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) অনুমোদনও নেই। জেলা প্রশাসনের ব্যবসা ও বাণিজ্য শাখার প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াও কিছু প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে।

প্রশাসনিক তদারকির ঘাটতিতে জেলার প্রায় পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল, কটেজ, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কক্সবাজার হোটেল-গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, সমিতির তালিকাভুক্ত অধিকাংশ হোটেলের প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে। তবে জেলার বেশির ভাগ রিসোর্ট ও কটেজের অনুমোদন নেই। এসব প্রতিষ্ঠান নিয়মকানুন না মেনেই ব্যবসা করছে। অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মের আওতায় এনে পর্যটনশিল্পের বিকাশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

অগ্নিনিরাপত্তায় বড় ঘাটতি

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের লাইসেন্স শাখার পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম জানান, চলতি বছরে তাঁদের দপ্তর থেকে মাত্র ৫০টি হোটেল লাইসেন্স নবায়ন করেছে। লাইসেন্সের জন্য আবেদন জমা পড়েছে সর্বোচ্চ ১০০টি। অথচ এর আগে প্রায় ২০০টি হোটেলের লাইসেন্স ছিল। এ কারণে অধিকাংশ হোটেলকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে লাইসেন্স নেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি ফায়ার লাইসেন্স আছে কি না যাচাই করত, তাহলে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই প্রয়োজনীয় লাইসেন্স নিতে বাধ্য হতো।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের মতে, কক্সবাজারে হোটেল-রিসোর্টের সংখ্যা বাড়লেও অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মালিকদের সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। যেসব ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা আছে, সেগুলোরও অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না।

এদিকে শহরের টেকপাড়া, নুরপাড়া, পেশকারপাড়া, ঝাউতলা, নতুন বাহারছড়া, রুমালিয়ারছড়া, পাহাড়তলী, বইল্ল্যাপাড়া, ঘোনারপাড়া ও লাইট হাউজপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক ভবন গড়ে উঠেছে অত্যন্ত সরু সড়কের পাশে। কোথাও কোথাও রাস্তা এতটাই সংকীর্ণ যে রিকশা চলাচলও কঠিন। আশপাশে পর্যাপ্ত জলাশয় না থাকায় আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো এবং পানি সংগ্রহ করা কঠিন হতে পারে। এতে একটি ভবনের আগুন পাশের ভবনেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরিবেশ ছাড়পত্রও নেই অধিকাংশের

শুধু অগ্নিনিরাপত্তা নয়, কক্সবাজারের অধিকাংশ হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও ঘাটতি রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে পয়োবর্জ্য শোধনের জন্য স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) নেই। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রও সংগ্রহ করেনি বহু প্রতিষ্ঠান।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ মোর্শেদ জানান, জেলায় সর্বোচ্চ ৫০টি হোটেলের পরিবেশ ছাড়পত্র রয়েছে। ছাড়পত্র না থাকায় গত বছর ৫৮টি হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, রিসোর্ট ও কটেজকে প্রায় দেড় কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সময়ে পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত শতাধিক হোটেলের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলাও করা হয়।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণত ২০ কক্ষের কম এমন আবাসিক হোটেলের ক্ষেত্রে পরিবেশ ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয় না। একইভাবে ৩০ লাখ টাকার কম ব্যয়ে চালু করা রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রেও কিছু ক্ষেত্রে অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা নেই। এসব বিধানের সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যবসায়ী প্রয়োজনীয় পরিবেশগত অনুমোদন এড়িয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অপরিকল্পিত নগরায়ণে বাড়ছে ঝুঁকি

কক্সবাজারের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের আগে শহরে ভবন নির্মাণের অনুমোদন মূলত পৌরসভার কাছ থেকেই নিতে হতো। নগর পরিকল্পনাবিদদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ শুরু হয় এবং ২০১১ সালে তা শেষ হয়। ২০১৩ সালে গেজেট প্রকাশের আগপর্যন্ত বহু ভবন নির্মিত হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে।

অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ভবন তিন বা পাঁচতলা নির্মাণের অনুমোদন নিয়ে পরে পাঁচ বা সাততলা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি না থাকায় অনেক ভবনেই বিল্ডিং কোড যথাযথভাবে মানা হয়নি। ফলে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বেড়েছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, দুই শতাধিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০টি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অন্যদের প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নোটিশের পর উচ্ছেদ অভিযানের প্রস্তুতি

কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন বলেন, মেরিন ড্রাইভ এলাকায় কয়েক শ প্রতিষ্ঠান থাকায় অনুমোদন যাচাইয়ে সময় লাগছে। ইতোমধ্যে যাচাই করা আড়াই শতাধিক প্রতিষ্ঠানকে বৈধতা নিশ্চিত করতে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময় শেষে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হবে। এরপর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান জানান, যেসব প্রতিষ্ঠানে অগ্নিপ্রতিরোধক দরজা নেই, স্মোক ডিটেক্টর অকার্যকর, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র অপর্যাপ্ত কিংবা ভবনের আয়তন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই, সেগুলোকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের চূড়ান্ত সনদ না থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হচ্ছে। নির্দেশনা না মানলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান স্বীকার করেছেন, কক্সবাজারের অধিকাংশ হোটেল-গেস্ট হাউস, রিসোর্ট ও কটেজের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেই। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, পর্যটন করপোরেশন, কউক ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পর্যটন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হবে। সেখান থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দুর্ঘটনার পরই কেন তৎপরতা?

কক্সবাজার উন্নয়ন আন্দোলনের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট ওয়াহিদ রুবেলের প্রশ্ন, দুর্ঘটনার পরই কেন প্রশাসনের তৎপরতা বাড়ে? জেলার কতগুলো আবাসিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তার সঠিক হিসাবও প্রশাসনের কাছে নেই বলে তিনি অভিযোগ করেন।

কক্সবাজার টুরিস্ট ক্লাবের সভাপতি মো. রেজাউল করিমের মতে, অনুমোদনহীন ও অগ্নিনিরাপত্তাবিহীন প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে দিনের পর দিন ব্যবসা পরিচালনা করছে, তা খতিয়ে দেখতে প্রশাসনের ভূমিকা তদন্ত করা প্রয়োজন।

একটি তারকা হোটেলের পরিচালকও অভিযোগ করেছেন, প্রশাসনের নজরদারি অনেক সময় নিয়ম মেনে চলা তারকা হোটেলগুলোর ওপরই বেশি পড়ে। অন্যদিকে, অনুমোদনহীন রিসোর্ট ও কটেজের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। তাঁর মতে, পর্যটনশিল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রতিষ্ঠানকে একই নিয়মের আওতায় আনতে হবে।

কক্সবাজারের পর্যটন খাতের দ্রুত সম্প্রসারণ কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ালেও নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত না হলে তা বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। ইনানীর অগ্নিকাণ্ড সেই ঝুঁকিকে সামনে এনেছে। এখন প্রশ্ন, তদন্ত ও নোটিশের বাইরে গিয়ে প্রশাসন নিয়মিত তদারকি, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies