জামালপুর শহরের ব্যস্ত সড়ক, দোকানপাট আর জনবসতির ভিড়ে এমন কিছু নাম ছড়িয়ে আছে, যেগুলোর ভেতর লুকিয়ে রয়েছে কয়েকশ বছরের ইতিহাস। তেমনই একটি নাম কম্পপুর। আজকের প্রজন্মের কাছে এটি নিছক একটি গ্রামের নাম। অথচ নামটির পেছনে রয়েছে ঔপনিবেশিক আমলের সামরিক উপস্থিতি, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ দমন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠার এক বিস্মৃত অধ্যায়।
স্থানীয় ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ব্রিটিশ আমলে জামালপুরে যে সামরিক ক্যাম্প বা সেনানিবাস গড়ে উঠেছিল, সেই ‘ক্যাম্প’ থেকেই কালক্রমে এলাকার নাম হয় ‘ক্যাম্পপুর’। পরে মানুষের মুখের উচ্চারণে ‘ক্যাম্পপুর’ বদলে হয়ে যায় ‘কম্পপুর’। নামটি বদলে গেলেও মুছে যায়নি তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস। জামালপুর সদর উপজেলা-সংক্রান্ত একটি ঐতিহাসিক বিবরণেও ফকির-সন্ন্যাসী দমনের জন্য জামালপুরে ব্রিটিশ সেনানিবাস স্থাপনের কথা বলা হয়েছে এবং কম্পপুরকে সেই স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে বাংলার দেওয়ানি লাভের পর রাজস্ব আদায়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পরপরই বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে কোম্পানির শাসন ও রাজস্বনীতির বিরুদ্ধে নানা ধরনের প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।
এই সময়ের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ। আঠারো শতকের শেষভাগে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ফকির ও সন্ন্যাসীদের চলাচল এবং কোম্পানির সঙ্গে সংঘাত বাড়তে থাকে। ঐতিহাসিক সূত্রে ১৭৬৩ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিদ্রোহপর্বের উল্লেখ পাওয়া যায়।
জামালপুরের ভৌগোলিক অবস্থানও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ব্রহ্মপুত্রের তীর, নদীপথের যোগাযোগ এবং আশপাশের বনাঞ্চল সব মিলিয়ে অঞ্চলটি তখন ছিল চলাচল ও প্রতিরোধের জন্য সুবিধাজনক। স্থানীয় ইতিহাসে বলা হয়, দক্ষিণের মধুপুর জঙ্গল এবং উত্তরের শেরপুরের বনাঞ্চলে আশ্রয় নেওয়া ফকির-সন্ন্যাসীদের দমনে ব্রিটিশদের একটি সামরিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্রের প্রয়োজন দেখা দেয়।
সৈন্য নামল জামালপুরে। বিদ্রোহ দমন এবং কোম্পানির রাজস্ব ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে জামালপুরে ব্রিটিশ সামরিক উপস্থিতি গড়ে ওঠে। কিছু স্থানীয় ইতিহাসভিত্তিক সূত্রে ১৭৮৩ সালে জামালপুর সদরে ব্রিটিশ সেনানিবাস স্থাপনের কথা বলা হয়েছে অন্য একটি স্থানীয় ঐতিহাসিক বর্ণনায় ১৭৮৭ সালের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সেই সামরিক ক্যাম্পকে ঘিরেই গড়ে ওঠে মানুষের বসতি। সৈন্যদের আনাগোনা, ঘোড়ার চলাচল, অস্ত্রের শব্দ, পাহারা এবং সামরিক কর্মকাণ্ড একটি সাধারণ জনপদের চেহারাই বদলে দিয়েছিল বলে স্থানীয় ইতিহাসে বর্ণনা পাওয়া যায়।
সময়ের সঙ্গে ক্যাম্পের অস্তিত্ব মুছে যায়। কিন্তু রয়ে যায় নাম। ক্যাম্পপুর। তারপর উচ্চারণের স্বাভাবিক পরিবর্তনে মানুষের মুখে মুখে ক্যাম্পপুর হয়ে ওঠে কম্পপুর। এভাবেই একটি সামরিক স্থাপনার স্মৃতি জায়গা করে নেয় একটি গ্রামের নামের মধ্যে। মৃত্যুরও রয়ে গেছে চিহ্ন। সেই সময়ের সঙ্গে আরেকটি স্মৃতিচিহ্নের কথাও স্থানীয়ভাবে বলা হয়। ফকির-সন্ন্যাসীদের সঙ্গে সংঘর্ষ কিংবা সামরিক অভিযানে নিহত কিছু ব্রিটিশ সৈন্যকে জামালপুরে সমাহিত করা হয়েছিল বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের মোড়সংলগ্ন এলাকায় থাকা পুরোনো সমাধিগুলোকে সেই সময়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
আজও সেখানে পুরোনো সমাধিচিহ্নের অস্তিত্ব স্থানীয় মানুষের কাছে ইতিহাসের সাক্ষ্য হয়ে আছে। ব্রিটিশ আমলের জামালপুরের কবর ও সমাধি নিয়ে ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া-সংক্রান্ত আর্কাইভেও নথি রয়েছে। British Library-এর India Office Records-এ জামালপুরের ঔপনিবেশিক আমলের কবরস্থানসংক্রান্ত পৃথক নথিও সংরক্ষিত আছে; ১৮৭০–১৯৪৭ সময়কালের নথির উল্লেখ সেখানে পাওয়া যায়।
তবে আশেক মাহমুদ কলেজ মোড়ের নির্দিষ্ট সমাধিগুলো ঠিক কোন অভিযানে নিহত সৈন্যদের তা নিশ্চিত করতে সমাধিফলকের পাঠ, পুরোনো গেজেট, সামরিক রেকর্ড ও স্থানীয় ভূমি-নথি মিলিয়ে গবেষণা প্রয়োজন।
ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে বর্তমান। আজ কম্পপুরে হয়তো নেই সেই সামরিক ক্যাম্প। নেই ব্রিটিশ সৈন্যদের পদধ্বনি। নেই কোম্পানির পতাকা, অস্ত্রাগার কিংবা পাহারারত প্রহরী। কিন্তু একটি নাম টিকে আছে।
কম্পপুর। একটি নাম কীভাবে একটি জনপদের অতীতকে ধরে রাখতে পারে, কম্পপুর তারই উদাহরণ।
জামালপুরের ইতিহাস শুধু রাজা-জমিদার, নদী-বন্দর কিংবা প্রশাসনিক পরিবর্তনের ইতিহাস নয়। এই ইতিহাসের ভেতরে রয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, ফকির-সন্ন্যাসীদের চলাচল, ব্রিটিশ সামরিক অভিযান এবং সেই অভিযানের রেখে যাওয়া ভূ-নাম ও সমাধিচিহ্ন।
সময়ের স্রোতে শহর বদলেছে। রাস্তা বদলেছে। জনপদ বদলেছে। মানুষের জীবন বদলেছে। কিন্তু ‘কম্পপুর’ নামটি যেন সেই পুরোনো ক্যাম্পের একটি ক্ষীণ প্রতিধ্বনি হয়ে আজও টিকে আছে। ইতিহাসের বই হয়তো একদিন এই স্মৃতিকে ভুলে যেতে পারে। কিন্তু মানুষের মুখের ভাষা অনেক সময় বইয়ের চেয়েও দীর্ঘজীবী হয়।
তাই কম্পপুর শুধু একটি গ্রামের নাম নয় এটি জামালপুরের মাটিতে ব্রিটিশ সামরিক উপস্থিতির এক জীবন্ত ভাষাগত স্মারক।

