প্রতিবেদন: দেশে সরকার নির্ধারিত অত্যাবশ্যকীয় ১১৭ ধরনের ওষুধের বড় একটি অংশ বাজারে সহজলভ্য নয়। সরকারি হাসপাতালের ফার্মেসি থেকে শুরু করে বেসরকারি ওষুধের দোকানেও এসব ওষুধের অনেকগুলো পাওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে এসব ওষুধের দাম অপরিবর্তিত থাকায় উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছে অনেক ওষুধ কোম্পানি। ফলে কম দামের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের পরিবর্তে রোগীদের বেশি দামের বিকল্প ওষুধ কিনতে হচ্ছে।
‘আমার দেশ’-এর এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, প্রায় তিন দশক আগে তৈরি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় থাকা অনেক ওষুধের দাম দীর্ঘদিন ধরে অপরিবর্তিত রয়েছে। উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের মূল্য, জ্বালানি ব্যয় ও অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় নির্ধারিত দামে এসব ওষুধ উৎপাদনে কোম্পানিগুলোর আগ্রহ কমেছে।
বহুল ব্যবহৃত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ প্যারাসিটামলের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। সাধারণ জ্বর, সর্দি, ফ্লু ও শরীর ব্যথায় ব্যবহৃত ৫০০ মিলিগ্রামের প্যারাসিটামল উৎপাদন ও বাজারজাতের লাইসেন্স রয়েছে শতাধিক কোম্পানির। তবে সারা বছর এটি উৎপাদন করে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। ফলে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের মৌসুমে প্যারাসিটামলের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়।
এ সুযোগে প্যারাসিটামলের সঙ্গে বিভিন্ন অতিরিক্ত ফর্মুলেশন যুক্ত করে নাপা এক্সট্রা, নাপা ওয়ান, নাপা র্যাপিড, নাপাডল ও নাপা এক্সটেন্ডসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ড বাজারজাত করা হচ্ছে। একই গ্রুপের অন্যান্য কোম্পানির ব্র্যান্ডও তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে সাধারণ প্যারাসিটামলের পরিবর্তে রোগীদের অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ফর্মুলেশনযুক্ত ওষুধ কিনতে হচ্ছে।
অ্যামোক্সিসিলিন ৫০০ মিলিগ্রাম ক্যাপসুলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সংকট রয়েছে। শ্বাসনালি, কান ও গলার সংক্রমণ, মূত্রনালির সংক্রমণ এবং ত্বকের ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত এই অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদনের লাইসেন্স রয়েছে অর্ধশতাধিক কোম্পানির। কিন্তু নিয়মিত উৎপাদন করছে মাত্র ৮ থেকে ১০টি প্রতিষ্ঠান।
ফলে তুলনামূলক কম দামের এই অ্যান্টিবায়োটিক সহজলভ্য না থাকায় অনেক রোগীকে ব্যয়বহুল অ্যান্টিবায়োটিক নিতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকিও বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেফুরক্সিমের মতো অ্যান্টিবায়োটিকের অনেক ইন্ডিকেশনে অ্যামোক্সিসিলিন, ডক্সিসাইক্লিন কিংবা ফ্লুক্লাক্সসিলিন ব্যবহার করা যায়। অথচ এসব অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম তুলনামূলক কম। সেফুরক্সিম+ক্লাভুরিক অ্যাসিড ৫০০ মিলিগ্রামের দাম কোম্পানিভেদে ৫৫ থেকে ৮৫ টাকা হলেও অ্যামোক্সিসিলিন ৫০০ মিলিগ্রামের দাম প্রায় সাড়ে ৭ টাকা, ডক্সিসাইক্লিন ১০০ মিলিগ্রাম আড়াই টাকা এবং ফ্লুক্লাক্সসিলিন ৫০০ মিলিগ্রাম ১৪ টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বল্পমূল্যের এসব অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম যৌক্তিকভাবে সামান্য বাড়ানো হলে কোম্পানিগুলো আবার উৎপাদনে আগ্রহী হতে পারে। এতে রোগীদের উচ্চমূল্যের বিকল্প অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর নির্ভরতা কমবে।
শ্বাসনালি ও মূত্রনালির সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত সিপ্রোফ্লোক্সাসিনের সরবরাহও সীমিত। বড় ফার্মেসিগুলোতে ১৫ থেকে ২০টি কোম্পানির এই ওষুধ পাওয়া গেলেও অনেক প্রতিষ্ঠান এর উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। কাঁচামাল আমদানি ও উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সরকার নির্ধারিত মূল্যের বড় ব্যবধানকেই এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে একই জেনেরিকের ওষুধ কোম্পানিভেদে ভিন্ন দামে বিক্রি হওয়ায় ওষুধের বাজারে আরেক ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে এজিথ্রোমাইসিন ৫০০ মিলিগ্রামের কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন কোম্পানির এই একই জেনেরিকের প্রতি ট্যাবলেটের অনুমোদিত দাম ২৭ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একই ধরনের কাঁচামাল ও উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যবহার করলেও কোম্পানিভেদে দামের এই পার্থক্যের কারণে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে সাধারণ ভোক্তাদেরও বেশি দাম দিতে হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শেখ জহির রায়হান বলেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তার মতে, লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোকে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের একটি অংশ উৎপাদনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা যথাযথভাবে মনিটর হচ্ছে না।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম, জ্বালানি ব্যয় ও অন্যান্য উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে উৎপাদক ও নীতিনির্ধারকদের আলোচনার মাধ্যমে এসব ওষুধের দাম পুনর্নির্ধারণ করা জরুরি। এতে ওষুধের সরবরাহ ও সহজলভ্যতা বাড়তে পারে।
নোভাটেক ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধসহ অনেক ওষুধের মূল্য পুনর্নির্ধারণের সময় এসেছে। গত তিন দশকে কাঁচামাল, জ্বালানি ও ডলারের বিনিময়মূল্যের বড় পরিবর্তন হলেও এসব ওষুধের মূল্য কাঠামোয় তেমন যৌক্তিক সমন্বয় হয়নি।
তার ভাষ্য, সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক ওষুধ কোম্পানি লোকসানের মুখে পড়ছে। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম যৌক্তিকভাবে সামান্য বাড়ানো হলে কোম্পানিগুলো এসব ওষুধ উৎপাদনে আগ্রহী হবে। একই জেনেরিকের ওষুধে কোম্পানিভেদে ভিন্ন মূল্য অনুমোদনের বিষয়টিও পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
ওষুধ উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, বাংলাদেশে ওষুধের ওপর কর ও ভ্যাটের হারও তুলনামূলক বেশি। তাদের তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদন পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং খুচরা পর্যায়ে আরও প্রায় আড়াই শতাংশ পর্যন্ত ভ্যাট দিতে হয়। সব মিলিয়ে তা প্রায় সাড়ে ১৭ শতাংশ। অন্যদিকে ভারতে ওষুধে মোট ভ্যাট প্রায় ৫ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ১ থেকে ২ শতাংশের মতো বলে তারা দাবি করেন।
বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সভাপতি ও ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের চেয়ারম্যান আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ওষুধের দাম পুনর্নির্ধারণের জন্য তারা সরকারকে অনুরোধ জানিয়ে আসছেন। একই জেনেরিকের ওষুধে কোম্পানিভেদে ভিন্ন দামের বিষয়টিও যৌক্তিকভাবে সমাধান করা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. আকতার হোসেন জানান, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, তালিকা হালনাগাদসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে টেকনিক্যাল কমিটি গঠনের বিষয়ে আলোচনা চলছে। কমিটি গঠিত হলে তারা এসব বিষয়ে সরকারের কাছে সুপারিশ করবে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

