Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
অন্যান্য

বর্ষা শেষে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ, কিভাবে নিরাপদ থাকবেন?

বর্ষা শেষে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ,  কিভাবে নিরাপদ থাকবেন?

বর্ষা শেষের দিকে এলেই প্রকৃতিতে বদল আসে। কোথাও জমে থাকা পানি শুকাতে শুরু করে, কোথাও আবার বৃষ্টির পানি আটকে থাকে ড্রেন, ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র কিংবা নির্মাণাধীন স্থাপনার বিভিন্ন স্থানে। আর এই জমে থাকা পানিই হয়ে উঠতে পারে মশার বংশবিস্তারের উপযুক্ত জায়গা। ফলে বর্ষা শেষ হলেও মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না।

বাংলাদেশে মশাবাহিত রোগের মধ্যে ডেঙ্গু বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ানো এই রোগের পাশাপাশি মশাবাহিত অন্যান্য রোগ নিয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বাংলাদেশের জলবায়ু, বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা ও তাপমাত্রার পরিবর্তন ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগের সংক্রমণের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

বর্ষা শেষেও কেন ঝুঁকি থাকে

অনেকের ধারণা, বৃষ্টি কমে গেলে মশার উপদ্রবও কমে যায়। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। বৃষ্টির পর বিভিন্ন জায়গায় অল্প পরিমাণ পানি জমে থাকতে পারে। একটি ছোট পাত্র, পুরোনো টায়ার, ফুলের টবের নিচের ট্রে, ফেলে রাখা প্লাস্টিকের বোতল কিংবা নির্মাণসামগ্রীর কোনো অংশেও পানি জমতে পারে।

এডিস মশা এসব ছোট জলাধারেই ডিম পাড়তে পারে। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, ঘর ও বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি মশার প্রজননের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তাই শুধু বড় ড্রেন বা নালা পরিষ্কার করলেই ঝুঁকি দূর হয় না; ছোট ছোট পানি জমার স্থানও নিয়মিত পরিষ্কার করতে হয়।

ডেঙ্গুর মশা কোথায় জন্মায়

এডিস মশাকে অনেক সময় শুধু নোংরা পানির সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কিন্তু ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা পরিষ্কার বা তুলনামূলক স্বচ্ছ পানিতেও বংশবিস্তার করতে পারে।

বাড়ির আশপাশে যেসব জায়গায় পানি জমতে পারে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • ফুলের টব ও টবের নিচের প্লেট
  • পরিত্যক্ত বোতল ও প্লাস্টিকের পাত্র
  • পুরোনো টায়ার
  • ড্রাম ও বালতি
  • ছাদের বিভিন্ন অংশ
  • পানির ট্যাংক
  • নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি
  • ফেলে রাখা কৌটা ও অন্যান্য পাত্র
  • এসি বা অন্যান্য যন্ত্রের পানি জমার স্থান
  • ড্রেনের এমন অংশ যেখানে পানি আটকে থাকে

WHO নিয়মিত পানি সংরক্ষণের পাত্র ঢেকে রাখা, খালি করা ও পরিষ্কার করার পরামর্শ দেয়।

শুধু ঘরের ভেতর নয়, নজর দিন চারপাশেও

একটি বাড়ি পরিষ্কার রাখলেই মশার ঝুঁকি পুরোপুরি কমে না। পাশের বাড়ি, খালি জায়গা, নির্মাণাধীন ভবন, দোকানের পেছনের অংশ কিংবা রাস্তার পাশে ফেলে রাখা পাত্রেও মশার প্রজনন হতে পারে।

তাই মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক উদ্যোগও জরুরি। WHO বাংলাদেশও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকার, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য খাত এবং জনগণের সমন্বিত ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

সপ্তাহে এক দিন বাড়ির ‘মশা পরিদর্শন’

বাড়িতে সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিন নির্ধারণ করে কয়েক মিনিটের জন্য চারপাশ ঘুরে দেখা যেতে পারে। কোথাও পানি জমে আছে কি না, ফুলের টবের নিচে পানি আছে কি না, পানির পাত্র খোলা অবস্থায় আছে কি না, ছাদে বা বারান্দায় কোনো পরিত্যক্ত পাত্র পড়ে আছে কি না, তা পরীক্ষা করা দরকার।

যে পাত্রে পানি প্রয়োজন নেই, সেটি ফেলে দেওয়া বা উল্টে রাখা ভালো। প্রয়োজনীয় পানির পাত্র ঢেকে রাখতে হবে। পাত্রে পানি রাখতে হলে নিয়মিত খালি করে ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে।

কারণ শুধু পানি ফেলে দিলেই সব সময় যথেষ্ট নাও হতে পারে। মশার ডিম পাত্রের গায়ে লেগে থাকতে পারে। তাই পাত্র পরিষ্কার করার সময় ঘষে ধুয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

দিনের বেলাতেও সতর্ক থাকুন

ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায় বেশি সক্রিয়। ফলে শুধু রাতে মশারি ব্যবহার করলেই ডেঙ্গু থেকে পুরোপুরি নিরাপদ থাকা যায় না।

দিনে বাইরে বের হলে শরীর যতটা সম্ভব ঢেকে রাখার মতো পোশাক পরা, প্রয়োজন অনুযায়ী মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করা এবং ঘরের দরজা-জানালায় মশার প্রবেশ ঠেকানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। WHO মশা প্রতিরোধক, শরীর ঢাকা পোশাক, জানালা-দরজায় স্ক্রিন এবং দিনের ঘুমের সময় মশারি ব্যবহারের পরামর্শ দেয়।

বাড়িতে কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে

বাড়ির একজন সদস্য ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে শুধু রোগীর চিকিৎসার দিকে নজর দিলেই হবে না। রোগীকে যেন মশা কামড়াতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ানোর পর মশা ভাইরাস বহন করে অন্য মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। তাই রোগীকে মশারির মধ্যে রাখা এবং একই সঙ্গে বাড়ির আশপাশে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা জরুরি।

জ্বর হলেই অবহেলা নয়

ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণের মধ্যে জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, পেশি ও জয়েন্টে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং কখনো শরীরে র‍্যাশ দেখা দিতে পারে। তবে সব রোগীর লক্ষণ এক রকম হয় না।

তাই জ্বর হলে নিজের মতো করে ওষুধ খেয়ে কয়েক দিন অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে জ্বরের সঙ্গে পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা, শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনো গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ ও উপযুক্ত চিকিৎসা গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যথার ওষুধেও সতর্কতা

ডেঙ্গুর সন্দেহ থাকলে জ্বর বা শরীরব্যথার জন্য নিজের সিদ্ধান্তে যেকোনো ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া ঠিক নয়। WHO ডেঙ্গুতে ব্যথা ও জ্বর নিয়ন্ত্রণে প্যারাসিটামল ব্যবহারের কথা বলেছে এবং আইবুপ্রোফেন ও অ্যাসপিরিনের মতো NSAID এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে, কারণ এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

তবে কোন ওষুধ কত মাত্রায় নিতে হবে, তা রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।

শুধু ফগিংয়ের ওপর নির্ভর করলে হবে না

মশা নিয়ন্ত্রণে অনেকের প্রথম চিন্তা আসে ফগিংয়ের কথা। কিন্তু ফগিং একাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। মশার প্রজননস্থল থেকে গেলে নতুন মশা জন্মাতেই থাকবে।

WHO-এর মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা, পানি জমতে না দেওয়া, মশার সংখ্যা কমানো এবং মানুষের মশার সংস্পর্শ কমানো—সবগুলো ব্যবস্থা একসঙ্গে নেওয়া প্রয়োজন।

অর্থাৎ, ফগিংয়ের পাশাপাশি বাড়ি ও আশপাশের জমে থাকা পানি অপসারণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি।

শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা

শিশুরা মশার কামড়ের ঝুঁকিতে থাকে, বিশেষ করে খেলাধুলা বা বাইরে থাকার সময়। স্কুল, খেলার মাঠ, বাসার ছাদ কিংবা আশপাশে পানি জমে থাকলে সেগুলোও নজরে রাখতে হবে।

দিনের বেলায় শিশু ঘুমালে মশারি ব্যবহার করা যেতে পারে। বাইরে গেলে শরীর ঢাকা পোশাক এবং বয়স উপযোগী মশা প্রতিরোধক ব্যবহারের বিষয়ে চিকিৎসক বা পণ্যের নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত।

শিশুর জ্বর হলে বিশেষ করে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

মশা প্রতিরোধে ১০টি সহজ অভ্যাস

১. সপ্তাহে অন্তত একবার বাড়ির চারপাশ পরীক্ষা করুন।
২. কোনো পাত্রে পানি জমে থাকলে তা সরিয়ে ফেলুন।
৩. পানির ট্যাংক ও সংরক্ষণ পাত্র ঢেকে রাখুন।
৪. ফুলের টব ও টবের নিচের প্লেটে পানি জমতে দেবেন না।
৫. পুরোনো টায়ার, বোতল, কৌটা ও প্লাস্টিকের পাত্র ফেলে রাখবেন না।
৬. ছাদ ও বারান্দায় বৃষ্টির পানি জমছে কি না দেখুন।
৭. দিনের বেলায়ও মশার কামড় থেকে সুরক্ষা নিন।
৮. দরজা-জানালায় সম্ভব হলে মশা প্রতিরোধী নেট বা স্ক্রিন ব্যবহার করুন।
৯. বাড়িতে ডেঙ্গু রোগী থাকলে তাকে মশারি ব্যবহার করান।
১০. জ্বর বা সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

মশামুক্তির লড়াই শুরু হোক ঘর থেকেই

মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে শুধু প্রশাসন, সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না। একটি বাড়ির ছোট্ট ফুলের টব, ছাদের কোণে জমে থাকা পানি কিংবা ফেলে রাখা একটি প্লাস্টিকের পাত্রও মশার বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তাই বর্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সতর্কতা শেষ নয়, বরং বাড়াতে হবে। নিজের বাড়ি পরিষ্কার করার পাশাপাশি প্রতিবেশী, স্কুল, কর্মস্থল ও এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো নিয়েও সচেতন হতে হবে।

মশাবাহিত রোগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর লড়াই শুরু হয় রোগী হওয়ার পর নয়, তার আগেই। কয়েক মিনিটের নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং মশার কামড় থেকে সুরক্ষার অভ্যাস একটি পরিবারকে যেমন নিরাপদ রাখতে পারে, তেমনি পুরো এলাকার সংক্রমণের ঝুঁকিও কমাতে সাহায্য করতে পারে।



বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে দৈনিক নতুন জামালপুর টিম।

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies