মোহাম্মদ এলমাসরি ।।
মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁর তৃতীয় মেয়াদের মেয়াদ শেষ হলে ২০৩০ সালের এপ্রিলে তিনি ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন। তাঁর এই ঘোষণায় অনেক পর্যবেক্ষক বিস্মিত হয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরেই ধারণা করা হচ্ছিল, সংবিধান সংশোধন করে আরও এক মেয়াদে, এমনকি অনির্দিষ্টকাল ক্ষমতায় থাকার পথ তৈরি করতে পারেন সিসি।
তবে মিসরের সামরিক একাডেমির এক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে সিসি বলেছেন, ক্ষমতা ছাড়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। সংবিধান নিয়ে কেউ কোনো ধরনের কারসাজি করবে না বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
কিন্তু হঠাৎ এই ঘোষণা কেন? কেউ কেউ মনে করছেন, চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পক্ষে জনসমর্থন তৈরি করতেই এমন কথা বলেছেন সিসি। আবার এমন ধারণাও রয়েছে, সেনাবাহিনী তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারে, সেই আশঙ্কা থেকেই আগাম অবস্থান নিয়েছেন তিনি। তবে আরেকটি সম্ভাবনাও রয়েছে। সিসি হয়তো নিজের বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এমনভাবে, যাতে তাঁর পরও মিসরের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর আধিপত্য অটুট থাকে।
প্রথমেই মনে রাখা দরকার, কর্তৃত্ববাদী কোনো শাসকের স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ।
সিসির ক্ষেত্রেও ২০৩০ সালে ক্ষমতা ছাড়ার অর্থ হবে, ভবিষ্যতে মিসরের কোনো সরকার দেশের সংকটগুলোর দায় তাঁর ওপর চাপানোর সুযোগ পাবে। এমনকি তাঁর শাসনামলে সংঘটিত কথিত অপরাধের জন্য তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করার উদ্যোগও নেওয়া হতে পারে।
২০১৩ সালে মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার সামরিক অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সিসি। ওই অভ্যুত্থানের পর গণহত্যার ঘটনা ঘটে এবং রাজনীতিক, অধিকারকর্মী ও সাংবাদিকসহ হাজার হাজার মানুষকে কারাগারে পাঠানো হয়।
সিসি সরকারের অর্থনৈতিক নীতিও দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনার মুখে। বিরোধীদের অভিযোগ, দুর্নীতি, দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং লোকদেখানো বৃহৎ প্রকল্পে বিপুল ব্যয়ের কারণে দেশটির অর্থনীতি চাপে পড়েছে।
মিসরের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৮১ শতাংশের সমান ঋণ রয়েছে। ঋণের সুদ পরিশোধেই যে অর্থ ব্যয় হয়, তা স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সরকারি কর্মীদের বেতন ও ভর্তুকি খাতে সম্মিলিত ব্যয়ের চেয়েও বেশি। এদিকে ২০১৪ সালের পর মার্কিন ডলারের বিপরীতে মিসরীয় পাউন্ডের মূল্য ৮০ শতাংশের বেশি কমেছে। একই সময়ে পুঞ্জীভূত মূল্যস্ফীতি ছাড়িয়েছে ৪৬০ শতাংশ।
এমন পরিস্থিতিতে ২০৩০ সালে ক্ষমতা ছাড়ার ঘোষণা অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত মনে হয়েছে। কারও কারও ধারণা, বাস্তবে ক্ষমতা ছাড়ার কোনো ইচ্ছা সিসির নেই। অতীতের মতো শেষ পর্যন্ত নিজের ঘোষণার বিপরীতেও যেতে পারেন তিনি।
২০১৩ সালে মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর সিসি জানিয়েছিলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেবেন না।
আবার ২০১৭ সালে সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেছিলেন, সংবিধানে নির্ধারিত চার বছর মেয়াদের দুটি পর্ব বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তা পরিবর্তন করবেন না। কিন্তু ২০১৯ সালে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগে তিনি নিজেই নেতৃত্ব দেন।
গত সপ্তাহে মিসরের সংবাদমাধ্যম মাদা মাসরকে এক বিচার বিভাগীয় সূত্র জানিয়েছে, সিসির সাম্প্রতিক ঘোষণায় এমন সুযোগ রাখা হয়েছে, যাতে তাঁর পক্ষে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার জন্য ‘জনগণের পক্ষ থেকে দাবি’ তোলা যায়।
দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি হলো, সামরিক বাহিনীর সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ ঠেকাতেই সিসি আগেভাগে ক্ষমতা ছাড়ার কথা বলছেন। অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
২০১১ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ শুরু হলে সেনাবাহিনী তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতেও সেনাবাহিনী চাইলে জনরোষ প্রশমিত করতে সিসিকে সংকটের জন্য দায়ী ব্যক্তি হিসেবে সামনে আনতে পারে। তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে এমন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে, যিনি একদিকে দেশের স্থিতিশীলতার একটি ধারণা বজায় রাখবেন, অন্যদিকে সেনাবাহিনীর বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থও সুরক্ষিত রাখবেন।
সম্প্রতি মিসরের এক সংসদ সদস্য জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত বৈঠকে সিসিকে বলতে শুনেছেন, সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার অপেক্ষায় থাকার চেয়ে তিনি নিজেই পদত্যাগ করতে চান।
তবে তৃতীয় সম্ভাবনাটি আরও বেশি মনোযোগের দাবি রাখে। সিসি হয়তো প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কিন্তু একই সঙ্গে এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছেন, যাতে তাঁর বিদায়ের পরও মিসরের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রাধান্য বজায় থাকে।
ঘোষণাটি দেওয়ার সময় সিসির সংবিধানের ২০০ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করা সম্ভবত তাৎপর্যপূর্ণ। এই অনুচ্ছেদ মিসরের রাজনীতিতে সশস্ত্র বাহিনীকে বিশেষ ভূমিকা পালনের সুযোগ দিয়েছে।
২০১৯ সালে সংশোধিত অনুচ্ছেদটিতে সেনাবাহিনীকে দেশের ‘গণতন্ত্র’ এবং জনগণের ‘অর্জন, অধিকার ও স্বাধীনতা’ রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সিসির ভাষ্য অনুযায়ী, এই অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য হলো, ‘মিসরীয় রাষ্ট্রকে এমন যেকোনো অনুপ্রবেশের চেষ্টা থেকে রক্ষা করা, কিংবা এমন ব্যক্তিদের রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া থেকে বিরত রাখা, যাঁরা এই দেশের দায়িত্ব সামলাতে সক্ষম নন বা রাষ্ট্রের অর্থই বোঝেন না।’
সংবিধানের ২০০ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে ২৩৪ নম্বর অনুচ্ছেদ যুক্ত করলে সেনাবাহিনীর প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়। ২৩৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিয়োগের আগে প্রেসিডেন্টকে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ পরিষদের অনুমোদন নিতে হয়। ফলে মিসরের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণের সুযোগ যথেষ্ট বিস্তৃত।
দেশের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট বেছে নেওয়ার বিষয়ে সিসির প্রস্তাবেও সেনাবাহিনীকে বড় ভূমিকা দেওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে। তাঁর পরিকল্পনায় বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। এই কমিটি এমন আইন প্রণয়নের খসড়া তৈরি করবে, যার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষিত শত শত মিসরীয়কে বাছাই করে সামরিক একাডেমিতে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
সিসির প্রস্তাব অনুযায়ী, আবেদনকারীদের বয়স হতে হবে ৪০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে এবং তাঁদের ডক্টরেট ডিগ্রি থাকতে হবে। নির্বাচিত ব্যক্তিদের মিসরীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ নিতে সামরিক একাডেমিতে ৩০ মাস কাটাতে হবে।
এই কর্মসূচির আওতায় ভবিষ্যতের মন্ত্রী, গভর্নর ও সংসদ সদস্যদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংবিধানের ২০০ ও ২৩৪ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে এই প্রস্তাব যুক্ত করলে মনে হয়, সিসির বিদায়ের বহু পরও সেনাবাহিনীর আধিপত্য ধরে রাখার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। একই সঙ্গে এই ব্যবস্থা সিসির নিজের জন্যও সুবিধাজনক হতে পারে।
কারণ, সত্যিকার অর্থে স্বাধীন কোনো বেসামরিক প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নিলে সিসির শাসনামলে সংঘটিত গণহত্যা, দুর্নীতির অভিযোগ কিংবা অন্যান্য কথিত অপরাধের তদন্ত শুরু করতে পারেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া থেকে এমন পরিণতি আসার সম্ভাবনা খুবই কম।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর ক্রমেই হতাশ ও সমালোচনামুখর হয়ে ওঠা মিসরের জনগণ কীভাবে এই ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া জানাবে। সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত এই প্রক্রিয়ায় জনগণের সরাসরি রায় বা জনসমর্থনের প্রয়োজন কার্যত পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
আপাতত সিসি ও সেনাবাহিনীই মিসরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সক্রিয়। তবে শেষ পর্যন্ত জনগণই হয়তো এই সমীকরণ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।



