Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
মতামত

সত্য লিখতে গিয়ে প্রাণ দিলেন আলিফ ফকির: সাংবাদিকের রক্তের দায় নেবে কে?

সত্য লিখতে গিয়ে প্রাণ দিলেন আলিফ ফকির: সাংবাদিকের রক্তের দায় নেবে কে?

একজন সাংবাদিক। অপরাধের মুখোশ উন্মোচনে কখনো মুচি, কখনো ফেরিওয়ালা, কখনো মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াতেন সীমান্ত এলাকায়। তাঁর লক্ষ্য ছিল অপরাধের শিকড় খুঁজে বের করা, পর্দার আড়ালে থাকা অপরাধীদের জনসমক্ষে হাজির করা। সেই অনুসন্ধানই শেষ পর্যন্ত তাঁকে ঠেলে দিল মৃত্যুর মুখে।

বলছি, নেত্রকোনার দুর্গাপুরের অনুসন্ধানী সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের কথা।

গত ১৫ অক্টোবর রাতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে থেমে গেছে তাঁর জীবন। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁকে লক্ষ্য করে পরপর পাঁচ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। একটি প্রাণ ঝরে গেল, থেমে গেল একটি কলম। কিন্তু যে প্রশ্নগুলো রেখে গেলেন আলিফ, তার জবাব দেবে কে?

আলিফের সাংবাদিকতা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট অপরাধের অন্ধকারে আলো ফেলা। ছদ্মবেশে তথ্য সংগ্রহ করে তিনি তুলে আনতেন অপরাধজগতের অজানা চিত্র। এতে স্বার্থে আঘাত লাগছিল কারও কারও। তাঁর লেখালেখি বন্ধ করতে প্রভাবশালী মহল থেকে চাপ এসেছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু তিনি পিছু হটেননি।

এর আগেও একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছেন আলিফ। মৃত্যুর কিছুদিন আগে নিজের নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশ সুপারের কাছে আবেদন করেছিলেন বলেও জানা গেছে। তারপরও তাঁকে বাঁচানো গেল না।

প্রশ্ন হচ্ছে, একজন সাংবাদিক বারবার হামলার শিকার হওয়ার পরও কেন নিরাপত্তা পেলেন না?

তাঁর আবেদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছেছিল কি না, পৌঁছে থাকলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এসব প্রশ্নের উত্তর চাই। আগের হামলা, সম্ভাব্য হুমকি এবং হত্যাকাণ্ডের মধ্যে কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, তাও তদন্ত করে দেখতে হবে। কাউকে আগাম দায়ী করা নয়; প্রয়োজন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিচার।

একজন নাগরিক নিজের জীবনের আশঙ্কা জানিয়ে রাষ্ট্রের কাছে সুরক্ষা চাইবেন, তারপরও যদি গুলিতে প্রাণ হারান, তবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

অপরাধীর অস্ত্রের চেয়ে কলম কি দুর্বল?

সাংবাদিকের কাজ অপরাধের বিচার করা নয়; অপরাধের তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরা। বিচার করবে আইন ও আদালত। কোনো প্রতিবেদন কারও স্বার্থে আঘাত করলে তার জবাব দেওয়ার পথও আইনের মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু ভয় দেখানো, হামলা কিংবা হত্যার মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করার অধিকার কারও নেই।

আলিফ ফকিরের হত্যাকাণ্ড তাই শুধু একজন সাংবাদিকের প্রাণহানির ঘটনা নয়। এটি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পরিবেশ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের জন্যও গুরুতর সতর্কবার্তা।

সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অপরাধী চক্রের তৎপরতা অনুসন্ধান করতে গিয়ে সাংবাদিকেরা নানা ঝুঁকির মুখে পড়েন। এসব চক্রের পেছনে কারা রয়েছে, তাদের সঙ্গে প্রভাবশালী কোনো মহলের যোগাযোগ আছে কি না তা খতিয়ে দেখা জরুরি। আলিফের হত্যার তদন্তেও তাঁর প্রকাশিত প্রতিবেদন, পাওয়া হুমকি, আগের হামলা এবং নিরাপত্তার আবেদন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, তার পরিচয় যেন তদন্তের পথে বাধা না হয়। তদন্তের নামে কালক্ষেপণ কিংবা বিচারহীনতার পুনরাবৃত্তি হলে অপরাধীদের কাছে ভুল বার্তা যাবে—সাংবাদিককে হত্যা করেও পার পাওয়া সম্ভব।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে হবে

সাংবাদিক হত্যার পর প্রতিবাদ হয়, বিবৃতি আসে, মানববন্ধন হয়। তারপর একসময় আলোচনার কেন্দ্র থেকে ঘটনাটি হারিয়ে যায়। কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবার বিচারপ্রাপ্তির অপেক্ষায় থাকে, আর সাংবাদিকদের নিরাপত্তাহীনতা থেকে যায়।

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যার দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া সেই উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হয়নি। এমন দীর্ঘসূত্রতা মানুষের মনে প্রশ্ন তোলে—সাংবাদিক হত্যার বিচার কি আদৌ অগ্রাধিকার পায়?

প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার আলাদা। তবু একের পর এক ঘটনায় বিচার বিলম্বিত হলে জবাবদিহির সংকট প্রকট হয়। অপরাধীরা উৎসাহিত হতে পারে, আর সত্য অনুসন্ধানীরা হয়ে পড়েন ভীত ও একাকী।

আলিফ ফকির হত্যার ক্ষেত্রে তাই শুধু ঘাতকদের শনাক্ত করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। হত্যার পেছনের উদ্দেশ্য, সম্ভাব্য সহযোগী এবং আগে পাওয়া হুমকির বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি তাঁর নিরাপত্তার আবেদন নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী করেছিল, সেটিও স্পষ্ট করতে হবে।

সাংবাদিকদের জন্য কার্যকর অভিযোগব্যবস্থা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। হুমকির অভিযোগকে অবহেলা করলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, আলিফের মৃত্যু সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে।

আলিফের মৃত্যুতে রাষ্ট্রের পরীক্ষা

একজন সাংবাদিক নিহত হলে তাঁর পরিবার হারায় প্রিয়জন, জীবিকার অবলম্বন ও ভবিষ্যতের ভরসা। সমাজ হারায় এমন একজন মানুষকে, যিনি অনিয়মের খবর তুলে ধরে জনস্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারতেন।

সত্য প্রকাশের জন্য যদি সাংবাদিককে প্রাণের ঝুঁকি নিতে হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গোটা সমাজ। দুর্নীতি, চোরাচালান, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে তথ্য প্রকাশ কঠিন হয়ে পড়লে অন্ধকারই শক্তিশালী হয়। শেষ পর্যন্ত তার মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।

আলিফ ফকির আর ফিরবেন না। কিন্তু তাঁর হত্যার বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব। তাঁর নিরাপত্তা চাওয়ার পর কী ঘটেছিল, তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব। ভবিষ্যতে অন্য কোনো সাংবাদিককে যেন একই পরিণতির মুখোমুখি হতে না হয়, সেই ব্যবস্থাও গড়ে তোলা সম্ভব।

এখন প্রয়োজন সদিচ্ছার প্রমাণ কথায় নয়, কাজে।

আলিফ ফকিরের হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর নিরাপত্তার আবেদন নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে হবে। সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রতিটি ঘটনায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

রাষ্ট্র যদি সত্য অনুসন্ধানী সাংবাদিককে সুরক্ষা দিতে না পারে, তবে অপরাধের বিরুদ্ধে জনস্বার্থের লড়াই দুর্বল হয়ে পড়বে। আর অপরাধীরা যদি অস্ত্রের জোরে কলম থামিয়ে দেওয়ার সাহস পায়, তবে আইনের শাসন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

আলিফের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা শোক প্রকাশে নয়, বিচার নিশ্চিত করার মধ্যেই। একটি কলম থামিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু সত্যের প্রয়োজনকে মুছে ফেলা যায় না।

প্রশ্ন শুধু আলিফ ফকিরকে কে হত্যা করল, তা নয়। প্রশ্ন হলো—সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্র কতটা পালন করছে?

এই প্রশ্নের জবাব এখন রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies