রুমা আক্তার ।। কাঠের স্থাপনা, রান্নাঘরের আগুন, জরুরি বহির্গমন ও অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন উপেক্ষা করলে মুহূর্তেই পর্যটকের আনন্দ পরিণত হতে পারে প্রাণঘাতী বিপর্যয়ে।
সমুদ্রের নীল জলরাশি, বিস্তীর্ণ বালুচর আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিবছর হাজারো পর্যটক ছুটে যান কক্সবাজারে। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে সৈকতসংলগ্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে নানা ধরনের রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ। কাঠ, বাঁশ ও অন্যান্য দাহ্য উপকরণে তৈরি এসব স্থাপনার অনেকগুলো দেখতে আকর্ষণীয় হলেও সেগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটোয়ারটেক সৈকতে কাঠের তৈরি টুপটুপ রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁয় অগ্নিকাণ্ড সেই প্রশ্নকে আবারও সামনে এনেছে। শনিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে লাগা আগুনে জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টটির ফায়ার সার্ভিসের সনদ না থাকা এবং আগেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার তথ্যও সামনে এসেছে।
এই ঘটনা কেবল একটি রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে না; বরং দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ব্যবসায়িক সম্প্রসারণের সঙ্গে মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে আনে।
কাঠের রিসোর্টে আগুন কেন ভয়াবহ হয়ে ওঠে?
কাঠের স্থাপনার নান্দনিকতা পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি এসব রিসোর্ট অনেকের কাছে আরামদায়ক ও ব্যতিক্রমী আবাসনের অভিজ্ঞতা তৈরি করে। কিন্তু কাঠ, বাঁশ, শুকনো খড়, পর্দা, ফোমের আসবাব ও অন্যান্য দাহ্য উপকরণের আধিক্য আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
একটি ছোট আগুনও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠতে পারে যদি স্থাপনায় পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম না থাকে, বৈদ্যুতিক সংযোগ ত্রুটিপূর্ণ হয় কিংবা আগুন ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর ব্যবস্থা না থাকে। কাঠের তৈরি বহুতল স্থাপনায় আগুন লাগলে সিঁড়ি ও চলাচলের পথ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়তে পারে। ঘন কালো ধোঁয়া শ্বাস নিতে বাধা দেয়, দৃষ্টিশক্তি কমিয়ে দেয় এবং নিরাপদে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন করে তোলে।
টুপটুপ রিসোর্টের নিচতলায় ছিল রেস্তোরাঁ ও রান্নাঘর। ওপরের দুই তলায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। ফলে রান্নাঘরে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকলে তা দ্রুত অন্য তলায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তবে আগুনের প্রকৃত কারণ নির্ধারণের জন্য তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করা জরুরি।
রান্নাঘরের সামান্য অসতর্কতাও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে
রেস্তোরাঁ ও রিসোর্টে রান্নাঘর আগুনের অন্যতম সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থান। গ্যাসের চুলা, সিলিন্ডার, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, তেল-চর্বি এবং দাহ্য উপকরণ একসঙ্গে থাকায় সেখানে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
রান্নার চুলা বা গ্যাসের সংযোগে ত্রুটি, গ্যাস লিকেজ, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট কিংবা জ্বলন্ত চুলা অযত্নে রেখে দেওয়া থেকে অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে। আবার রান্নাঘরে আগুন লাগার পর ভুল পদ্ধতিতে তা নেভানোর চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।
তাই রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁয় নিয়মিত গ্যাসের সংযোগ পরীক্ষা, বৈদ্যুতিক তারের রক্ষণাবেক্ষণ, রান্নাঘরে উপযুক্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখা এবং কর্মীদের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। শুধু সরঞ্জাম থাকলেই হবে না, সেগুলো কার্যকর আছে কি না এবং কর্মীরা ব্যবহার করতে জানেন কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
লাইসেন্স ও পরিদর্শন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকের বক্তব্য অনুযায়ী, টুপটুপ রিসোর্টটির ফায়ার সার্ভিসের সনদ ছিল না। গত জুনে পরিদর্শনের পর প্রতিষ্ঠানটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে সতর্ক করে নোটিশও দেওয়া হয়েছিল। তারপরও রিসোর্টটির কার্যক্রম চালু ছিল।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন কেবল প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়। একটি স্থাপনায় আগুন লাগলে মানুষ কীভাবে বের হবে, আগুন নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জাম কোথায় থাকবে, জরুরি সিঁড়ি ও বহির্গমনপথ যথেষ্ট কি না এবং বৈদ্যুতিক ও গ্যাসব্যবস্থা নিরাপদ কি না, এসব বিষয় যাচাইয়ের সঙ্গে অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন জড়িত।
ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত কোনো প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করার পরও যদি কার্যক্রম চালু রাখার সুযোগ থাকে, তাহলে পরিদর্শন ও নোটিশের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। শুধু নোটিশ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, পুনরায় পরিদর্শন এবং প্রয়োজন হলে আইন অনুযায়ী কার্যক্রম বন্ধ রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হয়।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রিসোর্ট মালিকের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনেরও।
জরুরি বহির্গমন না থাকলে বিপদ বাড়ে
রিসোর্টে আগুন লাগলে অতিথিদের বড় একটি অংশ ঘুমিয়ে থাকতে পারেন। অনেকে অপরিচিত পরিবেশে থাকেন এবং ভবনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ সম্পর্কেও তাঁদের স্পষ্ট ধারণা থাকে না। আগুন বা ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে আতঙ্কের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
এ জন্য প্রতিটি রিসোর্টে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত জরুরি বহির্গমনপথ, প্রয়োজনীয় সিঁড়ি, জরুরি আলোকব্যবস্থা এবং সহজে দেখা যায় এমন দিকনির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। বহির্গমনপথ কখনো তালাবদ্ধ রাখা বা মালামাল দিয়ে আটকে রাখা উচিত নয়। ভবনের নকশা ও ধারণক্ষমতা অনুযায়ী নিরাপদে বের হওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
অতিথিদের কক্ষের ভেতরেও জরুরি নির্গমনপথের তথ্য, অগ্নিকাণ্ডের সময় করণীয় এবং যোগাযোগের নম্বর রাখা যেতে পারে। কর্মীদের নিয়মিত মহড়া করাতে হবে, যাতে বাস্তব পরিস্থিতিতে তাঁরা দ্রুত অতিথিদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে পারেন।
পর্যটকদেরও কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন
নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানের হলেও পর্যটকদের সচেতনতাও প্রাণহানি কমাতে সহায়তা করতে পারে। কোনো রিসোর্টে প্রবেশের পর কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি।
প্রথমত, কক্ষে ওঠার পর জরুরি বহির্গমনপথ ও সিঁড়ি কোথায়, তা দেখে নিন। শুধু লিফট বা প্রধান প্রবেশপথের ওপর নির্ভর করবেন না।
দ্বিতীয়ত, বৈদ্যুতিক তার, সকেট, গ্যাসের গন্ধ কিংবা অস্বাভাবিক তাপের মতো ঝুঁকির লক্ষণ দেখলে সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষকে জানান। সন্দেহজনক বৈদ্যুতিক সংযোগ নিজে মেরামত করার চেষ্টা করবেন না।
তৃতীয়ত, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ও অ্যালার্মের ব্যবস্থা আছে কি না, তা লক্ষ করুন। জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগের নম্বর জেনে রাখুন।
চতুর্থত, আগুন লাগলে দ্রুত নিরাপদ বহির্গমনপথ দিয়ে বেরিয়ে যান। ধোঁয়া জমে গেলে নিচু হয়ে চলুন এবং নিরাপদ পথ থাকলে ব্যবহার করুন। লিফট ব্যবহার করবেন না। ব্যক্তিগত মালপত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে সময় নষ্ট করবেন না।
পঞ্চমত, আগুনে আটকা পড়লে ধোঁয়ায় ভরা করিডর বা সিঁড়ি দিয়ে জোর করে বের হওয়ার চেষ্টা করবেন না। নিরাপদ বিকল্প থাকলে সেটি ব্যবহার করুন; অন্যথায় দরজা বন্ধ রেখে ধোঁয়া প্রবেশের ফাঁক কাপড় দিয়ে আটকে জরুরি সেবায় নিজের অবস্থান জানান। উদ্ধারকারীদের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
আগুনে পোড়া বা ধোঁয়ায় আক্রান্ত কাউকে উদ্ধার করার ক্ষেত্রেও নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ছাড়া জ্বলন্ত ভবনে প্রবেশ করলে উদ্ধারকারীরাও বিপদে পড়তে পারেন।
পর্যটন ব্যবসায় মুনাফার আগে মানুষের জীবন
পর্যটন খাত স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান, ব্যবসা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। নতুন রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ গড়ে ওঠা এই খাতের বিকাশে ভূমিকা রাখে। কিন্তু নিরাপত্তার ন্যূনতম শর্ত পূরণ না করে ব্যবসা পরিচালনা করলে সেই বিকাশই মানুষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে সমুদ্রসৈকত ও পর্যটনকেন্দ্রসংলগ্ন এলাকায় নির্মিত কাঠের কটেজ, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁগুলোর জন্য সমন্বিত নিরাপত্তা পরিদর্শন প্রয়োজন। শুধু নতুন স্থাপনা নয়, বহু বছর ধরে চালু থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর অগ্নিনিরাপত্তাও নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার এবং পর্যটনসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেই এমন প্রতিষ্ঠানকে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি পর্যটন ব্যবসায়ীদের অগ্নিনিরাপত্তা বিধি, ভবনের নিরাপদ নকশা এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।
শুষ্ক মৌসুমে দাহ্য উপকরণে আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য পর্যটন স্থাপনায় বিশেষ পরিদর্শন চালানো প্রয়োজন। শুধু কাগজপত্র যাচাই নয়, বাস্তবে অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম সচল আছে কি না, জরুরি বহির্গমনপথ ব্যবহারযোগ্য কি না এবং কর্মীরা প্রশিক্ষিত কি না, সেগুলোও পরীক্ষা করতে হবে।
দুর্ঘটনার পর নয়, আগেই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি
পাটোয়ারটেকের অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও দায় নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। তদন্তে অগ্নিকাণ্ডের উৎস, ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা, অনুমোদন এবং পূর্ববর্তী সতর্কবার্তার পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, সেসব বিষয় খতিয়ে দেখা উচিত। তদন্তের ভিত্তিতে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকানোর কার্যকর সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে।
একটি অগ্নিকাণ্ডের পর শোক প্রকাশ, তদন্ত কমিটি গঠন কিংবা সতর্কবার্তা দেওয়ার মধ্যেই দায়িত্ব সীমাবদ্ধ থাকলে একই ধরনের ঝুঁকি অন্য কোথাও থেকে যেতে পারে। তাই প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, বিধিবিধানের বাস্তব প্রয়োগ এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার নীতি।
পর্যটকেরা একটি সুন্দর জায়গায় বেড়াতে যান, নিরাপদে সময় কাটাতে চান এবং সুস্থভাবে বাড়ি ফিরতে চান। তাঁদের সেই প্রত্যাশা পূরণ করা পর্যটন ব্যবসার মৌলিক দায়িত্ব। কাঠের রিসোর্টের নান্দনিকতা, সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য কিংবা ব্যবসায়িক লাভের চেয়ে মানুষের জীবনের মূল্য অনেক বেশি।
পাটোয়ারটেকের অগ্নিকাণ্ড থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ অগ্নিনিরাপত্তায় সামান্য অবহেলাও কখনো কখনো অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে।



