শওকত জামান ||
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার, রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের প্রশ্নে বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। অথচ রাজনৈতিক দায় স্বীকার, অনুশোচনা প্রকাশ ও অতীতের অপরাধের জবাবদিহির বদলে পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোর অনুসারীদের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে হেনস্তার অভিযোগ সেই উদ্বেগকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধিতা কিংবা সরকারের সমালোচনা গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু প্রতিবাদের নামে কাউকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা, ভয় দেখানো কিংবা সংঘবদ্ধভাবে আক্রমণের চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন প্রতিনিধির সঙ্গে বিদেশের মাটিতে এমন ঘটনার অভিযোগ উঠলে তার প্রকৃত ঘটনা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং ঘটনার পেছনের উদ্দেশ্য নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। অপরাধ প্রমাণিত হলে পরিচয় ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বিবেচনা না করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
জুলাইয়ের রক্তের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ, হত্যাকাণ্ড ও ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। অসংখ্য প্রাণহানি, আহত মানুষের দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগ এবং স্বজন হারানো পরিবারের কান্না কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। এসব ঘটনার দায় নির্ধারণ, সত্য উদ্ঘাটন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এত প্রাণহানির পর সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা আত্মসমালোচনা করেছে? ভুক্তভোগীদের প্রতি দায় স্বীকার, নিরপেক্ষ তদন্তে সহযোগিতা এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে কী ধরনের ভূমিকা রাখা হয়েছে? এসব প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গিয়ে কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করলে অতীতের ক্ষত আরও গভীর হবে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি কোনো দলের সব সদস্য, সমর্থক কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রমাণ ছাড়াই হত্যাকাণ্ডের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা ন্যায়বিচারের নীতির পরিপন্থী। অপরাধের দায় ব্যক্তির ভূমিকা, নির্দেশ, অংশগ্রহণ ও প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল বানিয়ে কেউ যেন দায়মুক্তি না পায়, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দোসরদের ভূমিকা ও গণমাধ্যমের দায়
রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার যখন ঘটে, তখন তার পক্ষে জনমত তৈরিতে কিছু সুবিধাভোগী ব্যক্তি, প্রচারক ও প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নেই। ক্ষমতাসীনদের অন্যায় আড়াল করা, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য উপেক্ষা করা কিংবা সহিংসতাকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা সাংবাদিকতার মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সাংবাদিকের দায়িত্ব কোনো রাজনৈতিক দলকে রক্ষা করা নয়; সত্য তুলে ধরা, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা এবং নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা। যে সাংবাদিক অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন, তাঁকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অপমান করা যেমন অন্যায়, তেমনি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ আড়াল করার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।
একইভাবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ব্যক্তির উসকানিমূলক বক্তব্য বা সহিংসতাকে সমর্থন করার অভিযোগ উঠলে তা যাচাই করা দরকার। সমালোচনা, ব্যঙ্গ কিংবা রাজনৈতিক অবস্থানকে অপরাধের সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না। কিন্তু প্রমাণিত উসকানি, সহিংসতায় প্রত্যক্ষ সহযোগিতা কিংবা অপরাধ আড়াল করার ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং অপরাধের জবাবদিহি দুটিই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে হবে
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের অন্যতম বড় কারণ হলো, ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় প্রভাবশালীরা অনেক সময় আইনের ঊর্ধ্বে থাকার সুযোগ পেয়েছেন এমন অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। সরকার পরিবর্তন হলেও তদন্ত, বিচার ও প্রশাসনের কাঠামোয় প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে সেই সংস্কৃতি ফিরে আসার আশঙ্কা থেকেই যায়।
জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি অতীতের গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। প্রতিটি মামলায় সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষীদের নিরাপত্তা, ভুক্তভোগী পরিবারের আইনি সহায়তা এবং স্বাধীন বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী আইনসম্মত শাস্তি কার্যকর করতে হবে; কিন্তু জনরোষ কিংবা রাজনৈতিক প্রতিশোধের ভিত্তিতে নয়।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যেসব গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর বিচারও স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায় এগিয়ে নিতে হবে। কোনো সংগঠনের নেতৃত্ব বা কাঠামোর বিরুদ্ধে অপরাধে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী সাংগঠনিক দায় নির্ধারণের প্রশ্নও বিবেচনায় আসতে পারে। তবে দলীয় পরিচয়মাত্রই অপরাধের প্রমাণ নয়। বিচারপ্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে প্রমাণ, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগের ওপর।
প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারই হোক লক্ষ্য
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল বৈষম্য, নিপীড়ন ও ক্ষমতার অপব্যবহারমুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে কেবল পুরোনো শাসকগোষ্ঠীর বিচার করলেই চলবে না; নতুন করে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন ক্ষমতার অপব্যবহার করতে না পারে, তারও নিশ্চয়তা দিতে হবে।
প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগে কোনো পক্ষপাত চলবে না। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিকে হেনস্তার অভিযোগ হোক কিংবা দেশের ভেতরে সাধারণ নাগরিকের ওপর হামলা প্রতিটি ঘটনার তদন্ত ও প্রতিকার হতে হবে একই নীতিতে।
জুলাইয়ের শহীদদের রক্তের প্রতি প্রকৃত সম্মান দেখানোর পথ প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করা নয়; বরং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের পথ বন্ধ করা।
গণহত্যার বিচার চাই, অপরাধীর দায়মুক্তি চাই না। কিন্তু সেই বিচার হতে হবে আইনের শাসনে, প্রতিশোধের রাজনীতিতে নয়। অন্যথায় ক্ষমতার পালাবদল ঘটবে, মুখ বদলাবে, কিন্তু বিচারহীনতার পুরোনো সংস্কৃতি থেকেই যাবে। বাংলাদেশের মানুষ আর সেই বৃত্তে ফিরে যেতে চায় না।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী



