Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
জামালপুর

জামালপুরের ইতিকথা-১০: হারিয়ে যাওয়া পাবলিক মেলার যে আলোয় জেগে উঠত জামালপুর

সন্ধ্যা নামার আগেই যেন জেগে উঠত পুরো মাঠ। পশ্চিম আকাশের শেষ আলো নিভে আসছে, আর জামালপুর স্টেডিয়ামের পাশের বিস্তীর্ণ মাঠ তখন মানুষের ঢলে টইটম্বুর। একদিকে দোকানের সারি, অন্যদিকে মানুষের অবিরাম স্রোত। কোথাও শিশুদের কোলাহল, কোথাও বিক্রেতার ডাক, কোথাও নাগরদোলার ঘূর্ণি সব মিলিয়ে চারপাশে একটানা উচ্ছ্বাস। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে একে একে জ্বলে উঠত মেলার আলো; সেই আলোয় স্টেডিয়ামের পাশ থেকে বর্তমান জিলা স্কুল মাঠ ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা মনে হতো এক বিশাল আলোকিত জনপদ। হাঁটতে হাঁটতে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যেত চেনা মুখ, দোকানের সামনে থমকে দাঁড়াত পরিবার, আর দূর থেকে আসা মানুষ মিশে যেত জামালপুরের মানুষের সঙ্গে। এক মাসের জন্য শহরের এই অংশটুকুই হয়ে উঠত যেন জামালপুরের সবচেয়ে প্রাণবন্ত ঠিকানা।

স্টেডিয়ামের পাশ থেকে বর্তমান জিলা স্কুল মাঠ ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে মাসব্যাপী চলত সেই পাবলিক মেলা। জামালপুরের মানুষ তো আসতেনই, ব্যবসার পসরা নিয়ে হাজির হতেন শেরপুর, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের ব্যবসায়ীরা। উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ থেকেও আসতেন অনেকে। কাপড়চোপড়, মনিহারি সামগ্রী, বাঁশ-বেতের তৈরি জিনিস, মাটির সামগ্রী, খেলনা, মিষ্টি ও খাবারের দোকান—সব মিলিয়ে মেলার মাঠ হয়ে উঠত এক বিশাল বাণিজ্যিক ও সামাজিক মিলনস্থল।

কিন্তু পাবলিক মেলার আসল গল্প শুধু দোকান, কেনাবেচা কিংবা বিনোদনের নয়। এই মেলার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একটি শহরের জনকল্যাণের ভাবনা। মেলা থেকে অর্জিত লাভের অর্থ ব্যবহৃত হতো জামালপুরের উন্নয়ন ও নানা জনহিতকর কাজে। সেই অর্থে গড়ে উঠেছে পাবলিক লাইব্রেরি, পাবলিক হলসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগ। মানুষের আনন্দের জন্য বসা একটি মেলা এভাবেই শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রয়োজন মেটানোর কাজেও ভূমিকা রাখত। মেলার মাঠে বিপুল মানুষের সমাগম। এত মানুষের পানির চাহিদা মেটাতেও ছিল বিশেষ ব্যবস্থা। স্টেডিয়ামের পূর্বদিকের এক কোণে, আনসার অফিসের সামনে খনন করা হয়েছিল একটি ইদারা। মেলার দিনগুলোতে মানুষের পানির প্রয়োজন মেটাত সেই ইদারা। আজ সেই জায়গায় নেই ইদারাটির শেষ স্মৃতিচিহ্নটুকুও। সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে একটি মেলার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিও।

পাবলিক মেলার মাঠ ছিল নানা জনপদের মানুষের মিলনক্ষেত্র। ব্যবসার পাশাপাশি তৈরি হতো সামাজিক যোগাযোগের নতুন সেতু। দূর জেলা থেকে আসা ব্যবসায়ীরা নিয়ে আসতেন ভিন্ন ভিন্ন পণ্য; স্থানীয় মানুষও পেতেন অন্য এলাকার জিনিসপত্রের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ। এক মাসের জন্য জামালপুর যেন পরিণত হতো বৃহত্তর অঞ্চলের একটি মিলনবিন্দুতে।

আর শিশুদের কাছে? সেটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পৃথিবী। নাগরদোলা, খেলনা, মিষ্টি আর মেলার বিচিত্র আয়োজন ঘিরে তৈরি হতো বিস্ময়। পরিবারের সঙ্গে মেলায় আসা, পছন্দের খেলনার জন্য আবদার, ভিড়ের মধ্যে প্রিয়জনের হাত শক্ত করে ধরে এগিয়ে চলা—এসব মুহূর্তই বহু মানুষের শৈশবের স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল।

তারপর সময় বদলেছে। শহর বেড়েছে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন পরিসর তৈরি হয়েছে। বিনোদনের ধরনও বদলে গেছে। একসময় যে মাঠ মাসজুড়ে মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত, একদিন সেখানে আর বসেনি সেই পাবলিক মেলা।

আজকের জিলা স্কুল মাঠের দিকে তাকালে বোঝার উপায় নেই এখানে একসময় দূরদূরান্তের ব্যবসায়ীরা এসে দোকান সাজাতেন, হাজারো মানুষ মিলিত হতেন, শিশুদের চোখে ফুটত বিস্ময়; আর সেই মেলার লাভের অর্থ ফিরে যেত পাবলিক লাইব্রেরি, পাবলিক হলসহ জামালপুরের নানা জনহিতকর কাজে।

হারিয়ে গেছে মেলার মাঠের সেই কোলাহল। হারিয়েছে এক সময়ের আনসার অফিসের সামনে ইদারাটিও। নেই সেই মাসজুড়ে আলো, নেই দূর জেলা থেকে আসা ব্যবসায়ীদের সারি। কিন্তু ইতিহাসের কিছু আয়োজন জায়গা হারিয়েও স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকে।

পাবলিক মেলা তেমনই এক স্মৃতি যেখানে আনন্দের সঙ্গে মিশে ছিল বাণিজ্য, আর বাণিজ্যের সঙ্গে ছিল জনকল্যাণের দায়।

মেলা নেই। ইদারা নেই। নেই সেই আলো-ভিড়ও।

তবু পুরোনো জামালপুরের স্মৃতির মাঠে আজও যেন সন্ধ্যা নামে আর দূর থেকে ভেসে আসে হারিয়ে যাওয়া এক পাবলিক মেলার কোলাহল…

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies