Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
মতামত

রোহিঙ্গা গণহত্যা: আইসিজের রায় ওআইসির অঙ্গীকারের পরীক্ষা

রোহিঙ্গা গণহত্যা: আইসিজের রায় ওআইসির অঙ্গীকারের পরীক্ষা

চ্যো উইন ।। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) সম্ভাব্য রায় এবার পরীক্ষা নেবে মুসলিম বিশ্বের সংহতির অঙ্গীকারের। বছরের পর বছর সম্মেলন আর প্রস্তাবের পরও রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দিতে পারেনি ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)। রায়ের পর সংস্থাটির সদস্যরাষ্ট্রগুলো কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপরই নির্ভর করবে এই সংহতির বাস্তবতা।

ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) মুসলিম বিশ্বের সংহতিকে নিজেদের পরিচয় ও কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরে। অথচ নয় বছর আগে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গা বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে লাখ লাখ মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য করার পরও তাদের দুর্দশার অবসান হয়নি। আজও রোহিঙ্গারা রাষ্ট্রহীন, সহিংসতার ঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছে। জীবন বাঁচাতে সাগরপথে পালাতে গিয়েও অনেককে মৃত্যুর মুখে পড়তে হচ্ছে। এই দীর্ঘ সময়ে ওআইসি একের পর এক সম্মেলন করেছে, প্রস্তাব পাস করেছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।

১৪ বছর আগে আমি যখন বার্মা হিউম্যান রাইটস নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করি, তখন বিশ্বাস করতাম, নির্ভুলভাবে প্রমাণ সংগ্রহ করে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের সামনে তুলে ধরতে পারলে তারা ব্যবস্থা নেবে। সেই বিশ্বাস থেকেই আমরা গণহত্যা থেকে বেঁচে ফেরা মানুষের সাক্ষ্য সংগ্রহ করেছি। নথিবদ্ধ করেছি পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা গ্রাম ধ্বংস, নাগরিকত্বের অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং একটি জনগোষ্ঠীকে ইচ্ছাকৃতভাবে অনাহারের দিকে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা। কিন্তু এত তথ্যপ্রমাণ সামনে আনার পরও রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা আরও খারাপ হয়েছে।

চলতি বছরের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) মিয়ানমারের কর্মকাণ্ড গণহত্যার সংজ্ঞায় পড়ে কি না, সে বিষয়ে রায় দিতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

মাঝেমধ্যে নিজেকেই প্রশ্ন করেছি, আদালতের একটি রায় কি সত্যিই এই নৃশংসতা থামাতে পারবে? নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে আন্তর্জাতিক বিচারকদের সামনে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে রোহিঙ্গা নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ মুহূর্তগুলো আবারও স্মরণ করতে হয়েছে। তারা বিশ্বাস করেছিলেন, তাঁদের সাক্ষ্য একদিন কাজে আসবে, ন্যায়বিচারের পথ তৈরি করবে।

কিন্তু তাঁদের অনেকেই এখনো বাংলাদেশে অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছেন। খাদ্যসহায়তার ওপর নির্ভরশীল এসব মানুষের জন্য কারও কারও ক্ষেত্রে মাসে বরাদ্দ মাত্র সাত ডলার। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সাগরপথে পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করা প্রতি সাতজন রোহিঙ্গার একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে অথবা তিনি নিখোঁজ হয়েছেন। তাঁদের নিরাপত্তা নেই, আর যেসব সরকার চাইলে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারত, তারাও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়নি।

অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেন, এত হতাশার পরও আমরা কেন কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। এর কোনো সন্তোষজনক উত্তর আমার কাছে নেই। তবে একটি বিষয় জানি, এসব নৃশংসতার তথ্যপ্রমাণ সংরক্ষণ করা না হলে একসময় ঘটনাগুলো অস্বীকার করা আরও সহজ হয়ে যাবে। নির্যাতিত মানুষের মুখে তাঁদের অভিজ্ঞতার বিবরণ শুনেছি, প্রমাণ দেখেছি। এসব জানার পর দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

আমরা এমন অনেক তথ্যপ্রমাণ প্রকাশ করেছি, যেসবের মুখোমুখি হতে বিভিন্ন সরকার অনাগ্রহী ছিল। আমরা এসব নৃশংসতাকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছি। আদালত যদি মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত বলে রায় দেন, তাহলে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ৮০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো রাষ্ট্রকে গণহত্যার দায়ে দায়ী সাব্যস্ত করা হতে পারে।

আগামী ১৭ অক্টোবর বাগদাদে বৈঠকে বসবেন ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। তাঁদের উদ্দেশে আমার বক্তব্য স্পষ্ট। রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের নিপীড়নের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ওআইসি এই মামলার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সদস্যরাষ্ট্রগুলোও সেই উদ্যোগকে সমর্থন করেছে। রোহিঙ্গারা এবং তাঁদের অধিকার নিয়ে কাজ করা আমাদের মতো অনেকেই এই অঙ্গীকারকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি।

রায় ঘোষণার পর আমরা হয়তো তা স্বাগত জানিয়ে বিবৃতি দেখতে পাব, শুনব জবাবদিহি নিশ্চিত করার নতুন প্রতিশ্রুতি। কিন্তু আরেকটি যৌথ বিবৃতি রোহিঙ্গাদের জীবন রক্ষা করবে না। প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ।

ওআইসির সদস্যরাষ্ট্রগুলোর উচিত রোহিঙ্গাদের জোর করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো বন্ধ করা, নিজেদের ভূখণ্ডে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, বাংলাদেশে আশ্রিত শরণার্থীদের জন্য সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং তাদের ওপর নিপীড়নের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে সমন্বিত কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সদস্যরাষ্ট্রগুলোর রয়েছে। প্রশ্ন হলো, তারা সেই ক্ষমতা কাজে লাগাবে কি না।

আঞ্চলিক পর্যায়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যে আচরণ করা হচ্ছে, তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘোষিত সংহতির অঙ্গীকারের বড় ধরনের অসংগতি রয়েছে। কিছু সরকার আন্তর্জাতিক বৈঠকে রোহিঙ্গাদের অধিকার নিয়ে কথা বললেও নিজেদের সীমান্তে আশ্রয়প্রার্থী রোহিঙ্গাদের সমান সুরক্ষা দেয় না। কোনো সরকার একই সঙ্গে মিয়ানমারের জবাবদিহি দাবি করতে পারে না এবং বিপদের মুখে থাকা মানুষকে আবারও সেই বিপদের মধ্যে ঠেলে দিতে পারে না।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছে। বছরের পর বছর ধরে তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর চাপও মোকাবিলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। তবে ওআইসির দায়িত্ব শুধু নিজেদের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা নিয়ে কথা বলা নয়। সংস্থাটির বাইরের দেশগুলো রোহিঙ্গাদের অধিকার লঙ্ঘন করলে তার বিরুদ্ধেও সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের নথিবদ্ধ সাক্ষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ অন্তত ৪০ জন রোহিঙ্গাকে একটি নৌযান থেকে আন্দামান সাগরে নামতে বাধ্য করে। এরপর তাঁদের মিয়ানমারের দিকে সাঁতরে যেতে হয়। রোহিঙ্গাদের এমন বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেওয়া হলেও ওআইসি যদি নীরব থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর নীতি পরিবর্তনের তাগিদই বা তৈরি হবে কেন?

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর যেসব সংগঠন নিরলসভাবে কাজ করে গেছে, প্রবেশাধিকার ও নানা বিধিনিষেধের মধ্যেও যেসব সাংবাদিক তাঁদের কথা তুলে ধরেছেন, নির্যাতিত মানুষকে আন্তর্জাতিক পরিসরে সাক্ষ্য দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন যাঁরা, কিংবা আন্তর্জাতিক মনোযোগ অন্যদিকে সরে গেলেও যেসব অধিকারকর্মী রোহিঙ্গাদের পাশে থেকেছেন, তাঁদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা। আপনাদের এমন দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে, যে দায়িত্ব সেনাবাহিনী ও বিপুল রাষ্ট্রীয় সম্পদের অধিকারী সরকারগুলোরই নেওয়ার কথা ছিল। আপনাদের সংরক্ষণ করা তথ্যপ্রমাণ আজ আন্তর্জাতিক বিচারপ্রক্রিয়ার অংশ।

বাগদাদে বৈঠকে বসতে যাওয়া ৫৭টি দেশের সরকার বারবার রোহিঙ্গাদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগেও সমর্থন দিয়েছে তারা। কিন্তু বাস্তব পদক্ষেপে রূপ না নিলে সংহতির এসব ঘোষণা অর্থহীন হয়ে পড়ে।

দ্য হেগের আদালতের একটি রায় একাই রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। রায় ঘোষণার পর সদস্যরাষ্ট্রগুলো কী করে, সেটিই হবে আসল পরীক্ষা। আদালতের বাইরে তাদের অঙ্গীকার বাস্তবে কতটা কার্যকর, রোহিঙ্গাদের জীবন রক্ষায় তারা কতটা দায়িত্ব নেয়, তা নির্ধারিত হবে সেই পদক্ষেপের মধ্য দিয়েই।- আল জাজিরা থেকে বাংলায় রুপান্তরিত।

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies