বিদ্যা কৃষ্ণন ।। একটি মুরগির পালক যদি একটি একটি করে তুলে নেওয়া হয়, তাহলে নাকি কেউ বিষয়টি টের পায় না। এভাবেই কেউ কেউ নিজেদের সান্ত্বনা দেন, এই ভেবে যে ছোট ছোট অন্যায় কখনো বড় হয়ে সামনে আসবে না, একসময় তার হিসাবও দিতে হবে না।
কিন্তু এই কৌশলের সমস্যা হলো, একদিন সত্য উন্মোচিত হয়েই পড়ে। তখন আর তা উপেক্ষা করার উপায় থাকে না। এ বছরের অক্টোবরে ভারতের গণতন্ত্রের অবস্থাও যেন পালকহীন মুরগির মতো। গণতন্ত্রের আবরণ একে একে খুলে পড়েছে। আর রাজপথে নেমে এসেছেন সেই বিক্ষোভকারীরা, যাঁরা বিদ্রূপাত্মকভাবে নিজেদের ‘তেলাপোকা’ বলে পরিচয় দিচ্ছেন।
গত ১২ বছর ধরে একে একে গণতন্ত্রের পালক উপড়ে ফেলার পর এখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেকে কোণঠাসা অবস্থায় আবিষ্কার করছেন। তাঁকে ব্যারিকেডের আড়ালে আশ্রয় নিতে হচ্ছে। অন্যদিকে, গণতন্ত্রের ক্রমাগত ক্ষয়ে যাওয়া তরুণদের এমন এক অবস্থানে নিয়ে এসেছে, যেখানে হারানোর মতো তাঁদের আর খুব বেশি কিছু নেই, ভয় পাওয়ারও যেন কিছু বাকি নেই।
গত ১০ অক্টোবর ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে বড় ধরনের বিক্ষোভের মুখে পড়ে মোদি সরকার। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে সরকার যেন নিজের বিরুদ্ধেই প্রমাণ হাজির করেছে। জরুরি অবস্থার সময়কার ব্যবস্থার কথা মনে করিয়ে দিয়ে দিল্লিতে ট্রেন চলাচল বন্ধ করা হয়, বিক্ষোভস্থলে আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয় এবং ইন্টারনেট সংযোগে বিঘ্ন ঘটানো হয়।
বিক্ষোভের আগে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিচিত ব্যক্তিদের আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন রত্না সিং, অভিজিৎ দীপকে ও ধ্রুব রাঠি। মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধীসহ আরও অনেক পরিচিত অধিকারকর্মীকেও আটক করা হয়।
কিন্তু এসব পদক্ষেপেও বিক্ষোভকারীদের থামানো যায়নি। দিল্লির রাজপথে নেমে আসেন হাজার হাজার মানুষ। তাঁরা নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। ভারতের বিভিন্ন শহরেও একই দৃশ্য দেখা যায়।
সারাদিন পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের যেন লুকোচুরি চলতে থাকে। নির্ধারিত স্থান থেকে তাঁদের সরিয়ে দেওয়া হলে তাঁরা রাজধানীর অন্য কোনো প্রান্তে আবার জড়ো হন। এক জায়গা থেকে বিতাড়িত হয়ে অন্য জায়গায় ফিরে আসেন। তাঁদের ছত্রভঙ্গ করা যাচ্ছিল, কিন্তু আন্দোলন থেকে সরানো যাচ্ছিল না।
দিন শেষে দিল্লিজুড়ে অন্তত আড়াই হাজার বিক্ষোভকারী এবং ১৫ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়। তাঁদের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত অস্থায়ী আটককেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাঁদের অনেককে ছেড়েও দেওয়া হয়েছে।
সরকারের এসব পদক্ষেপ মোদির নড়বড়ে অবস্থানকে আরও দুর্বল করে তুলেছে। সমালোচকেরা এখন প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা তাঁর আদৌ আছে কি না।
এর আগের দিন শুক্রবার রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলোর নেতারা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা অভিযোগ করেন, সরকার ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করে দিয়েছে।
মোদির শাসনামলে সমস্যাগুলো জাহাজের গায়ে জমে থাকা শামুক-ঝিনুকের মতো একের পর এক জমেছে। প্রতিবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েই তিনি ভারতের প্রতিষ্ঠাকালীন গণতান্ত্রিক আদর্শ থেকে আরও দূরে সরে গেছেন।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর ছিল সেই ধারাবাহিকতার সর্বশেষ উদাহরণ। এটি ছিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার আড়ালে ফ্যাসিবাদী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক প্রচেষ্টা। ১৩ কোটি ভারতীয়ের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার মতো একটি প্রক্রিয়াকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই।
এই প্রক্রিয়া নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করতে সাহায্য করেছে, এমন অভিযোগও এখন আর সহজে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অথচ এসআইআর তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ করছেন না। নৈতিক দায়বোধ থেকে তাঁর সরে দাঁড়ানো উচিত ছিল কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে। এর মধ্যে ২০০৬ সালের একটি দুর্নীতির মামলা তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
দিল্লি ও ভারতের অন্যান্য শহরের রাজপথে যে বিশৃঙ্খল, ক্ষুব্ধ অথচ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মানুষের সমাবেশ দেখা যাচ্ছে, তা বহুদিন ধরে জমে ওঠা অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া তরুণদের বৈচিত্র্য এবং তাঁদের প্রাণচাঞ্চল্যের সঙ্গে মোদি ও তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের স্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে। একদিকে তরুণদের প্রতিবাদী কণ্ঠ, অন্যদিকে বয়সী, রসবোধহীন একদল ক্ষমতাসীন ব্যক্তি, যাঁরা নিজেদের সাফল্যের জন্য মানুষকে কলঙ্কিত করা, বিভাজন তৈরি করা এবং ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার কৌশলের ওপর নির্ভর করেছেন।
মোদির মন্ত্রিসভার অনেক সদস্যের মধ্যে এমন আত্মম্ভরিতা কাজ করেছে যে তাঁরা ভুল করে ধরে নিয়েছিলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অপরাধও মানুষকে মেনে নিতে হবে। বিভাজন তৈরি করে, নতুন নতুন শত্রু চিহ্নিত করে একটি দেশকে অনির্দিষ্টকাল শাসন করা সম্ভব।
কিন্তু আইনের ভঙ্গকারীরা যখন নিজেরাই আইন তৈরির দায়িত্বে বসেন, তখন কী ঘটে, ভারত এখন তারই পরিণতি দেখছে। অপরাধপ্রবণ আচরণ যেন ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। মোদির শাসনামলে এই রাজনৈতিক সংস্কৃতিই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল্যবোধকে প্রভাবিত করেছে। এর মধ্য দিয়ে ভারতের সংবিধানকে কার্যত ছিন্নভিন্ন করা হয়েছে।
এখন সেই কর্মকাণ্ডই মোদির জন্য বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে। ‘তেলাপোকা’দের নির্মূল করতে না পেরে তিনি দিল্লিকে দুর্গে পরিণত করেছেন এবং নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করেছেন।
মোদির শাসনামলের একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্যও এতে স্পষ্ট। মুখে শান্তির আকাঙ্ক্ষার কথা বলা হলেও তাঁর শাসনামলে বারবার সংঘাত তৈরি হয়েছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যেমন উত্তেজনা বেড়েছে, তেমনি শহরের ভেতরে প্রতিবেশীদের মধ্যেও বিভাজন ও বিরোধ উসকে দেওয়া হয়েছে।
১০ অক্টোবরের বিক্ষোভ কেবল সূচনা। আগামী কয়েক সপ্তাহে মোদির সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সিজেপি আন্দোলন জানিয়েছে, তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে। বিরোধী দলগুলোও সোমবার নতুন করে বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছে।
এই ‘তেলাপোকা’ আন্দোলন যেন মোদির প্রধানমন্ত্রীত্বের অযোগ্যতা নিয়ে আর কোনো সংশয় রাখছে না। একই সঙ্গে বিশ্বের সামনে আদর্শ গণতন্ত্র হিসেবে তুলে ধরা ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো যে ভেতর থেকে কতটা ফাঁপা হয়ে পড়েছে, সেটিও উন্মোচিত হচ্ছে।
আপাতত মোদির শাসনের অবসান ঘনিয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছে। ভবিষ্যতে ইতিহাসের পাতায় তাঁর মূল্যায়ন কীভাবে হবে, সে প্রশ্নও সামনে চলে এসেছে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, তাঁর শাসনামল ভারতের একটি পুরো প্রজন্মকে সরকার, সেনাবাহিনী, দিল্লি পুলিশ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সামগ্রিক কাঠামোর ওপর থেকে শ্রদ্ধা ও আস্থা হারানোর দিকে ঠেলে দিয়েছে।
দিল্লি এখন যেন দমবন্ধ করা এক বর্তমান ও আশাব্যঞ্জক ভবিষ্যতের মাঝখানে সাময়িকভাবে থমকে আছে। সময়ের এই কঠিন অধ্যায়ও একদিন পেরিয়ে যাবে।
কিন্তু নিয়ন্ত্রক গোষ্ঠীর প্রভাব এবং দক্ষিণপন্থী মতাদর্শের কারণে রাষ্ট্রের যেসব প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে? সেই প্রশ্নের উত্তর শেষ পর্যন্ত দিতে হবে আজ রাজপথে থাকা মানুষদেরই।
‘তেলাপোকা’ আন্দোলনের প্রতিটি পদক্ষেপে এই উপলব্ধি নিহিত রয়েছে। কারণ, এই আন্দোলনের মূল কথা একটাই: ক্ষমতা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া। -আল জাজিরা থেকে বাংলায় রুপান্তরিত



