
স্ব্যাস্থ্যকথা। রাত বাড়ছে। চারপাশের কোলাহল কমে এসেছে। ঘরের অন্যরা ঘুমিয়ে পড়েছেন। কিন্তু বিছানায় শুয়ে থাকা মানুষটির চোখে ঘুম নেই। কখনো ফেসবুকের নিউজফিড, কখনো ইউটিউবের ভিডিও, কখনো টিকটক কিংবা রিলস। একটি ভিডিও শেষ হতে না হতেই সামনে হাজির হচ্ছে আরেকটি। পরিচিত মানুষের নতুন পোস্ট, মেসেঞ্জারে আসা বার্তা কিংবা কোনো সংবাদ শিরোনাম তাকে আবারও আটকে রাখছে মুঠোফোনের পর্দায়। কখন যে রাত ১২টা পেরিয়ে ১টা, এমনকি ২টা বেজে গেছে, তা-ও অনেক সময় খেয়াল থাকে না।
নিজেকে বলা, আর মাত্র পাঁচ মিনিট। কিন্তু সেই পাঁচ মিনিট কখনো আধা ঘণ্টা, কখনো এক ঘণ্টা হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত যখন ফোনটি পাশে রেখে চোখ বন্ধ করা হয়, তখন ঘুম আসতে দেরি হয়। সকালে অ্যালার্ম বাজার পরও বিছানা ছাড়তে ইচ্ছা করে না। ঘুম ঘুম চোখে শুরু হয় নতুন দিন। ক্লাসে, কর্মক্ষেত্রে কিংবা দৈনন্দিন কাজে মনোযোগ ধরে রাখতেও তৈরি হয় সমস্যা।
এ দৃশ্য এখন অনেক পরিবারের পরিচিত অভিজ্ঞতা। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া, চাকরিজীবী, এমনকি প্রবীণদের মধ্যেও রাত জেগে স্মার্টফোন ব্যবহারের অভ্যাস দেখা যায়।
প্রশ্ন হলো, স্মার্টফোন কি সত্যিই আমাদের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে? নাকি ফোন ব্যবহারের ধরন, অনিয়মিত জীবনযাপন এবং বদলে যাওয়া বিনোদন-সংস্কৃতির সম্মিলিত প্রভাবে আমরা হারিয়ে ফেলছি পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস?
স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের গবেষণা বলছে, শোয়ার আগে দীর্ঘ সময় স্মার্টফোন ব্যবহার ঘুমের সময় পিছিয়ে দিতে পারে, ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে এবং ঘুমের মান খারাপ হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে শুধু ফোনের পর্দার আলোই এর একমাত্র কারণ নয়। ফোনে কী দেখা হচ্ছে, কতক্ষণ দেখা হচ্ছে এবং এর কারণে ঘুমানোর সময় কতটা পিছিয়ে যাচ্ছে, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
ঘুমানোর সময়েও কেন ফোন ছাড়তে পারি না?
একসময় রাতের বিনোদন বলতে ছিল পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গল্প, বই পড়া, রেডিও শোনা কিংবা দিনের কাজ শেষে বিশ্রাম নেওয়া। এখন সেই সময়ের বড় একটি অংশ দখল করেছে স্মার্টফোন। হাতের মুঠোয় বিনোদন, সংবাদ, যোগাযোগ, কেনাকাটা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অফুরন্ত জগৎ।
স্মার্টফোনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে মনোযোগ ধরে রাখার মতো নতুন বিষয় কখনো ফুরিয়ে যায় না। একটি ভিডিও দেখার পর আরেকটি ভিডিও সামনে আসে। একটি পোস্ট পড়ার পর নিচে অপেক্ষা করে আরও অনেক পোস্ট। নতুন বার্তা, মন্তব্য, প্রতিক্রিয়া কিংবা নোটিফিকেশন ব্যবহারকারীকে বারবার ফোনের দিকে ফিরিয়ে নেয়।
ফলে ফোন ব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট শেষ সময় থাকে না। টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠান শেষ হলে দর্শক চাইলে সেটি বন্ধ করতে পারেন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করতে থাকলে শেষ বলে কিছু নেই।
এই অভ্যাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দিনের ব্যস্ততা। অনেকেই দিনের বেলায় কাজ, পড়াশোনা কিংবা পারিবারিক দায়িত্বের কারণে নিজের মতো সময় পান না। রাতে বিছানায় যাওয়ার পর সেটিই হয়ে ওঠে একান্ত অবসর। তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটানোকে অনেকে দিনের চাপ থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে দেখেন।
মনোবিজ্ঞানে নিজের জন্য সময় বের করার তাগিদে ইচ্ছাকৃতভাবে ঘুমাতে দেরি করার প্রবণতাকে বলা হয় ‘বেডটাইম প্রোক্রাস্টিনেশন’। অর্থাৎ ঘুমানোর প্রয়োজন জানা সত্ত্বেও অন্য কাজে ব্যস্ত থেকে ঘুম পিছিয়ে দেওয়া।
তবে সব ক্ষেত্রে এর পেছনে একই কারণ থাকে না। কারও কাজের সময়সূচি অনিয়মিত, কেউ মানসিক চাপের কারণে ঘুমাতে পারেন না, আবার কারও ক্ষেত্রে রাত জেগে ফোন ব্যবহারের অভ্যাসই ঘুমের সময় কমিয়ে দেয়। তাই সমস্যাটিকে শুধু ইচ্ছাশক্তির অভাব হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত কারণগুলো আড়ালে থেকে যেতে পারে।
স্ক্রিনের আলো কীভাবে ঘুমের ছন্দে প্রভাব ফেলে?
মানুষের শরীর একটি স্বাভাবিক জৈবঘড়ি অনুসরণ করে। এই ঘড়ি কখন ঘুম পাবে, কখন শরীর জেগে উঠবে এবং দিনের বিভিন্ন সময়ে শরীরের কার্যক্রম কেমন থাকবে, তা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
দিনের আলো এই জৈবঘড়ির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। অন্যদিকে রাতের অন্ধকার শরীরকে ঘুমের প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করে। সন্ধ্যার পর মস্তিষ্কে মেলাটোনিন নামের হরমোনের নিঃসরণ বাড়তে থাকে। এটি শরীরকে জানায় যে বিশ্রামের সময় ঘনিয়ে এসেছে।
কিন্তু রাতে দীর্ঘ সময় উজ্জ্বল পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকলে সেই আলোর প্রভাবে মেলাটোনিন নিঃসরণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে চোখে পৌঁছানো নীল তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। এর ফলে শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের সংকেত পিছিয়ে যেতে পারে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, স্মার্টফোনের নীল আলোই ঘুমের সমস্যার একমাত্র কারণ নয়। পর্দার উজ্জ্বলতা, ব্যবহারের সময়কাল, মানসিক উত্তেজনা এবং ঘুমানোর সময়ের ওপর ফোন ব্যবহারের প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হয়।
রাতে উত্তেজনাপূর্ণ ভিডিও দেখা, অনলাইনে বিতর্কে জড়িয়ে পড়া, পরীক্ষার ফল নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া কিংবা কর্মক্ষেত্রের বার্তা নিয়ে চিন্তা করতে থাকাও মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখতে পারে। শরীর বিছানায় থাকলেও মন তখন বিশ্রামের অবস্থায় পৌঁছাতে পারে না।
অনেকেই ফোনের ‘নাইট মোড’ বা ‘ব্লু লাইট ফিল্টার’ চালু করে মনে করেন, এখন আর ঘুমের ক্ষতি হবে না। এসব সুবিধা চোখে পৌঁছানো কিছু আলো কমাতে পারে। কিন্তু এগুলো ফোন ব্যবহারের সময়কাল, মানসিক উত্তেজনা কিংবা ঘুমানোর সময় পিছিয়ে যাওয়ার সমস্যা দূর করে না।
অর্থাৎ পর্দার রং বদলালেই ঘুমের সমস্যা সমাধান হয়ে যায় না। কখন ফোন বন্ধ করা হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ঘুম কমলে পরদিন শরীরে কী ঘটে?
ঘুম শুধু ক্লান্তি দূর করার প্রক্রিয়া নয়। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক স্মৃতি সংরক্ষণ, শেখা বিষয়গুলো সুসংহত করা, মনোযোগের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম বজায় রাখা এবং শরীরের বিভিন্ন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সাধারণত রাতে অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। অনেকের ক্ষেত্রে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম উপযুক্ত হতে পারে। শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের প্রয়োজন আরও বেশি। বয়সভেদে তাদের ঘুমের চাহিদা আলাদা।
কেউ নিয়মিত রাত দুইটায় ঘুমিয়ে সকাল ছয়টায় উঠে পড়লে তার ঘুমের সময় দাঁড়ায় মাত্র চার ঘণ্টা। এভাবে কয়েক দিন চলার পর শরীরে ক্লান্তি জমতে পারে। সকালে ঘুম থেকে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে। দিনের বেলায় ঝিমুনি আসে, কাজে ভুল বাড়ে এবং মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়।
ঘুমের ঘাটতি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, প্রতিক্রিয়ার গতি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালানো, যন্ত্রপাতি ব্যবহার কিংবা মনোযোগ প্রয়োজন এমন কাজে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়তে পারে পড়া মনে রাখা, নতুন বিষয় শেখা এবং পরীক্ষার প্রস্তুতিতে। রাত জেগে পড়াশোনার ফাঁকে ফোন ব্যবহার করতে গিয়ে কেউ যদি পর্যাপ্ত ঘুমাতে না পারেন, তাহলে পড়াশোনার জন্য ব্যয় করা অতিরিক্ত সময়ের সুফলও কমে যেতে পারে।
ঘুমের দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতির সঙ্গে স্থূলতা, বিপাকীয় সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্স্বাস্থ্যের বিভিন্ন ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে কোনো ব্যক্তির এসব রোগ হওয়ার কারণ শুধু স্মার্টফোন ব্যবহার, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, মানসিক চাপ, আগে থেকে থাকা রোগ এবং অন্যান্য জীবনযাপনগত বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
শিশু-কিশোরদের ঘুমের ওপর প্রভাব কতটা?
সমস্যাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিশু-কিশোরদের স্মার্টফোন ব্যবহার। অনেক শিশু এখন ঘুমাতে যাওয়ার আগে কার্টুন দেখে, অনলাইন গেম খেলে কিংবা ভিডিও দেখে সময় কাটায়। কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অন্যদের জীবনযাপনের সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা করার প্রবণতা।
কেউ হয়তো একটি ভিডিও দেখতে দেখতে সময় পার করে দেয়। কেউ আবার বন্ধুদের বার্তার উত্তর দিতে গিয়ে ফোন নামাতে পারে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন পোস্ট বা প্রতিক্রিয়া পাওয়ার প্রত্যাশাও অনেককে বারবার ফোন পরীক্ষা করতে উৎসাহিত করে।
শিশুদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও জটিল হতে পারে। কারণ তাদের শরীর ও মস্তিষ্ক তখনো বিকাশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত ঘুম তাদের শেখা, স্মৃতি, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, আচরণ এবং শারীরিক বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে কোনো কোনো শিশুর মধ্যে বিরক্তি, অস্থিরতা, মনোযোগের ঘাটতি কিংবা পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে এসব লক্ষণ দেখলেই ধরে নেওয়া যাবে না যে শিশুটি স্মার্টফোনের কারণে ঘুমের সমস্যায় ভুগছে। অন্যান্য শারীরিক, মানসিক ও পারিবারিক কারণও যাচাই করা প্রয়োজন।
কিশোর বয়সে ঘুমের সময় স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা পিছিয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সকালে স্কুলে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকায় তাদের ঘুমের সময় কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। রাতে ফোন ব্যবহারের অভ্যাস এই সমস্যাকে আরও বাড়াতে পারে।
এখানে অভিভাবকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু শিশুকে ফোন ব্যবহার করতে নিষেধ করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। পরিবারের বড়রা নিজেরা যদি রাতভর ফোন ব্যবহার করেন, তাহলে শিশুদের কাছে ভিন্ন প্রত্যাশা তৈরি করা কঠিন।
বরং পরিবারের সবার জন্য একটি নির্দিষ্ট ঘুমের রুটিন, শোয়ার আগে ফোন সরিয়ে রাখা এবং ঘরে ফোনমুক্ত সময় তৈরি করা কার্যকর হতে পারে। শিশু-কিশোরদের সঙ্গে আলোচনা করে নিয়ম তৈরি করলে তা দীর্ঘমেয়াদে অনুসরণ করা সহজ হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফাঁদে হারিয়ে যাচ্ছে ঘুমের সময়?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারীরা প্রায়ই বলেন, ফোন হাতে নেওয়ার সময় তাঁরা ঠিক করেন কয়েক মিনিট থাকবেন। কিন্তু পরে দেখেন, অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে।
এর পেছনে রয়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর নকশা। স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী ভিডিও চালু হওয়া, ব্যক্তির আগ্রহ অনুযায়ী কনটেন্ট সাজানো, অনন্ত স্ক্রলিং এবং ঘন ঘন নোটিফিকেশন ব্যবহারকারীকে আরও বেশি সময় ধরে প্ল্যাটফর্মে রাখতে পারে।
এ ধরনের নকশার কারণে ব্যবহারকারীর পক্ষে নিজের নির্ধারিত সময় মেনে চলা কঠিন হতে পারে। তবে সব ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে প্রভাব এক রকম নয়। কারও ব্যবহার সীমিত থাকে, আবার কারও ক্ষেত্রে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
রাতের বেলায় এ সমস্যার একটি বাড়তি দিক রয়েছে। দিনের বেলায় অফিস, স্কুল কিংবা পারিবারিক দায়িত্ব মানুষকে ফোন থেকে দূরে রাখে। রাতে সেই বাধ্যবাধকতা কমে গেলে ফোন ব্যবহারের সময় বাড়তে পারে।
কেউ যদি প্রতিদিন ঘুমানোর আগে এক ঘণ্টা ফোন ব্যবহার করেন এবং সেই সময়টুকু তাঁর ঘুম থেকে কেটে যায়, তাহলে সপ্তাহ শেষে ঘুমের উল্লেখযোগ্য ঘাটতি তৈরি হতে পারে। আবার কেউ ফোন ব্যবহার করলেও যদি সময়মতো ঘুমাতে পারেন এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করেন, তাঁর ক্ষেত্রে একই মাত্রার সমস্যা নাও হতে পারে।
এ কারণে শুধু দৈনিক স্ক্রিন টাইম দেখেই ঘুমের ঝুঁকি নির্ধারণ করা যায় না। কখন ফোন ব্যবহার করা হচ্ছে, কী ধরনের কনটেন্ট দেখা হচ্ছে এবং ব্যবহারটি ঘুমের সময়কে প্রভাবিত করছে কি না, তা বিবেচনায় নিতে হবে।
বিছানায় ফোন, সকালে ক্লান্তি
রাত জেগে ফোন ব্যবহারের প্রভাব শুধু ঘুমের সময় কমে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কারও কারও ক্ষেত্রে ঘুমানোর সময় নির্ধারিত থাকলেও বিছানায় ফোন ব্যবহারের কারণে ঘুম আসতে দেরি হয়। আবার মাঝরাতে নোটিফিকেশন বা কলের কারণে ঘুম ভেঙে যেতে পারে।
ঘুমের আগে সংবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তর্ক কিংবা উদ্বেগ তৈরি করে এমন বিষয় দেখার পর মন শান্ত হতে সময় লাগতে পারে। ফলে বিছানায় শুয়ে থেকেও ঘুমের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয় না।
সকালে উঠে অনেকে ক্লান্তি কাটাতে আবারও ফোন হাতে নেন। ঘুম থেকে ওঠার পরপরই সংবাদ, বার্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরীক্ষা করা দিনের শুরুতেই মনোযোগকে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে দিতে পারে। অবশ্য সকালে ফোন ব্যবহার করলেই মনোযোগের সমস্যা হবে, এমন নয়। তবে প্রয়োজনীয় বিশ্রাম না হলে মনোযোগের ঘাটতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
এই চক্র ভাঙতে হলে রাতের ফোন ব্যবহারের পাশাপাশি সকালে ওঠার অভ্যাস, দিনের আলোতে সময় কাটানো, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমানো ও জেগে ওঠার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
ঘুমের সমস্যা মানেই কি ফোনের দোষ?
এ প্রশ্নের উত্তর এককথায় দেওয়া যায় না।
রাতে স্মার্টফোন ব্যবহার ঘুমের সময় কমিয়ে দিতে পারে, কিন্তু ঘুমের সমস্যা তৈরি হওয়ার পেছনে আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। উদ্বেগ, বিষণ্নতা, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, কিছু ওষুধের প্রভাব, অতিরিক্ত চা-কফি পান, অনিয়মিত কর্মঘণ্টা কিংবা ঘুমের সময় শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা তৈরি হওয়া এমন কিছু কারণ।
কেউ যদি ফোন ব্যবহার কমিয়েও ঘুমাতে না পারেন, দীর্ঘ সময় জেগে থাকেন কিংবা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব অনুভব করেন, তাহলে সমস্যাটিকে শুধু মোবাইল ব্যবহারের ফল হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
ঘুমের সমস্যা নিয়মিত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ঘুমের ব্যাঘাত, দিনের কাজকর্মে উল্লেখযোগ্য সমস্যা, জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার লক্ষণ কিংবা অস্বাভাবিক দিনের ঘুম ঘুম ভাব থাকলে মূল্যায়ন জরুরি।
এ ছাড়া ফোন ব্যবহারের অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে কেউ যদি বারবার ব্যর্থ হন এবং তা পড়াশোনা, কাজ, সম্পর্ক কিংবা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে, তাহলে অভ্যাসটির পেছনে থাকা মানসিক ও আচরণগত কারণগুলোও বিবেচনা করা দরকার।
ঘুম ফেরাতে কী করতে পারেন?
স্মার্টফোন পুরোপুরি বাদ দেওয়া অধিকাংশ মানুষের জন্য বাস্তবসম্মত নয়। যোগাযোগ, পড়াশোনা, কাজ ও তথ্য পাওয়ার জন্য ফোন প্রয়োজন। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত ফোনের ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণ করা, বিশেষ করে ঘুমের সময়টুকু রক্ষা করা।
প্রথমত, ঘুমানোর নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন। প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে বিছানায় যাওয়া ও সকালে ওঠার অভ্যাস তৈরি করুন। ছুটির দিনেও সময়ের বড় ধরনের পরিবর্তন এড়িয়ে চলুন।
দ্বিতীয়ত, শোয়ার আগে ফোন ব্যবহারের বিরতি তৈরি করুন। ঘুমানোর অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে ফোন সরিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারেন। এই সময়টায় বই পড়া, হালকা বিশ্রাম, পরিবারের সঙ্গে কথা বলা কিংবা পরদিনের প্রস্তুতি নেওয়া যেতে পারে। যাঁদের ঘুমের সমস্যা বেশি, তাঁদের আরও আগে থেকে ফোন বন্ধ রাখা উপকারী হতে পারে।
তৃতীয়ত, ফোন বিছানা থেকে দূরে রাখুন। বালিশের পাশে ফোন রাখলে বারবার হাতে নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। প্রয়োজন হলে ফোনটি ঘরের অন্য পাশে রাখুন এবং অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করুন। অ্যালার্মের জন্য আলাদা ঘড়ি ব্যবহারও সহায়ক হতে পারে।
চতুর্থত, শিশু-কিশোরদের জন্য পারিবারিক নিয়ম তৈরি করুন। শোয়ার আগে ফোন ব্যবহার বন্ধ রাখা, রাতে শোবার ঘরে ফোন না নেওয়া এবং পরিবারের সবার একই নিয়ম মেনে চলা ভালো অভ্যাস তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।
পঞ্চমত, দিনের আলো ও শারীরিক পরিশ্রমের সুযোগ বাড়ান। দিনের বেলায় বাইরে সময় কাটানো এবং নিয়মিত শরীরচর্চা ঘুম-জাগরণের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে তীব্র ব্যায়াম কিছু মানুষের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
ষষ্ঠত, চা-কফি ও অন্যান্য উদ্দীপক পানীয়ের সময় খেয়াল করুন। বিশেষ করে বিকেল ও সন্ধ্যার পর ক্যাফেইন গ্রহণ কিছু মানুষের ঘুমে সমস্যা তৈরি করতে পারে। ব্যক্তিভেদে এর প্রভাব আলাদা হতে পারে।
সপ্তমত, ঘুমের হিসাব রাখুন। কয়েক দিন লিখে রাখুন কখন ফোন হাতে নিচ্ছেন, কখন সেটি সরিয়ে রাখছেন, কখন ঘুমাচ্ছেন এবং সকালে কেমন বোধ করছেন। এতে ফোন ব্যবহারের সঙ্গে নিজের ঘুমের সম্পর্ক বোঝা সহজ হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফোন ব্যবহার কমানোর সিদ্ধান্তকে শাস্তি হিসেবে না দেখে সুস্থ জীবনযাপনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা। একদিনেই সব অভ্যাস বদলাতে হবে না। ছোট পরিবর্তন দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে নিয়মিত রুটিন তৈরি করা সম্ভব।
ঘুমের অধিকারও কি রক্ষা করা দরকার?
স্মার্টফোন আমাদের জীবনকে সহজ করেছে। দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, দ্রুত তথ্য পাওয়া, নতুন কিছু শেখা কিংবা বিনোদনের সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু কোনো প্রযুক্তিই মানুষের বিশ্রাম ও স্বাস্থ্যের প্রয়োজনের বিকল্প হতে পারে না।
রাত জেগে ফোন ব্যবহারকে অনেক সময় ব্যক্তিগত অভ্যাস হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু যখন শিশু-কিশোরদের ঘুম, শিক্ষার্থীদের মনোযোগ, কর্মজীবী মানুষের কর্মক্ষমতা এবং পরিবারের দৈনন্দিন জীবন এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তখন বিষয়টি আর নিছক ব্যক্তিগত থাকে না। এটি জনস্বাস্থ্যের আলোচনারও অংশ হয়ে ওঠে।
এ ক্ষেত্রে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম এবং স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক উদ্যোগের ভূমিকা রয়েছে। শিশুদের ডিজিটাল ব্যবহারে বয়সোপযোগী সীমা নির্ধারণ, স্বাস্থ্যকর ঘুমের অভ্যাস শেখানো এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।
একই সঙ্গে সমস্যাটি বোঝার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে গবেষণাও প্রয়োজন। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে জরিপ করে জানা যেতে পারে, তাঁরা রাতে কতক্ষণ ফোন ব্যবহার করেন, গড়ে কত ঘণ্টা ঘুমান এবং ঘুমের ঘাটতি তাঁদের পড়াশোনা বা দৈনন্দিন কাজে কী প্রভাব ফেলে। চিকিৎসক ও শিক্ষকদের মতামত যুক্ত হলে সমস্যাটির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।
কারণ, অনুমান দিয়ে জনস্বাস্থ্যের সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। প্রয়োজন তথ্য, গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি আমাদেরই
রাতের শেষ প্রহরে যখন একটি ছোট পর্দা আমাদের মনোযোগ আটকে রাখে, তখন আমরা হয়তো ভাবি, কয়েক মিনিট সময় কাটাচ্ছি। কিন্তু সেই কয়েক মিনিটের সঙ্গে যদি প্রতিদিনের ঘুমের সময়ও কমতে থাকে, তাহলে তার মূল্য দিতে হয় পরদিনের ক্লান্তি, কম মনোযোগ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির মাধ্যমে।
সমস্যাটি স্মার্টফোন নিজে নয়। সমস্যা হলো, প্রযুক্তি ব্যবহারের সময় কখন শেষ করতে হবে, সেই সীমারেখা হারিয়ে ফেলা।
দিনের কাজের শেষে বিশ্রাম নেওয়া মানুষের স্বাভাবিক প্রয়োজন। ঘুমের সময়কে যদি প্রতিদিন বিনোদন, নোটিফিকেশন আর অনন্ত স্ক্রলিংয়ের কাছে সমর্পণ করা হয়, তাহলে শরীর ও মনের ওপর তার প্রভাব পড়তেই পারে।
তাই আজ রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে একটি ছোট পরীক্ষা করা যেতে পারে। ফোনটি বিছানা থেকে দূরে রেখে দিন। নোটিফিকেশন বন্ধ করুন। ঘরের আলো কমিয়ে কিছুক্ষণ শান্ত থাকুন। তারপর লক্ষ করুন, ঘুমের প্রস্তুতি নিতে আপনার কতটা সময় লাগে এবং সকালে উঠে কেমন বোধ করেন।
হয়তো এই ছোট পরিবর্তনই নিজের অভ্যাস সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে সাহায্য করবে।
কারণ, সংযুক্ত থাকার জন্য স্মার্টফোন প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সুস্থ থাকার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত ঘুমও। প্রশ্ন তাই শুধু স্মার্টফোন আমাদের কতটা সময় নিচ্ছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, সেই সময় দিতে গিয়ে আমরা নিজেদের বিশ্রাম, মনোযোগ ও সুস্থতার কতটা মূল্য দিচ্ছি? – ইন্টারনেট অবলম্বনে




