ক্রিস্টেন রজার্স ।।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়লেও আত্মহত্যার বিষয়টি এখনো অনেক ক্ষেত্রে সামাজিকভাবে কলঙ্কিত। ফলে মানুষ নানা উপায়ে বিষয়টি আড়াল করে রাখে। অনেকে আত্মহত্যার চিন্তার কথা কাউকে জানান না। আবার কেউ আত্মহত্যা করলে পরিবারের সদস্যরাও অনেক সময় শোকসংবাদ বা মৃত্যুসংবাদে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উল্লেখ করেন না। এমনকি কাছের মানুষকে সাহায্য করতে চাইলেও কীভাবে এগিয়ে যেতে হবে, তা অনেকেরই জানা থাকে না।
আমেরিকান ফাউন্ডেশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশনের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ড. ক্রিস্টিন মুতিয়ে বলেন, “মানুষ প্রায়ই উদ্বিগ্ন ব্যক্তিটির দিকে এগিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে পরিস্থিতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার কোনো না কোনো কারণ খুঁজে নেয়। এর পেছনে বেশ কিছু সাধারণ কারণ রয়েছে।”
এর মধ্যে কিছু কারণ সরাসরি আত্মহত্যা নিয়ে সামাজিক নেতিবাচক ধারণার সঙ্গে যুক্ত। যেমন, আত্মহত্যার চিন্তাকে স্বার্থপরতা হিসেবে দেখা। আবার কিছু ধারণা আসে ভালো উদ্দেশ্য থেকেই, কিন্তু সেগুলো ভুল। অনেকেই মনে করেন, কারও সঙ্গে আত্মহত্যা নিয়ে কথা বললে হয়তো তার ঝুঁকি আরও বেড়ে যাবে। কেউ কেউ আবার আত্মহত্যার চিন্তা, পরিকল্পনা, চেষ্টা এবং মৃত্যুসহ পুরো বিষয়টি সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা না থাকার কারণে কী করবেন বুঝতে পারেন না।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আত্মহত্যার হার মোটের ওপর ধারাবাহিকভাবে বেড়েছিল। এরপর তা ওঠানামা করলেও সামান্য কমেছে বলে দেশটির রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের তথ্য জানিয়েছে। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪৮ হাজার ৯০০ মানুষ আত্মহত্যায় মারা যান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে ৭ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যায় মারা যান। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণও আত্মহত্যা।
২০২৪ সালে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই আনুমানিক ১ কোটি ৪৩ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ গুরুতরভাবে আত্মহত্যার কথা ভেবেছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৪৬ লাখ মানুষ আত্মহত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন এবং ২২ লাখ মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। মুতিয়ের মতে, এই পরিসংখ্যানগুলো দেখায়, সংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে হস্তক্ষেপ করার অনেক সুযোগ রয়েছে।
তবে আত্মহত্যায় কারও মৃত্যু হলে কাছের মানুষদের মধ্যে প্রায়ই একটি কঠিন দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। তারা ভাবতে থাকেন, কীভাবে আরও ভালোভাবে পাশে দাঁড়ানো যেত বা কী করলে প্রিয় মানুষটিকে বাঁচানো সম্ভব হতো। এ থেকে শোকের পাশাপাশি অপরাধবোধও তৈরি হতে পারে।
মুতিয়ে বিষয়টিকে একটু ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, আত্মহত্যার চিন্তায় থাকা মানুষের মনে একই সঙ্গে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা এবং মৃত্যুর চিন্তা থাকতে পারে। অর্থাৎ তারা সবসময় নিজের জীবন শেষ করার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন না। গবেষণাতেও এর প্রমাণ রয়েছে।
এমন অনেক ঘটনার কথাও জানা যায়, যেখানে কেউ আত্মহত্যার একেবারে কাছাকাছি গিয়ে শেষ মুহূর্তে মত বদলেছেন। হয়তো কেউ তার দিকে তাকিয়ে হাসলেন, কথা বললেন বা কোনোভাবে সংযোগ তৈরি করলেন। তখন তার মনে হতে পারে, আজ নয়, আরেক দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করি।
অর্থাৎ একজন মানুষ সচেতনভাবে তা প্রকাশ না করলেও তার ভেতরের কোনো অংশ হয়তো আশা, সম্পর্ক বা কারও কাছ থেকে পাওয়া একটি ইতিবাচক সংকেত খুঁজছে। তাই আত্মহত্যার চিন্তায় থাকা প্রত্যেক মানুষ যে নিজের জীবন শেষ করার সিদ্ধান্তে সম্পূর্ণ অনড়, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
তবে আত্মহত্যার পেছনে একটিমাত্র কারণ কাজ করে না। ফলে কাছের মানুষ হিসেবে আপনি যতটা সম্ভব সাহায্য করার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত কী ঘটবে, তা পুরোপুরি আপনার নিয়ন্ত্রণে নয়।
মুতিয়ে বলেন, “অন্য একজন মানুষের জীবনের জন্য আপনি পুরোপুরি দায়ী নন। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও বিশ্বাস করা যায় যে আমরা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। আমরা একে অন্যের দিকে তাকাই এবং আমাদের চারপাশের সামাজিক ও পারস্পরিক সম্পর্কের পরিবেশ একে অন্যকে প্রভাবিত করে। এসব বিষয় মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এবং কিছু ক্ষেত্রে আত্মহত্যার ঝুঁকি কমানো বা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।”
এ কারণেই আত্মহত্যা সম্পর্কে আরও জানা এবং প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো দূর করা জরুরি।
আত্মহত্যা নিয়ে ভুল ধারণা দূর করা
আত্মহত্যা নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো, এ বিষয়ে আলোচনা করলে নাকি একজন মানুষের আত্মহত্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
গবেষণায় এই ধারণার সমর্থন পাওয়া যায়নি। বরং একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, আত্মহত্যা নিয়ে সরাসরি কথা বলা ঝুঁকি বাড়ায় না। কিছু ক্ষেত্রে এটি আত্মহত্যার চিন্তা ও আচরণ কমাতেও সহায়তা করতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এমন আলোচনা একজন মানুষকে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার সুযোগ দিতে পারে এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসা বা অন্য ধরনের সাহায্য নেওয়ার দিকে এগিয়ে দিতে পারে।
কাছের কারও সঙ্গে কীভাবে কথা বলবেন, তা নিয়ে ভুল করার ভয় থাকতেই পারে। কিন্তু কথোপকথনে কোনো ভুল হয়ে গেলেও সেটিই শেষ কথা নয়। আপনার উদ্বেগ ও ভালো উদ্দেশ্য যদি স্পষ্ট থাকে, তাহলে সেই মানুষটি হয়তো আপনাকে আবার কথা বলার সুযোগ দেবেন।
কেউ খুব ঘনিষ্ঠ না হলেও তার আচরণ নিয়ে উদ্বেগ থাকলে প্রশ্ন করতে দ্বিধা করা উচিত নয়। সামাজিক শিষ্টাচার বা কেউ বিরক্ত হতে পারেন কি না, তার চেয়ে মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ড. উরসুলা ক্লিশ বলেন, কারও পরিবার বা অনেক বন্ধু আছে বলেই ধরে নেওয়া উচিত নয় যে তার নিয়মিত খোঁজ নেওয়ার মতো কেউ নিশ্চয়ই আছে। এমন ধারণা থেকে অনেক সময় ‘বাইস্ট্যান্ডার ইফেক্ট’ তৈরি হয়। অর্থাৎ সবাই মনে করেন, অন্য কেউ নিশ্চয়ই এগিয়ে আসবে। শেষ পর্যন্ত কেউই এগিয়ে আসে না।
কখন বুঝবেন কেউ সংকটে আছেন
কেউ আত্মহত্যার ঝুঁকিতে আছেন কি না, তা সবসময় বোঝা সহজ নয়। এমনকি বিশেষজ্ঞরাও সব ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন না কে ঝুঁকিতে আছেন, কখন তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করতে পারেন বা আদৌ করবেন কি না।
মানুষ চাপ ও সংকটের সঙ্গে ভিন্নভাবে মোকাবিলা করে। আবার আত্মহত্যার চিন্তা করার পর দীর্ঘ সময় ধরে কেউ লক্ষণ দেখাবেন, এমনও নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং তা করার মধ্যে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধান থাকতে পারে।
আবার কেউ দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পনা করলে তার আচরণ বা আবেগে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। কিছু সতর্কসংকেত হলো:
আচরণগত পরিবর্তন
- মাদক বা নেশাজাতীয় দ্রব্যের অপব্যবহার
- অস্বাভাবিক ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ, যেমন বেপরোয়া গাড়ি চালানো বা অতিরিক্ত মদ্যপান
- মৃত্যু বা আত্মহত্যার উপায় নিয়ে অতিরিক্ত আগ্রহ
- জীবননাশের সম্ভাবনা রয়েছে এমন উপকরণ সহজে হাতে থাকা
- প্রিয় কাজ, পড়াশোনা বা অন্যান্য কার্যক্রমে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা
- আত্মহত্যার প্রস্তুতি নেওয়া বা সংশ্লিষ্ট উপকরণ নিয়ে অস্বাভাবিক আচরণ
- নিজের গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র অন্যদের দিয়ে দেওয়া
মানসিক ও আবেগগত পরিবর্তন
- আগে আত্মহত্যার চিন্তা, পরিকল্পনা বা চেষ্টা করার ইতিহাস
- মানসিক স্বাস্থ্য বা ব্যক্তিত্বজনিত সমস্যা, বিশেষ করে চিকিৎসা না নেওয়া হলে
- নির্যাতন, অবহেলা, গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা, চাকরি বা আর্থিক ক্ষতি, সম্পর্কের সমস্যা, বিচ্ছেদ কিংবা অন্য কোনো বড় ধরনের মানসিক আঘাত
- ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম হতাশা
- মেজাজে অস্বাভাবিক ওঠানামা, যার মধ্যে হঠাৎ রাগ বা অস্বাভাবিকভাবে শান্ত ও উৎফুল্ল হয়ে যাওয়াও থাকতে পারে
- সামাজিক যোগাযোগ ও সহায়তার অভাব
- মনে হওয়া যে বেঁচে থাকার কোনো কারণ নেই
কথাবার্তায় যে লক্ষণগুলো দেখা যেতে পারে
- নিজেকে অন্যদের কাছে বোঝা মনে হওয়ার কথা বলা
- মনে হওয়া যে তিনি কোথাও মানিয়ে নিতে পারছেন না বা কারও কাছে তার প্রয়োজন নেই
- আত্মহত্যা বা মৃত্যুর কথা সরাসরি বলা
- মজা করেও আত্মহত্যা বা নিজের জীবন শেষ করার কথা বলা
কেউ এমন কথা বললেও বিষয়টিকে নিছক রসিকতা হিসেবে উড়িয়ে না দিয়ে তার খোঁজ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
কঠিন কথোপকথন কীভাবে শুরু করবেন
কারও আচরণে এমন লক্ষণ দেখলে প্রথমে তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলার জন্য সময় বের করুন। সামনাসামনি বা ফোনে কথা বলা যেতে পারে।
শুরুতেই জটিল কোনো প্রশ্ন করার প্রয়োজন নেই। সহজভাবে জিজ্ঞেস করতে পারেন, “সত্যি করে বলো তো, তুমি কেমন আছ?”
সে যদি নিজের সমস্যার কথা না বলে, তবু প্রয়োজন মনে হলে আত্মহত্যার চিন্তা করছে কি না, সরাসরি জিজ্ঞেস করা যেতে পারে।
যেমন বলা যায়, “আমি তোমার জন্য চিন্তা করছি। কিছুদিন ধরে তোমার মন-মেজাজে পরিবর্তন দেখছি। চাকরি হারানোর ঘটনাটাও তোমার জন্য খুব কঠিন ছিল। এসব কারণে কি কখনো তোমার মনে হয়েছে যে তুমি আর বেঁচে থাকতে চাও না?”
‘নিজেকে মেরে ফেলা’ বা এ ধরনের সরাসরি ভাষাও ব্যবহার করা যায়। কঠিন শোনালেও সরাসরি ও পরিষ্কার ভাষা আত্মহত্যা নিয়ে থাকা সামাজিক সংকোচ কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে “তোমার তো আত্মহত্যার চিন্তা হচ্ছে না, তাই তো?” এভাবে প্রশ্ন করা ঠিক নয়। এতে বিচার করার মনোভাব প্রকাশ পেতে পারে এবং মনে হতে পারে আপনি আসলে তার উত্তর শুনতে আগ্রহী নন।
কেউ আত্মহত্যার চিন্তার কথা স্বীকার করলে বা নিজে থেকেই বিষয়টি জানালে আতঙ্কিত হওয়া স্বাভাবিক। তখন কেউ হয়তো তাকে বোঝাতে চাইবেন, তার মৃত্যুতে পরিবার বা অন্যদের কী ক্ষতি হবে। কেউ হয়তো বলবেন, জীবনে তার অনেক কিছু পাওয়ার আছে, অন্য অনেকের অবস্থা আরও খারাপ, কিংবা সবকিছু কোনো না কোনো কারণে ঘটে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের কথা ওই মুহূর্তে অসংবেদনশীল বা বিচারমূলক মনে হতে পারে। এতে ওই ব্যক্তি আরও একা বোধ করতে পারেন এবং সাহায্য বা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ থেকে দূরে সরে যেতে পারেন।
ড. উরসুলা ক্লিশ বলেন, “বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে তুলুন এবং স্বাভাবিকভাবেই প্রতিক্রিয়া জানান। এতে মানুষটি নিজেকে স্বাভাবিক ও একজন মানুষ হিসেবে অনুভব করতে পারেন।”
এ সময় নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে বেশি শোনা এবং কম কথা বলাই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ড. মাইকেল রোস্কে।
কেউ যখন আত্মহত্যার চিন্তার মতো অত্যন্ত ব্যক্তিগত বিষয় আপনার সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছেন, তখন মনে রাখতে হবে তিনি আপনাকে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় জানানোর জন্য বিশ্বাস করেছেন। আত্মহত্যার চিন্তা থাকলেই যে তিনি সেই মুহূর্তে তা করার অবস্থায় আছেন, এমন নয়।
তাই বলা যেতে পারে, “আমাকে বিশ্বাস করে কথাটা বলার জন্য ধন্যবাদ। তুমি যখন এমন অনুভব করো, তখন কেমন লাগে এবং কখন এসব চিন্তা আসে, সে সম্পর্কে আরও জানতে চাই।”
তার অনুভূতির কারণকে স্বীকার করুন, তবে আত্মহত্যাকে কোনো সমাধান হিসেবে সমর্থন করবেন না। যেমন বলতে পারেন, “তুমি যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছ, তার জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত। বিষয়টি যে খুব কঠিন, সেটা বুঝতে পারছি।”
জিজ্ঞেস করতে পারেন, এমন চিন্তা এলে তিনি কী করেন বা কোন বিষয়গুলো তাকে সামলে থাকতে সাহায্য করে। আত্মহত্যার কোনো পরিকল্পনা আছে কি না, সেটিও জানা গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পনা থাকলে দ্রুত পেশাদার সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।
তার জীবনে এসব কঠিন সময়ের প্রভাব অন্য ক্ষেত্রেও পড়ছে কি না, তা জানতে পারেন। তিনি হয়তো মানুষের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন, কাজ ঠিকমতো করতে পারছেন না বা দৈনন্দিন জীবন সামলাতে সমস্যায় পড়ছেন।
এই কথোপকথন থেকে পাওয়া তথ্য ভবিষ্যতে কীভাবে তার পাশে দাঁড়াবেন, তা বুঝতে সাহায্য করতে পারে। এমনকি আপনি সরাসরি কোনো সমাধান দিতে না পারলেও, নিজের কথা বলার সুযোগ পাওয়া এবং কারও সঙ্গে সংযোগ অনুভব করাটাই তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তাকে জানাতে পারেন, তার জীবন আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ এবং এই কঠিন সময় একসঙ্গে পার হওয়ার চেষ্টা করা যায়। তিনি যা বলেছেন, তাতে তার প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়নি, সেটিও আশ্বস্ত করতে পারে।
প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ খুঁজে বের করা, চিকিৎসার তথ্য সংগ্রহ করা বা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার সময় পাশে থাকার প্রস্তাব দিতে পারেন। প্রথমবার সরাসরি কোনো বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে ভয় বা অস্বস্তি থাকলে সম্ভব হলে সঙ্গে যাওয়ার কথাও বলতে পারেন।
নিয়মিত খোঁজ রাখা জরুরি
প্রথম কথোপকথনের পর কতটা এবং কত ঘন ঘন যোগাযোগ রাখা উচিত, তা অনেকের কাছেই কঠিন মনে হতে পারে। ব্যস্ততার কারণে যোগাযোগ কমে যেতে পারে, আবার কেউ হয়তো মনে করতে পারেন অতিরিক্ত খোঁজ নিলে ব্যক্তিগত সীমারেখা লঙ্ঘন হবে।
কেউ যদি বলেন তার আত্মহত্যার কোনো পরিকল্পনা নেই এবং পরে আর বিষয়টি না তোলেন, তাতেই ধরে নেওয়া ঠিক নয় যে তিনি ভালো হয়ে গেছেন। আত্মহত্যার চিন্তা পরবর্তী সময়ে পরিকল্পনা বা চেষ্টায় রূপ নিতে পারে। তাই নিয়মিত খোঁজ রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রয়োজনে কয়েক দিন পরপর যোগাযোগ করা যেতে পারে। ফোন, বার্তা কিংবা সরাসরি দেখা করা, যেকোনো উপায়েই যোগাযোগ রাখা সম্ভব। তবে প্রতিবার কথোপকথনকে শুধু তার মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সীমাবদ্ধ রাখার প্রয়োজন নেই। তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ, তার জীবনে মানসিক সংকটের বাইরেও অনেক বিষয় রয়েছে।
তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করতেও পারেন, “তোমাকে কীভাবে পাশে পেলে তোমার ভালো লাগবে?”
কেউ বারবার পেশাদার সাহায্য নিতে না চাইলে তাকে জোর করে চিকিৎসার দিকে ঠেলে দেওয়াই যে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হবে, এমন নয়। ধৈর্য ধরে যোগাযোগ রাখা এবং সাহায্য নেওয়ার সুযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কখন দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন
আত্মহত্যার চিন্তা যখন শুধু অস্পষ্ট বা নিষ্ক্রিয় ইচ্ছার পর্যায় থেকে সক্রিয় পরিকল্পনা বা প্রস্তুতির দিকে যেতে শুরু করে, তখন পেশাদার সহায়তার প্রয়োজন আরও জরুরি হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ওই ব্যক্তির আগে আত্মহত্যার চেষ্টা করার ইতিহাস থাকলে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
পরিবর্তনটি এমন হতে পারে যে, আগে তিনি শুধু বলতেন সকালে ঘুম থেকে না উঠলেই ভালো হতো। পরে তিনি বলতে শুরু করলেন, নিজেকে নিরাপদ রাখতে পারবেন কি না তা নিয়ে নিশ্চিত নন। কিংবা আত্মহত্যার কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি বা পরিকল্পনার কথা বলতে শুরু করলেন।
হঠাৎ করে মন-মেজাজ ভালো হয়ে যাওয়াও কখনো সতর্কসংকেত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেউ নিজের জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সাময়িকভাবে স্বস্তি অনুভব করতে পারেন।
যদি কারও আত্মহত্যার ঝুঁকি খুব বেশি বলে মনে হয়, তাহলে প্রতিদিন বা এক দিন পরপর তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা যেতে পারে। তিনি যদি স্পষ্টভাবে কোনো পরিকল্পনার কথা জানান, নিজেকে নিরাপদ রাখবেন কি না সে বিষয়ে সন্দেহ থাকে, অথবা পরিস্থিতি আপনার একার পক্ষে সামলানো কঠিন হয়ে যায়, তখন পেশাদার জরুরি সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের পরিস্থিতিতে ৯৮৮ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়। প্রশিক্ষিত কাউন্সেলররা পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে পরামর্শ দিতে পারেন এবং স্থানীয় সহায়তার ব্যবস্থা খুঁজে পেতে সাহায্য করতে পারেন।
কখনো কখনো সংকটে থাকা একজন মানুষ কেবল একজনের কাছেই নিজের কথা গোপনে বলে থাকেন। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হলে তার ইচ্ছার বাইরে হলেও অন্য বিশ্বস্ত মানুষদের যুক্ত করা প্রয়োজন হতে পারে। প্রথমে তাকে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে, পরিবারের সদস্য বা কাছের অন্য কাউকে বিষয়টি জানানো হলে তিনি স্বস্তি বোধ করবেন কি না। তিনি রাজি না হলেও পরিস্থিতি গুরুতর হলে নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যক্তিদের জানানো যেতে পারে।
নোট: আর যদি মনে হয় আপনি বিষয়টি ম্যানেজ করতে অপারগ তাহলে পরিবারকে বা উপযুক্ত জায়গায় বিষয়টি জানানো উচিত অথবা যদি এমন হয় কেউ তাৎক্ষণিকভাবে আত্মহত্যার চেষ্টা করতে যাচ্ছেন বা ইতোমধ্যে নিজেকে আঘাত করছেন, তাহলে জরুরি সেবায় দ্রুত যোগাযোগ করা উচিত। বাংলাদেশে এ ক্ষেত্রে ৯৯৯-এ কল করা যায়।
-সিএনএন থেকে বাংলায় রুপান্তরিত




