বিদ্যালয়ের মাঠ শিশুদের কাছে শুধু খেলাধুলার জায়গা নয়। একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, সহপাঠীদের সঙ্গে মেলামেশা এবং বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই মাঠ। সেই মাঠ যখন নির্মাণসামগ্রী পরিবহনের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন বিষয়টি কেবল একটি বিদ্যালয়ের মাঠ নষ্ট হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশ্ন ওঠে, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শিক্ষা পরিবেশের প্রতি আমাদের প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা আসলে কতটা কার্যকর।
জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার মোহাম্মদপুর বালুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ ব্যবহারের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। স্থানীয় সড়ক মেরামতের কাজে ব্যবহৃত বালু ও খোয়া পরিবহনের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যানবাহন বিদ্যালয়ের মাঠ দিয়ে চলাচল করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে মাঠের স্বাভাবিক ব্যবহার ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ধুলাবালি, শব্দ ও যানবাহন চলাচলের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও খেলাধুলায় বিঘ্ন ঘটছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন, মাঠ ব্যবহার না করার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার নিষেধ করা হয়েছে। বিষয়টি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকেও মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। তারপরও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। অর্থাৎ সমস্যাটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরের বাইরে ছিল এমনটি বলার সুযোগ কম। বরং অভিযোগ পাওয়ার পর কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি ব্যস্ততার কথা বলে কোনো মন্তব্য করেননি। অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিনিধিকে সরেজমিনে পাঠানো হবে এবং প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া ইতিবাচক। তবে এমন একটি বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে দীর্ঘসূত্রতা কাম্য নয়। কারণ এখানে প্রশ্নটি শুধু একটি মাঠের ব্যবহার নিয়ে নয়, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়েও।
উন্নয়নকাজ অবশ্যই প্রয়োজন। রাস্তা নির্মাণ বা সংস্কারের জন্য বালু, খোয়া ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী পরিবহনও করতে হবে। কিন্তু উন্নয়নকাজের সুবিধার জন্য একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠকে অনানুষ্ঠানিক পরিবহনপথে পরিণত করা কোনোভাবেই স্বাভাবিক ব্যবস্থা হতে পারে না। ঠিকাদারি কাজের সুবিধা এবং শিশুদের নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
এখানে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। বিদ্যালয়ের মাঠ দিয়ে যানবাহন চলাচলের অনুমতি যদি কেউ দিয়ে থাকে, তাহলে সেই অনুমতির ভিত্তি কী? বিকল্প কোনো পথ ছিল না কি? মাঠ ব্যবহারের ফলে বিদ্যালয়ের সম্পদ বা পরিবেশের ক্ষতি হলে তার দায় কে নেবে? আর শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া জরুরি।
আমরা মনে করি, তদন্তের নামে বিষয়টি দীর্ঘায়িত না করে দ্রুত সরেজমিনে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা উচিত। বিদ্যালয়ের মাঠ ব্যবহারের অনুমতি থাকলে তার বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তা যাচাই করা দরকার। অনুমতি না থাকলে অবিলম্বে মাঠ দিয়ে নির্মাণসামগ্রী পরিবহন বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি মাঠের কোনো ক্ষতি হয়ে থাকলে তা সংস্কারের দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট পক্ষকে নিতে হবে।

