ফয়সাল মাহমুদ ।। গত দুই বছর ধরে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে নরম কূটনীতির পথ বেছে নিয়েছে বাংলাদেশ। উপহার হিসেবে পাঠানো হয়েছে সুস্বাদু হাড়িভাঙা আম, ইলিশ মাছ, জামদানি কাপড় ও টাঙ্গাইলের শাড়ি। উদ্দেশ্য ছিল, নয়াদিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক যেন স্থায়ী বৈরিতায় রূপ না নেয়। এসব উদ্যোগে যোগাযোগের পথ খোলা রাখা গেছে, কূটনৈতিক আলোচনা চালু থেকেছে এবং সাময়িক বিরোধকে চূড়ান্ত শত্রুতায় পরিণত হওয়া থেকে কিছুটা হলেও ঠেকানো গেছে।
কিন্তু পরিস্থিতি এখন যে বাস্তবতা সামনে এনেছে, তা হলো, কূটনীতিতে সদিচ্ছা ও সাংস্কৃতিক বন্ধন গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেগুলো দিয়ে বড় রাজনৈতিক বিরোধের সমাধান হয় না। দুই দেশের সম্পর্ক যখন মৌলিক স্বার্থের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তখন একপর্যায়ে আম, শাড়ি কিংবা ইলিশের মতো উপহারের কার্যকারিতাও সীমিত হয়ে আসে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থান শুরু হয় এবং ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন ঘটে। এরপর থেকেই ভারতের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়ে সম্পর্ক সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক আয়োজন, বস্ত্র প্রদর্শনী, ইলিশ উৎসব ও বাণিজ্যিক সৌজন্য বিনিময়ের পাশাপাশি নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। দুই দেশের সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন চললেও আলোচনা চালু রাখার এই উদ্যোগ একেবারে নিষ্ফল ছিল না। তবে এর মাধ্যমে যে রাজনৈতিক সংকটের সমাধান সম্ভব নয়, তা ক্রমেই স্পষ্ট হয়েছে।
এক ঝুড়ি আম সাময়িক উষ্ণতা তৈরি করতে পারে। শাড়ির প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীদের ভিড় জমতে পারে। কলকাতার মানুষের কাছে ইলিশের চালান আবেগ ও নস্টালজিয়া জাগাতে পারে। কিন্তু এসব উদ্যোগ শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে না, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন বিরোধ মেটাতে পারে না, ভেঙে পড়া রাজনৈতিক আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে না। একইভাবে, ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত দুই প্রতিবেশী দেশের নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগেরও সমাধান করতে পারে না।
কূটনৈতিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা আর সম্পর্কের গভীরে জমে থাকা সংকটের সমাধান করা এক বিষয় নয়। বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান সম্পর্কের সূক্ষ্ম ভারসাম্য নির্ধারণ করছে এই পার্থক্যই।
২০২৫ সালেই নরম কূটনীতির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওই বছরের জুলাইয়ে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য এক হাজার কেজি উন্নত মানের হাড়িভাঙা আম পাঠায়। নয়াদিল্লির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের জন্যও পাঠানো হয় আম।
শেখ হাসিনার পতন এবং ভারতে তাঁর আশ্রয় নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কে যে তিক্ততা তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যেও স্বাভাবিক যোগাযোগ বজায় রাখার বার্তা হিসেবে এই উপহারকে দেখা হয়। নির্ধারিত সময়েই আম পৌঁছেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সংকটের জায়গায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি।
শেখ হাসিনা তখনো ভারতে অবস্থান করছিলেন। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রত্যর্পণের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছিল ঢাকা। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, ট্রানজিট সুবিধা এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের সঙ্গে আচরণ নিয়েও দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ অব্যাহত ছিল।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উষ্ণতা বোঝার অন্যতম সূচক ভিসা কার্যক্রমও দীর্ঘ সময় স্থগিত থাকার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর পুনরায় শুরু হয়। তবে ভিসা দেওয়ার সংখ্যা এখনো ২০২৪ সালের আগের পর্যায়ে ফেরেনি।
অভিন্ন নদীর পানির হিস্যা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোরও সমাধান হয়নি। ফলে সাংস্কৃতিক সৌজন্য ও উপহারের কূটনীতি মূল সমস্যার সমাধানের বদলে বড়জোর সম্পর্কের তিক্ততা কমানোর উপকরণ হয়ে থেকেছে।
নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ এই নরম কূটনীতির অন্যতম দৃশ্যমান প্রবক্তা ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ হাইকমিশন সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে প্রথমবারের মতো জামদানি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এতে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পকে এমন এক সাংস্কৃতিক পরিসরে তুলে ধরা হয়, যেখানে দুই বাংলার অভিন্ন ইতিহাস ও ঐতিহ্য সহজেই অনুধাবন করা সম্ভব।
এরপর ২০২৬ সালের এপ্রিলে আরও একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। সেখানে টাঙ্গাইল ও পাবনার দক্ষ তাঁতিদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা ৩০০টি তাঁতের শাড়ি প্রদর্শিত হয়। ভারতীয় রাজধানীতে আয়োজনটি ইতিবাচক সাড়া পায়। শিল্পরসিক ও ক্রেতাদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য, নকশা ও কারুশিল্প নিয়ে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে মতবিনিময় হয় এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শাড়ির সবগুলো বিক্রি হয়ে যায়।
সাংস্কৃতিক কূটনীতি হিসেবে উদ্যোগটি সফল ছিল। দুই বাংলার অভিন্ন সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা করা যেখানে সহজ, সেখানে অভিন্ন নদীর পানির হিস্যা নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো অনেক কঠিন। ভারতীয় সমাজের এমন কিছু মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা, যাঁরা বাংলাদেশকে কেবল তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক বিরোধের দৃষ্টিতে দেখেন না, তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হওয়া আর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করতে পারা এক কথা নয়। শাড়ির প্রদর্শনীতে ব্যাপক সাড়া পাওয়া বাংলাদেশের কারুশিল্পের প্রতি ভারতীয়দের আগ্রহ প্রমাণ করে; কিন্তু বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানের প্রতি ভারতের সম্মতি প্রমাণ করে না। দক্ষিণ এশিয়ায় সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতা কখনোই রাজনৈতিক মতৈক্যের নিশ্চয়তা দেয়নি।
যদি তা-ই হতো, তাহলে ইলিশের ভোজে বসেই ঢাকা ও কলকাতার মধ্যকার সব বিরোধের সমাধান হয়ে যেত বহু আগেই। বরং টাঙ্গাইলের শাড়ির প্রদর্শনীও শেষ পর্যন্ত ঐতিহ্যের মালিকানা ও ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই স্বীকৃতি নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও রাজনীতির প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়।
কূটনৈতিক সৌজন্যেরও একটি সীমা আছে। একপর্যায়ে আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক আলোচনাকেই সামনে আসতে হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফর আয়োজনের প্রচেষ্টা এ বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়া কিংবা দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য ভারত তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কিন্তু তারেক রহমানের সফর হয়নি। ঢাকার বক্তব্য ছিল, উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে অংশ নিতে হলে উপযুক্ত পরিবেশ ও পারস্পরিক সম্মান নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে, ভারতীয় কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে বলেছেন, আমন্ত্রণ জানানো হলেও সফর বাস্তবায়িত হয়নি।
এই ভদ্রতাপূর্ণ অচলাবস্থা দুই দেশের সম্পর্কের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরে। একজন সরকারপ্রধানের সফর আয়োজন করতে হলে শুধু আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সুস্পষ্ট আলোচ্যসূচি, সতর্ক রাজনৈতিক প্রস্তুতি এবং এমন কিছু বাস্তব অর্জন, যা দুই দেশের নেতাই নিজ নিজ দেশের জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারবেন।
ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও বিভিন্ন সময়ে শীর্ষ পর্যায়ে সরাসরি সংলাপের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা, অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানে দুই দেশের নেতাদের সরাসরি যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ।
বাস্তবিক অর্থে, দুই দেশের কৌশলগত ভিত্তি যখন কার্যকর থাকে, তখন নরম কূটনীতি সবচেয়ে ভালো কাজ করে। মৌলিক স্বার্থে ঐকমত্য থাকলে সাংস্কৃতিক বন্ধন সম্পর্ককে আরও উষ্ণ ও প্রাণবন্ত করে তোলে। কিন্তু দুই সরকার যখন গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের প্রশ্নে পরস্পরের বিপরীত অবস্থানে থাকে, তখন নরম কূটনীতি সম্পর্কের সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ ঠেকাতে পারলেও সমঝোতার শর্ত নির্ধারণ করতে পারে না।
শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল গভীর নিরাপত্তা সহযোগিতা, জ্বালানি সংযোগ এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে। তাঁর ক্ষমতাচ্যুতি সেই পরিচিত কাঠামোকে ভেঙে দিয়েছে।
বর্তমান বাংলাদেশের নেতৃত্ব এখন সার্বভৌমত্ব, পারস্পরিকতা ও কৌশলগত নমনীয়তার ভিত্তিতে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য চায়। অন্যদিকে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে ভারতেরও নিজস্ব উদ্বেগ রয়েছে।
বাণিজ্য চুক্তি, পানিবণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও গোয়েন্দা সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো দুই দেশের সম্পর্কের গভীরে প্রোথিত। সাংস্কৃতিক দূতদের উদ্যোগ কিংবা নৈশভোজের সৌজন্যে এসব জটিল প্রশ্নের সমাধান সম্ভব নয়।
গত দুই বছরের উদ্যোগগুলোকে তাই পুরোপুরি ব্যর্থ বলা যাবে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদলের অস্থির সময়ে এগুলো দুই দেশের যোগাযোগের পথ খোলা রাখতে সহায়তা করেছে। কিন্তু প্রতীকী সৌজন্যের কার্যকারিতা এখন কমে আসছে। দুই দেশের সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায় আর কেবল আম, শাড়ি কিংবা সাংস্কৃতিক আয়োজনের ওপর নির্ভর করে লেখা যাবে না।
আম কূটনীতি সম্পর্কের দরজা খোলা রাখতে পেরেছে। এবার সেই দরজা দিয়ে বাস্তব রাজনৈতিক সংলাপ ও কার্যকর সমঝোতাকে এগিয়ে আসতে হবে।- আল জাজিরা থেকে বাংলায় রুপান্তরিত



