রিফাত ইব্রাহিম ।। হামাসের হামলায় ইসরায়েল কেঁপে ওঠার এবং এর জেরে চলমান গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরুর তিন বছর পেরিয়ে গেছে। হামাসের ওই হামলায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অপ্রতিরোধ্য শক্তির ভাবমূর্তি ভেঙে পড়ে। এর জবাবে পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়া নিজেদের সামরিক শক্তির প্রায় সবটুকুই প্রয়োগ করেছে ইসরায়েল। পাশাপাশি গাজাকে মৃত্যু ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে নজিরবিহীন অভিযান চালাতে পশ্চিমা মিত্রদেরও পাশে পেয়েছে দেশটি।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী শুধু ফিলিস্তিনি প্রতিরোধযোদ্ধা ও তাদের সামরিক অবস্থানকে লক্ষ্যবস্তু করেনি, বরং নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে বেসামরিক জনগোষ্ঠীকেও শাস্তি দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে। এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। পুরো জনগোষ্ঠীকে অনাহারের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ধ্বংস হয়েছে স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাব্যবস্থা। পানি শোধনাগার, লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্র এবং বিদ্যুৎব্যবস্থাসহ মানুষের জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য অধিকাংশ অবকাঠামো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
কিন্তু সামরিক শক্তির উদ্দেশ্য যদি রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন হয়, তাহলে সাফল্য পরিমাপের মানদণ্ড হতে পারে না কত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে কিংবা কতটা ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, কাঙ্ক্ষিত শর্তে সংঘাতের অবসান ঘটানো সম্ভব হয়েছে কি না।
গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের তিন বছর পরও দেখা যাচ্ছে, সামরিক শক্তিতে বিপুল শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েল তার ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করতে পারেনি।
যুদ্ধের শুরুতেই ইসরায়েল সরকার তাদের লক্ষ্য স্পষ্ট করেছিল। জিম্মিদের মুক্ত করা, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধকে নির্মূল করা, গাজা উপত্যকার নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং সেখানে বিকল্প প্রশাসন গড়ে তোলা ছিল ঘোষিত উদ্দেশ্য। পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের শেষ পর্যন্ত গাজা থেকে বিতাড়িত করার ক্ষেত্র প্রস্তুতের ইঙ্গিতও ছিল তাদের কর্মকাণ্ডে।
তাহলে এ পর্যন্ত কী অর্জন করেছে ইসরায়েল?
প্রথমত, সব জিম্মি মুক্তি পেয়েছেন। তবে গাজায় নিয়ে যাওয়া ২৫০ জনের মধ্যে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সরাসরি অভিযান চালিয়ে মাত্র আটজনকে মুক্ত করতে পেরেছে। আরও ১২ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে। অন্তত তিনজন জিম্মিকে ইসরায়েলি সেনারা নিজেরাই গুলি করে হত্যা করেছে। বোমা হামলায় আরও কতজনের মৃত্যু হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব জানা যায়নি।
জীবিত ও মৃত জিম্মিদের সিংহভাগের মুক্তি বা মরদেহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে হামাসের সঙ্গে দীর্ঘ কূটনৈতিক তৎপরতা ও আলোচনার মাধ্যমে। বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে জিম্মি ইস্যুতে ইসরায়েলের সাবেক প্রধান সমন্বয়কারীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে। তিনি বলেছেন, জিম্মিদের এক বছর আগেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব ছিল এবং তাতে কয়েকজনের প্রাণও বাঁচানো যেত। অর্থাৎ, বিপুল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেও জিম্মি সংকটের সমাধান করতে পারেনি ইসরায়েল।
দ্বিতীয়ত, ব্যাপক সামরিক অভিযান এবং প্রতিরোধ আন্দোলনের বহু নেতাকে হত্যা করার পরও গাজায় ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের উপস্থিতি নির্মূল করা যায়নি। ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ ও ইসরায়েলপন্থী ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলা অব্যাহত থাকলেও গাজার কিছু অংশে হামাসের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এখন প্রতিরোধকে শক্তি প্রয়োগে নির্মূল করার পরিবর্তে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনায় বসতে হচ্ছে ইসরায়েলকে।
তৃতীয়ত, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা দখল করলেও পুরো উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ নিতে বড় ধরনের অভিযান চালায়নি। কারণ, বাকি অঞ্চল দখল করতে গেলে রাজনৈতিক, মানবিক ও সামরিক যে মূল্য দিতে হবে, তা ইসরায়েল বুঝতে পারছে।
চতুর্থত, গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও পুনর্গঠন নিয়ে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ইসরায়েল এবং তার প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েছে। জাতিসংঘকে বাইরে রেখে গাজার জন্য একটি ‘শান্তি পরিষদ’ গঠন এবং বিকল্প প্রশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রচেষ্টাও অনেকাংশে ব্যর্থ হয়েছে। গাজার শাসনভার গ্রহণের জন্য প্রস্তাবিত প্রশাসনিক কমিটি এখনো উপত্যকায় প্রবেশ করতে পারেনি। চুক্তিতে থাকা মানবিক সহায়তা-সংক্রান্ত ব্যবস্থাগুলোরও বাস্তবায়ন হয়নি।
সবশেষে, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের বিতাড়নের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার প্রচেষ্টাও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পায়নি। বারবার বাস্তুচ্যুত করা, অনাহারের মুখে ঠেলে দেওয়া, বাড়িঘর ও অবকাঠামো ধ্বংস করা এবং তথাকথিত ‘স্বেচ্ছায় চলে যাওয়ার’ নানা পরিকল্পনার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভূমি ছাড়তে বাধ্য করার চেষ্টা করেছে ইসরায়েল।
ধ্বংসযজ্ঞে গাজাকে বসবাসের অযোগ্য করে তোলা হয়েছে। কিন্তু তারপরও ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা নিজেদের ভূমি ছেড়ে যেতে চায় না। এমনকি মিসর থেকে গাজায় ফিরে আসা মানুষের ঘটনাও ঘটেছে।
এই পরিস্থিতিতে গাজা নিয়ে ইসরায়েলের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, যুদ্ধের পর কী হবে? ইসরায়েলি বাহিনী গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে পারলেও নিজেদের লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
ইসরায়েলের ধারণা ছিল, গাজাকে নরকতুল্য পরিস্থিতিতে নামিয়ে আনলে সেখানকার মানুষ এমন হতাশায় ডুবে যাবে যে নিজেদের অধিকার ও জাতীয় আকাঙ্ক্ষা থেকে সরে দাঁড়াবে। কিন্তু সেই ধারণা বাস্তবে টেকেনি।
ফিলিস্তিনিদের অব্যাহত উপস্থিতি, প্রতিরোধের ধারাবাহিকতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিলিস্তিন প্রশ্নের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব দেখিয়ে দিয়েছে, নৃশংস সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে ইসরায়েল তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।
সামরিক শক্তি দিয়ে সাময়িক বাস্তবতা চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু শুধু শক্তি প্রয়োগ করে রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন করা যায় না। বরং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ সেই বৈধতাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ইসরায়েল সরকার ও দেশটির সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে ঠিক এমনটাই ঘটেছে।
গত মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে মঞ্চে উঠেছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সে সময় জাতিসংঘের অধিকাংশ সদস্যদেশের প্রতিনিধিরা অধিবেশনকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।
এদিকে, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।
শুধু নেতানিয়াহুর আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, ইসরায়েলও বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়েছে। ৩৬টি দেশে পরিচালিত পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের ৬৭ শতাংশ ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদেশগুলোর জনগণের মধ্যেও দেশটির প্রতি বিরূপ মনোভাব বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ৬০ শতাংশ, জার্মানিতে ৭৩ শতাংশ, যুক্তরাজ্যে ৬৯ শতাংশ এবং ফ্রান্সে ৬৮ শতাংশ উত্তরদাতা ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন।
ওয়াশিংটনে ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন দেওয়া নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। দেশটির ক্রমবর্ধমানসংখ্যক আইনপ্রণেতা সামরিক সহায়তা সীমিত করা কিংবা নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাবসংবলিত বিলের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। ইউরোপের বিভিন্ন রাজধানীতেও একই ধরনের আলোচনা থেকে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে গড়ে ওঠা অবৈধ ইসরায়েলি বসতিতে বাণিজ্য সীমিত করার সাম্প্রতিক উদ্যোগ এসেছে।
আজ ইসরায়েলি নেতারা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। তাঁরা সামরিক সাফল্যের কথা তুলে ধরবেন, সেনাবাহিনীর শক্তির প্রশংসা করবেন এবং আরও প্রতিশোধের প্রতিশ্রুতি দেবেন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সেনাবাহিনী ইসরায়েলের হাতে রয়েছে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, উন্নত ড্রোন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর প্রযুক্তিতে পরিচালিত ৯০০ টন ওজনের বোমা। সেই বিপুল সামরিক শক্তি নিয়েই দেশটি হালকা অস্ত্রে সজ্জিত একটি রাষ্ট্রবহির্ভূত সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যামূলক যুদ্ধে নেমেছে। অথচ যুদ্ধের ঘোষিত রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলো অর্জনে তারা ব্যর্থ হয়েছে।
মানুষকে হত্যা করা যায়, বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়, ভূখণ্ড দখল করা যায়। কিন্তু কয়েক দশক ধরে বিশ্বের মানুষের কাছে প্রতিধ্বনিত হয়ে আসা একটি জাতির জাতীয় আকাঙ্ক্ষা ও ন্যায়সংগত অধিকারের দাবিকে সামরিক শক্তি দিয়ে নিশ্চিহ্ন করা যায় না।



