নতুন জামালপুর: জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো ক্যারিয়ার নির্বাচন। কিন্তু অনেকের কাছেই প্রশ্নটি সহজ নয়। কেউ বুঝতে পারেন না তিনি আসলে কী করতে চান, কেউ আবার পরিবার, সমাজ কিংবা বন্ধুদের পছন্দের পেশাকে নিজের পছন্দ বলে ধরে নেন। ফলে পড়াশোনা শেষ করার পরও অনেকের মনে থেকে যায় প্রশ্ন, ‘আমি আসলে কোন কাজটি করতে চাই?’
ক্যারিয়ার বেছে নেওয়ার আগে তাই শুধু কোন পেশায় বেশি টাকা পাওয়া যায়, সেটি না ভেবে নিজের আগ্রহ, দক্ষতা, ব্যক্তিত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য সম্পর্কে ধারণা নেওয়া জরুরি। কিন্তু নিজের আগ্রহটা খুঁজে বের করবেন কীভাবে?
১. কোন কাজ করতে ভালো লাগে, সেটি খেয়াল করুন
আপনার অবসর সময়ের দিকে তাকান। কোন কাজ করতে গেলে সময়ের কথা ভুলে যান? বই পড়া, লেখালেখি, মানুষের সঙ্গে কথা বলা, ছবি তোলা, কম্পিউটারে কাজ করা, কিছু বানানো, হিসাব করা, শেখানো কিংবা কোনো সমস্যা সমাধান করা?
এগুলোকে ছোট বিষয় ভেবে এড়িয়ে যাবেন না। আপনার স্বাভাবিক আগ্রহের জায়গাগুলো ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের সম্ভাব্য দিক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিতে পারে।
২. ‘কী ভালো লাগে’ নয়, ‘কী করতে ভালো লাগে’ ভাবুন
কোনো বিষয় সম্পর্কে আগ্রহ থাকা আর সেই বিষয়ে কাজ করতে ভালো লাগা এক বিষয় নয়।
ধরুন, আপনি প্রযুক্তি সম্পর্কে ভিডিও দেখতে পছন্দ করেন। এর অর্থ এই নয় যে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং আপনার জন্য উপযুক্ত। হয়তো প্রযুক্তি নিয়ে লেখা বা ভিডিও তৈরি করতেই আপনার বেশি ভালো লাগে।
তাই নিজেকে প্রশ্ন করুন, ‘এই বিষয়টি নিয়ে আমি প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা কাজ করতে পারব কি?’
৩. নিজের শক্তির জায়গাগুলো লিখে ফেলুন
একটি কাগজে লিখুন, আপনি কোন কোন কাজে তুলনামূলকভাবে ভালো।
যেমন:
লিখতে পারি
মানুষের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ করতে পারি
গণিতে ভালো
তথ্য বিশ্লেষণ করতে ভালো লাগে
নেতৃত্ব দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি
ছবি বা ভিডিও বানাতে ভালো লাগে
হাতেকলমে কাজ করতে পছন্দ করি
অন্যকে কিছু শেখাতে ভালো লাগে
এরপর দেখুন, এসব দক্ষতার সঙ্গে কোন কোন পেশার সম্পর্ক রয়েছে।
৪. নিজের বিরক্তির জায়গাগুলোও চিনুন
ক্যারিয়ার বেছে নেওয়ার সময় শুধু পছন্দের বিষয় নয়, অপছন্দের বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
আপনি যদি দীর্ঘ সময় একা বসে কাজ করতে খুব অস্বস্তি বোধ করেন, তাহলে এমন কিছু পেশা আপনার জন্য কঠিন হতে পারে যেখানে দিনের বড় অংশ একাকী কাজ করতে হয়। আবার কেউ যদি নিয়মিত মানুষের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে নিরিবিলিতে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তার ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন হতে পারে।
তবে কোনো কাজ এখন ভালো না লাগলেই সেটি সারাজীবনের জন্য বাদ দিতে হবে, এমন নয়। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে পছন্দও বদলাতে পারে।
৫. বিভিন্ন পেশা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা নিন
শুধু ইউটিউব ভিডিও বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখে কোনো পেশা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। সম্ভব হলে সেই পেশায় কাজ করেন এমন মানুষের সঙ্গে কথা বলুন।
জানুন:
কাজটির প্রতিদিনের দায়িত্ব কী?
কত সময় কাজ করতে হয়?
কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন?
কাজের সবচেয়ে কঠিন দিক কোনটি?
ক্যারিয়ার গড়তে কত সময় লাগে?
সম্ভব হলে ইন্টার্নশিপ, স্বেচ্ছাসেবা, পার্টটাইম কাজ বা ছোট কোনো প্রকল্পের মাধ্যমে কাজটি কিছুদিন করে দেখুন। বাস্তব অভিজ্ঞতা অনেক সময় নিজের আগ্রহ সম্পর্কে বই বা ক্যারিয়ার টেস্টের চেয়েও পরিষ্কার ধারণা দেয়।
৬. ‘ক্যারিয়ার টেস্ট’ করতে পারেন, কিন্তু ফলকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বানাবেন না
অনলাইনে বিভিন্ন ধরনের পধৎববৎ ধংংবংংসবহঃ বা ঢ়বৎংড়হধষরঃু ঃবংঃ পাওয়া যায়। এগুলো আপনার আগ্রহ ও ব্যক্তিত্বের কিছু প্রবণতা বুঝতে সাহায্য করতে পারে।
তবে কোনো পরীক্ষার ফল যদি বলে আপনি একটি নির্দিষ্ট পেশার জন্য উপযুক্ত, তার মানে এই নয় যে আপনাকে সেই পেশাতেই যেতে হবে। এগুলোকে আত্মপরিচয়ের একটি সহায়ক উপকরণ হিসেবে দেখাই ভালো।
৭. নিজের জন্য ছোট ছোট পরীক্ষা চালান
আপনি কোন কাজে সত্যিই আগ্রহী, তা বোঝার একটি কার্যকর উপায় হলো ছোট প্রকল্প।
লেখালেখিতে আগ্রহ থাকলে একটি ব্লগ বা কয়েকটি লেখা তৈরি করুন। ভিডিও ভালো লাগলে কয়েকটি ভিডিও বানান। প্রোগ্রামিং ভালো লাগলে ছোট একটি অ্যাপ বা ওয়েবসাইট তৈরির চেষ্টা করুন। ব্যবসায় আগ্রহ থাকলে ছোট পরিসরে কোনো পণ্য বিক্রির চেষ্টা করুন।
তারপর দেখুন, কাজটি শেষ করার পর আপনার অনুভূতি কেমন হয়। শুধু ফলাফল নয়, কাজ করার প্রক্রিয়াটিও উপভোগ করছেন কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
৮. টাকা ও সামাজিক মর্যাদাকে একমাত্র মানদণ্ড বানাবেন না
কোনো পেশায় ভালো আয় হতে পারে, কিন্তু সেই কাজ আপনার কাছে অসহ্য মনে হতে পারে। আবার তুলনামূলক কম পরিচিত কোনো কাজ আপনার জন্য বেশি অর্থবহ হতে পারে।
অবশ্যই আয় গুরুত্বপূর্ণ। নিজের আর্থিক প্রয়োজন, পরিবারের দায়িত্ব, চাকরির বাজার এবং ভবিষ্যতের সুযোগ বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু শুধু ‘কোন পেশায় সবচেয়ে বেশি টাকা’ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে নিজের সক্ষমতা ও আগ্রহকে পুরোপুরি উপেক্ষা করাও ঝুঁকিপূর্ণ।
৯. নিজের কাছে পাঁচটি প্রশ্ন করুন
ক্যারিয়ার নিয়ে দ্বিধায় থাকলে একটি খাতায় এই পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর লিখে ফেলুন:
১. কোন কাজ করতে গেলে আমি স্বাভাবিকভাবেই মনোযোগী হয়ে যাই?
২. কোন কাজের জন্য অন্যরা প্রায়ই আমার সাহায্য নেয়?
৩. কোন বিষয়ে আমি নিজের আগ্রহে আরও জানতে চাই?
৪. আগামী পাঁচ বছর কোনো একটি দক্ষতা উন্নত করতে হলে কোন দক্ষতাটি বেছে নেব?
৫. টাকা বা সামাজিক চাপ না থাকলে আমি কী ধরনের কাজ করার কথা ভাবতাম?
শেষ প্রশ্নটির উত্তর বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি আপনাকে বাইরের প্রত্যাশার বদলে নিজের আকাঙ্ক্ষার দিকে তাকাতে সাহায্য করতে পারে। তবে বাস্তব জীবনের আর্থিক ও পারিবারিক বাস্তবতাও পরবর্তী সিদ্ধান্তে বিবেচনা করতে হবে।
১০. মনে রাখুন, ক্যারিয়ার নির্বাচন একবারের সিদ্ধান্ত নয়
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ক্যারিয়ার নির্বাচনকে জীবনের একবারের চূড়ান্ত পরীক্ষা হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই।
অনেক মানুষ পড়াশোনার বিষয় থেকে ভিন্ন পেশায় যান। কেউ চাকরি থেকে ব্যবসায় যান, কেউ আবার একটি পেশায় কাজ করতে করতে সম্পূর্ণ নতুন কোনো দক্ষতা অর্জন করেন। সময়ের সঙ্গে মানুষের আগ্রহ, দক্ষতা ও পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে পারে।
তাই ‘আমার জীবনের একমাত্র সঠিক ক্যারিয়ার কোনটি?’ এই প্রশ্নের বদলে বরং প্রশ্ন করুন, ‘এই মুহূর্তে আমার আগ্রহ, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও বাস্তবতার সঙ্গে কোন কাজের মিল সবচেয়ে বেশি?’
নিজেকে চেনার চেষ্টা, বিভিন্ন কাজ পরীক্ষা করে দেখা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে করতে সেই উত্তর ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে পারে।
ক্যারিয়ার খোঁজার যাত্রায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়তো কোনো নির্দিষ্ট পেশার নাম খুঁজে পাওয়া নয়; বরং নিজের জন্য কোন ধরনের কাজ অর্থবহ, উপভোগ্য এবং দীর্ঘদিন ধরে করা সম্ভব, সেটি বুঝতে শেখা।



