একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা মারা গেলেন। তাঁর জীবনের শেষ বিদায়টুকু হওয়ার কথা ছিল রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়। কিন্তু সেই মর্যাদাটুকুও যদি বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, আমরা আসলে কোন রাষ্ট্রে বাস করছি?
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন কোনো ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়। এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতি আনুষ্ঠানিক সম্মান। মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা জীবন, শ্রম, নিরাপত্তা ও স্বার্থকে তুচ্ছ করে দেশের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের প্রতি রাষ্ট্রের এই স্বীকৃতি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের প্রতিও সম্মান।
সেই সম্মান প্রদানের পথে যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বাধা দেয়, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। কারণ এখানে শুধু একজন মৃত মানুষের শেষ বিদায়ের প্রশ্ন নেই, প্রশ্ন আছে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার সক্ষমতা নিয়ে।
কেউ কোনো মুক্তিযোদ্ধার পরিচয়, স্বীকৃতি বা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিয়ে আপত্তি তুলতে পারেন। কিন্তু আপত্তি জানানোরও আইনসম্মত পথ আছে। মৃত্যুর পর একজন মানুষের মরদেহকে ঘিরে জনতার চাপ সৃষ্টি, বাধা দেওয়া কিংবা নিজেদের সিদ্ধান্তকে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের ওপরে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ কোনোভাবেই স্বাভাবিক হতে পারে না।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখানেই সবচেয়ে বেশি।
যদি সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে যে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অধিকারী, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা তাদের দায়িত্ব। আর কোনো বিষয়ে বিতর্ক বা অভিযোগ থাকলে সেটি যাচাই করার দায়িত্বও রাষ্ট্রের। জনতার চাপের কাছে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বদলে দেওয়া কোনো সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার লক্ষণ হতে পারে না।
এখানে আরেকটি প্রশ্নও জরুরি। একজন মানুষ জীবিত থাকতে তাঁর অবদান নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক, মৃত্যুর পর তাঁর শেষকৃত্যকে কি আমরা বিরোধের মঞ্চে পরিণত করব?
আমাদের মনে রাখা দরকার, ইতিহাসের বিচার তাৎক্ষণিক জনমতের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। ইতিহাসের সত্য যাচাই হয় দলিল, সাক্ষ্য, গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে। মবের সিদ্ধান্ত ইতিহাসের বিকল্প হতে পারে না।
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন নিয়ে যদি সত্যিই বাধা সৃষ্টি হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। কী ঘটেছিল, কারা বাধা দিয়েছিল, প্রশাসনের ভূমিকা কী ছিল এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কোনো ব্যর্থতা ছিল কি না, তা স্পষ্ট হওয়া দরকার।
কারণ আজ যদি একজন মুক্তিযোদ্ধার শেষ সম্মান রক্ষা করতে রাষ্ট্রকে জনতার অনুমতির অপেক্ষায় থাকতে হয়, কাল একই প্রশ্ন অন্য কোনো নাগরিকের ক্ষেত্রেও উঠতে পারে।
রাষ্ট্রের শক্তি শুধু আইন, পুলিশ কিংবা প্রশাসনে নয়। রাষ্ট্রের শক্তি হলো, তার সিদ্ধান্ত আইন ও নীতির ভিত্তিতে কার্যকর হওয়ার নিশ্চয়তা।
আর সেই জায়গায় যদি মবের চাপ রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে পরাজিত করে, তাহলে পরাজিত হন শুধু একজন মৃত মানুষ নন। পরাজিত হয় রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব, আইনের শাসন এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ।
বীর মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার মাস্টারের জীবনের অবদান ও আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন এবং তাঁর প্রাপ্য সম্মান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর চাপ নয়, ইতিহাস, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও আইনের ভিত্তিতেই একজন মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা নির্ধারিত ও রক্ষিত হওয়া উচিত।

