Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
মতামত

অ্যা ভেলচার অ্যান্ড দ্য লিটল বয়

অ্যা ভেলচার অ্যান্ড দ্য লিটল বয়

শারদুল আহমেদ শু’আইব ।।

কখনো কখনো ইতিহাসের বুকে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যায়, যা কেবল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে থাকে না, বরং তা পুরো ভবিষ্যতকেই আচ্ছাদিত করে ফেলে। যা ভবিষ্যতের প্রত্যেকটা অধ্যায়ের উপর নিজের জন্য ঘর বানিয়ে নেয়। এমন বিষয় শুধু ঘটনাই নয়, বরং পৃথিবীর জন্য একটি অদৃশ্য ভবিষ্যৎবাণী।‌ তেমনি একটা বাস্তব ঘটনা নিয়ে আলোচনা করব আজ। একবিংশ শতাব্দীর সমাজ বাস্তবতাটি উঠে আসে এটার মধ্যে। যেন মনে হয়, ভবিষ্যৎ বিশ্ব বাস্তবতার এক আগাম বার্তা ছিল এটিতে।

চলুন শুরু করা যাক।

সময়টি ১৯৯৩: কেভিন কার্টার নামে একজন দক্ষিণ আফ্রিকান ফটোগ্রাফার হেঁটে যাচ্ছেন মরুর বালি পাড়ি দিয়ে। হাতে তার ছায়া সঙ্গী ক্যামেরা। নিত্যদিনের মতো আজও পূব আকাশে সূর্য উঠেছে। পরিবেশ ছিল শান্তিপূর্ণ ও নিরিবিলি। চারিদিকে পাক পাখালিদের ডাক, রোদ্রপূর্ন নীল আকাশ, বাতাসে গাছের ঝাপটানো ও ধূসর মরুবালি পরিবেশকে করে তুলেছিল বৈচিত্রময়। কিন্তু হঠাৎ তিনি একটি দূরবর্তী দৃশ্য দেখতে পান, যা তার হৃদয়কে করে তুলেছিল স্তম্ভিত, আর চোখকে করে ফেলেছিল লক্ষ্যবস্তুতে কেন্দ্রীভূত, এবং শরীরকে করেছিল স্থির। কি সেই দৃশ্যটা? তিনি দেখতে পান দূরবর্তী একটি জায়গায় মানব সদৃশ একটি প্রাণী দেহ গুটিয়ে বসে রয়েছে। শরীরের আকৃতি ও দৈহিক আচরণে একটি রহস্যময় ভাব প্রকাশ পাচ্ছে। তিনি ভয় পান যে এটা আসলে কি? তিনি দৌড়িয়ে কাছে গেলেন। তিনি দেখতে পেলেন যে এটা আসলে মানুষেরই সন্তান। পুষ্টিহীনতায় তার শরীরটা রোগা কঙ্কালের মতো অদ্ভুত একটা আকৃতি ধারণ করে ফেলেছে। শিশুটির পাঁজরের হাড়গুলো যেন চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে আসতে চাইছিল, যা দেখলে যে কারোরই লোম দাঁড়িয়ে যায়। ছোট্ট শিশুটি শরীরকে একদম গুটিয়ে নিয়ে স্থির হয়ে মৃত্যুর শয্যায় ভোগছে।

ঠিক ওই মুহূর্তে কেভিন আরেকটা দৃশ্য দেখতে পান, যা তার হৃদয়কে আরো কাঁপিয়ে দিয়েছিল। তিনি দেখতে পান শিশুটির ঠিক পিছনে একটি শকুন দাঁড়িয়ে রয়েছে। তৎক্ষণাৎ তার এই পরিস্থিতির নির্মমতা চোখের সামনে স্পষ্ট রূপে ভেসে উঠলো। শকুন কখনোই জীবিত প্রাণীর মাংস খায় না। তাই শকুন জায়গাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই কারণে যে, এই শিশুটি যখন মারা যাবে তখন শকুনটি শিশুটির মাংস খাবে। তার মানে একটি পাখিও বুঝে গেছে যে এই শিশুটি মারা যাবে! পরিস্থিতির কি নির্মম বাস্তবতা! শিশুটি মৃত্যুবরণ করবে আর তখনই গিয়ে সেই শকুনটি শিশুটির মাংস হবে। এই দৃশ্যটির সুদানের পুরো দুর্ভিক্ষকে ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম। একটা রাষ্ট্রে কি পরিমানে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হলে এরকম একটা দৃশ্য তৈরি হয়। সুদানে তখন চরম দুর্ভিক্ষ চলছিল। খাদ্য সংকটে পুরো সুদান ভয়াবহ অবস্থা ধারণ করেছিল। আর সুদানের পুরো দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ চিত্রটিই এর মধ্যেই উঠে এসেছে। কেননা, একটাই শিশু ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে আর তার মারা যাওয়ার পূর্বেই তার পিছনে একটা শকুন প্রস্তুত হয়ে রয়েছে ওকে খাওয়ার জন্য। ভাবা যায়! কতটা ভয়াবহ পরিস্থিতি! কেভিন সঙ্গে সঙ্গেই এই ছবিটি ক্যাপচার করে ফেলে। এটা ছিল সম্পূর্ণ “প্রাকৃতিকভাবে বিন্যস্ত ছবি”। শকুন সেই জায়গাতে আগে থেকেই দাঁড়ানো ছিল। পরিকল্পিত ছিল না কিছুই। স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবেগি একটি চিত্র ফুটে উঠেছিল। এক কথায় “প্রাকৃতিক সুসংগঠিত ছবি”।

১৯৯৩ ২৬ শে মার্চ: তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বিখ্যাত পত্রিকা “নিউইয়র্ক টাইমস” এ এটি প্রথম প্রকাশ করেন। প্রকাশ করার পরেই বিশ্বজুড়ে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এত নিখুঁত একটি প্রাকৃতিক সুসংগঠিত ছবি তুলাও কি সম্ভব! দেখে যেন মনে হয়, ছবিটি যেন কথা বলছে। ছবিটির প্রশংসার সাথে সাথে জাতিসংঘের নেতৃত্বে অপারেশন লাইফ লাইন এর দ্বারা পরিচালিত যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দুর্ভিক্ষ-পীড়িত এলাকায় খাদ্য, ঔষধ ও জরুরী ত্রাণ পৌঁছে দেয়া শুরু করল। UNICEF শিশুদের জন্য পুষ্টিকেন্দ্র, চিকিৎসা সহায়তা এবং জরুরি খাদ্য সরবরাহে কাজ করেছিল। ইত্যাদি আরো বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা ত্রাণ পৌঁছানো শুরু করল। কিন্তু যিনি এই ছবিটা তুলেছিলেন, তিনি নিজে রইলেন অন্য এক মনস্তত্ত্বের জগতে। তিনি এই ছবিটির জন্য দেশ-বিদেশে বহু প্রশংসা ও বাহবা কুড়াতে থাকলেন। বিশ্ববাসীর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেন। তার চিন্তা-চেতনা ও কার্যক্রম যেন অন্য আরেক জগতে।

যাহোক, সাল ১৯৯৪:

তিনি এই ছবিটির জন্য পুলিৎজার পুরস্কার পেলেন। মে মাসে নিউইয়র্কের Feature Photography বিভাগে পুরস্কার পান। সেখানে সাংবাদিক, সম্পাদক, আলোকচিত্রী, লেখক, পুরস্কারজয়ী এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন। এটি ছিল একটি আনুষ্ঠানিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। তাকে পুরস্কার দিয়েই প্রেস কনফারেন্সে উপস্থিত সাংবাদিক, লেখকরা প্রশ্ন করা শুরু করল। তিনি একের পর এক একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকলেন। অবশেষে একটা পর্যায়ে একজন সাংবাদিক তাকে একটি প্রশ্ন করে বসল, যা ছিল এই গল্পটির টার্নিং পয়েন্ট।

তিনি বললেন, “আচ্ছা স্যার, আপনি যে ওই ছবিটা তুলেছিলেন, সেই ছবিটা তুলার পরে ওই শিশুটির সাথে কি হয়েছিল? শিশুটি কি বেঁচে গিয়েছিল নাকি সত্যিই শকুনের খাবার হয়েছিল?”

এরপর লোকটি যা উত্তর দিয়েছিলেন, তা ঐ প্রেস কনফারেন্সে উপস্থিত সকল দর্শককেই রিতিমত স্তব্ধ করে দিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, “না ভাই, সেটা আমি জানিনা। আমার আমেরিকার একটা ফ্লাইট ছিল। তো আমি ছবিটা তুলেই সেখান থেকে চলে গিয়েছিলাম। তারপর ওই শিশুটির সাথে কি হয়েছিল তা আমি জানিনা।” এটা শুনে অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকল দর্শক বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। মানুষের মনে এই প্রশ্ন তৈরি হয়, যেখানে ছবিটা দেখে সারা বিশ্বই সুদানের সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছিল, সেখানে এই ছবিটির ক্রিয়েটরই তো নিশ্চিন্তে বসে রয়েছে। তখন সাংবাদিকটি আবার প্রশ্ন করল, “আচ্ছা স্যার, ওই ছবিতে শকুন ছিল কয়টা বলুন তো?” কেভিন কার্টার বলল, “ওই ছবিতে তো একটা শকুন ছিল, যা আমি জানি।”

এর বিপরীতেই সাংবাদিকটি এমন একটি উত্তর দেয়, যা আজকের দিনে ইতিহাস হয়ে রয়েছে। এটি সাংবাদিকের কর্মকাণ্ডের চিত্রটি তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট ছিল।

সাংবাদিকটি বলে উঠলো, “ভুল স্যার, ওই ছবিতে আসলে দুইটা শকুন ছিল। একটা তো হলো ঐ শকুন, যে ওই শিশুটির পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল। আরেকটা হলো ঐ শকুন, যে ওই অবস্থায় ক্যামেরা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।”

কেভিন কার্টার নিজেই তখন বুঝতে পারলেন যে তিনি আসলে কি করেছেন। তার বিবেক জাগ্রত হয়ে যায় এবং শরীর স্তম্ভিত হয়ে যায়। সে সবসময়ই প্রকৃতির দৃশ্য ক্যাপচার করে গেছে, কিন্তু কোনো সময় তার ক্যাপচার করা দৃশ্যের দিকে মনোযোগ যায়নি যে, সে আসলে কি ক্যাপচার করছে। বারবার এই ক্যাপচার, চিন্তা-চেতনা ও অভ্যাসটি ধীরে ধীরে কখন যে তার বাস্তব প্রকৃতির ও দৃশ্য থেকে আলাদা করে ফেলেছে, তা হয়ত কখনো সে টেরই পায়নি। সংক্ষেপে বলতে গেলে, অনেকটাই তার মনোযোগটা বাস্তবতা থেকে সব সময় ছবির ফ্রেমে আটকে রেখেছিল।

এই ঘটনাটি ঘটার প্রায় চার মাস পরে তিনি মানসিক ডিপ্রেশনে ভোগে আত্মহত্যা করে মারা যান। আর গল্পটিরও সমাপ্তি ঘটে যায়। মানব জাতির জন্য রেখে যায় এক অমর শিক্ষা। গল্পটি আজকের দিনে বর্তমান সমাজ-বাস্তবতাটি আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। আমরা কি সবাই কেভিন কার্টার থেকে আলাদা কিছু? মানুষ এখন নৈতিক কর্মকে বুঝেনা, মানুষ বুঝে নৈতিক কর্মটা দেখানোকে। নিজে কতটুকু নৈতিক কাজ করছে, তার থেকে বড় হচ্ছে মানুষ আমাকে নৈতিক কাজ করতে কতটুকু দেখছে। দুস্থ দারিদ্র্যদের অর্থসহায়তা করার সময় সেটি সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রকাশ করা, ট্রেন দুর্ঘটনার সময় মানুষকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে না এসে সেগুলো ফেসবুকে ছাড়া শুরু করা, বিল্ডিং এ আগুন নামলে সেটা নেভানোর থেকে নেট দুনিয়ায় প্রকাশ করাটাই মুখ্য হয়ে গেছে এখন। এমনকি পুকুরে ডুবন্ত মানুষের ক্ষেত্রেও তাকে না বাঁচিয়ে সেলফি তোলার নজিরও রয়েছে এই বাংলাদেশে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের মানসিকভাবে কতটা বিকারগ্রস্ত করে দিয়েছে চিন্তা করা যায়।

লেখক- শিক্ষার্থী, জামালপুর রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies