জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে প্রথম আলোচনাটি সাধারণত হয় পরিবহন ব্যয় নিয়ে। বাসের ভাড়া বাড়বে কি না, পণ্য পরিবহনে কতটা প্রভাব পড়বে, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কতটা বাড়তে পারে, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কতটা বাড়বে, এসব নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু এই আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। সেটি হলো কৃষি।
অথচ বাংলাদেশের কৃষির সঙ্গে জ্বালানি তেলের সম্পর্ক অত্যন্ত প্রত্যক্ষ। জমি চাষ থেকে শুরু করে সেচ, ফসল কাটা, মাড়াই, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবহন এবং শেষ পর্যন্ত বাজারজাতকরণ পর্যন্ত কৃষির বিভিন্ন ধাপে জ্বালানি ব্যয় জড়িয়ে আছে। ফলে ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ের হিসাব থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
নতুন দরে ডিজেলের দাম হয়েছে ১৩৫ টাকা। অর্থাৎ মার্চের তুলনায় এখন প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ৩৫ টাকা বেশি। একই সময়ে কৃষকের জন্য জমি প্রস্তুত, সেচ ও পরিবহনের খরচও বাড়ার চাপ তৈরি হবে। এর অর্থ হলো, কৃষক যখন পরবর্তী ফসলের উৎপাদন পরিকল্পনা করবেন, তখন তাকে আগের তুলনায় বেশি খরচের হিসাব করতে হবে।
সমস্যার জায়গাটি এখানেই।
কৃষক উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার পণ্যের দাম ইচ্ছামতো বাড়াতে পারেন না। তিনি সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রম, সেচ ও জ্বালানির দাম নির্ধারণ করেন না। এমনকি অনেক সময় ফসল বিক্রির বাজারদরও তার নিয়ন্ত্রণে থাকে না। ফলে কৃষকের অর্থনৈতিক অবস্থানটি অদ্ভুত এক অসমতার মধ্যে পড়ে। উৎপাদনের প্রায় সব উপকরণের দাম বাজার নির্ধারণ করে, কিন্তু উৎপাদিত পণ্যের দাম কমে গেলে তার লোকসানের দায় মূলত কৃষককেই বহন করতে হয়।
এ বাস্তবতায় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি কৃষকের জন্য কেবল একটি বাড়তি খরচ নয়; এটি তার লাভের মার্জিন আরও সংকুচিত করার ঝুঁকি।
সরকারের যুক্তিও অবশ্য অগ্রাহ্য করার মতো নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয়, বিপিসির লোকসান, পাচারের ঝুঁকি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে। রাষ্ট্রীয় একটি বড় প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি লোকসানও অনির্দিষ্টকাল ধরে বহন করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্য নির্ধারণের নীতিও অর্থনৈতিক বাস্তবতার অংশ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি খাতে মূল্য সমন্বয়ের ফলে অন্য একটি উৎপাদনশীল খাতের ওপর যে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে, সেটি সমন্বয়ের জন্য রাষ্ট্রের নীতি কী?
এখানেই কৃষির জন্য আলাদা ও সুস্পষ্ট নীতির প্রয়োজন।
কৃষককে প্রতিবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সরাসরি নগদ সহায়তা দিতে হবে, এমন কথা নয়। বরং প্রয়োজন এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা, যাতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ের ওপর জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত সীমিত থাকে এবং কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পান।
বিশেষ করে সেচের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। বাংলাদেশের বহু এলাকায় ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র কৃষির গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন। ডিজেলের দাম বাড়লে সেচের খরচ বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। এর প্রভাব সরাসরি জমির উৎপাদন ব্যয়ে পড়বে। আমন, বোরো, সবজি কিংবা অন্যান্য সেচনির্ভর ফসলের ক্ষেত্রে এই বাড়তি ব্যয় কৃষকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এখানে নীতিনির্ধারকদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত, কোন ফসলে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কতটা পড়ছে তার একটি বাস্তবসম্মত হিসাব তৈরি করা। শুধু বাজারে পণ্যের দাম বাড়ল কি না, তা দেখলেই হবে না। কৃষকের মাঠপর্যায়ের উৎপাদন ব্যয় কত বাড়ল, সেটিও নিয়মিতভাবে পরিমাপ করতে হবে।
কৃষকের উৎপাদন ব্যয় নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারণে একটি বড় দুর্বলতা হলো, অনেক সময় হিসাবটি কাগজে থাকে, কিন্তু বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়। কৃষি শ্রমিকের মজুরি, সেচের খরচ, যন্ত্রপাতি ভাড়া, পরিবহন, সার ও কীটনাশকের দাম দ্রুত পরিবর্তিত হয়। কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে কৃষকের ন্যায্যমূল্য বা সরকারি সহায়তার কাঠামো কতটা দ্রুত সামঞ্জস্য করে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর যদি শুধু বলা হয় যে বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে কৃষক বেশি আয় করবেন, তাহলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। কারণ ফসল উৎপাদনের সময় কৃষক যে দামে উপকরণ কেনেন এবং ফসল বিক্রির সময় যে দাম পান, তার মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হতে পারে। মধ্যস্বত্বভোগী, পরিবহন ব্যয়, সংরক্ষণ সংকট এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এই ব্যবধানকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তাই কৃষকের জন্য নীতির কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত শুধু ‘উৎপাদন’ নয়, পুরো ‘ভ্যালু চেইন’।
জ্বালানি ব্যয় বাড়লে কৃষিপণ্য পরিবহনের খরচ বাড়বে। ফলে গ্রামের উৎপাদন কেন্দ্র থেকে শহরের বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ব্যয় যুক্ত হতে পারে। এর একদিকে কৃষক কম দামে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হতে পারেন, অন্যদিকে ভোক্তাকে বেশি দামে কিনতে হতে পারে। অর্থাৎ একই পণ্য থেকে কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই চাপের মুখে পড়বেন, অথচ মাঝের বাজার কাঠামোই হয়তো সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এই জায়গায় কৃষিপণ্য পরিবহনে বিশেষ নীতি বিবেচনা করা যেতে পারে। একইভাবে কৃষিযন্ত্র ব্যবহারে প্রণোদনা, জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির প্রসার, সেচ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং সমবায়ভিত্তিক যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। একটি কৃষক একা যে ব্যয় বহন করতে পারেন না, কয়েকজন কৃষক মিলে একই যন্ত্র ব্যবহার করলে সেই ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
ডিজেলনির্ভর সেচের পাশাপাশি সৌরচালিত সেচের প্রসারও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অংশ হতে পারে। তবে প্রযুক্তি পরিবর্তনের কথা বললেই হবে না; কৃষকের সামর্থ্য, প্রাথমিক বিনিয়োগ এবং স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর অর্থায়ন ও প্রণোদনা দিতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কৃষকের ন্যায্যমূল্য।
উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে অথচ কৃষক তার পণ্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না, এমন পরিস্থিতিতে কৃষির ওপর চাপ ক্রমেই বাড়বে। এক পর্যায়ে কৃষক কম লাভজনক ফসল থেকে সরে যেতে পারেন, জমি আবাদে অনাগ্রহী হতে পারেন কিংবা ঋণের ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন। এর প্রভাব শুধু কৃষকের পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকবে না; দেশের খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে।
কৃষিকে তাই ‘কম দামে খাদ্য উৎপাদনের ব্যবস্থা’ হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। কৃষককে টিকে থাকার মতো আয় নিশ্চিত না করে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যের স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন।
এখানে সরকারের নীতিতে একটি ভারসাম্য দরকার। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে জ্বালানি মূল্য সমন্বয়, অন্যদিকে কৃষির মতো কৌশলগত খাতকে অতিরিক্ত অভিঘাত থেকে সুরক্ষা। দুটি বিষয় পরস্পরবিরোধী নয়। বরং একটি কার্যকর অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এগুলো পাশাপাশি চলার কথা।
কৃষকের জন্য ‘অফসেটিং পলিসি’ বা প্রতিপূরণমূলক নীতির কথা তাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। জ্বালানির দাম বাড়লে কোন কোন কৃষি খাতে কী ধরনের অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি হচ্ছে, তার ভিত্তিতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। সেচ, কৃষিযন্ত্র, পরিবহন কিংবা নির্দিষ্ট ফসলের উৎপাদনে যেখানে জ্বালানি ব্যয়ের প্রভাব বেশি, সেখানে সাময়িক বা মৌসুমি প্রণোদনা কার্যকর হতে পারে।
এ ধরনের নীতি সার্বজনীন ভর্তুকির চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। কারণ সবাইকে একই সুবিধা দেওয়ার পরিবর্তে যেখানে অভিঘাত বেশি, সেখানে সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব।
একই সঙ্গে কৃষককে শুধু ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল করে রাখাও সমাধান নয়। কৃষি উৎপাদনকে দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে হবে, সেচে জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি আনতে হবে, উৎপাদন ও বাজারের মধ্যে সরাসরি সংযোগ বাড়াতে হবে এবং কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। এতে উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি অপচয় ও বাজারজাতকরণের ব্যয়ও কমানো সম্ভব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বাজারদরের একটি বাস্তব সম্পর্ক তৈরি করা। প্রতি মৌসুমে প্রধান ফসলগুলোর উৎপাদন ব্যয় নির্ধারণ করে তার ভিত্তিতে ন্যায্যমূল্য, সরকারি ক্রয়মূল্য কিংবা প্রয়োজনীয় প্রণোদনার কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে কৃষক আগেভাগে একটি অর্থনৈতিক ধারণা নিয়ে উৎপাদন পরিকল্পনা করতে পারবেন।
রাষ্ট্র যদি জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারে, তাহলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ের হিসাবও কেন নিয়মিতভাবে সমন্বয় করা যাবে না?
এই প্রশ্নটি এখন গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ কৃষক শুধু একজন উৎপাদক নন। তিনি দেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তার উৎপাদন ব্যয় বাড়লে সেটি শেষ পর্যন্ত খাদ্যের দাম, মূল্যস্ফীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে প্রভাব ফেলে। তাই কৃষকের উৎপাদন ব্যয়কে কৃষকের ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি সামগ্রিক অর্থনীতির সমস্যা।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পেছনে সরকারের অর্থনৈতিক যুক্তি থাকতে পারে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের পর কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কতটা বাড়বে এবং সেই বাড়তি ব্যয় কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তারও একটি নীতিগত উত্তর থাকা প্রয়োজন।
কৃষককে শুধু উৎপাদন করতে বলা যথেষ্ট নয়। তাকে উৎপাদনের সক্ষমতা, ন্যায্য বাজার এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিতে হবে।
জ্বালানির দাম সমন্বয় যদি অর্থনীতির প্রয়োজন হয়, তবে কৃষকের জন্যও প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক সুরক্ষা নীতি। কারণ কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে খাদ্য উৎপাদন স্থিতিশীল রাখা যায় না। আর কৃষি দুর্বল হলে তার অভিঘাত শুধু কৃষকের ঘরে নয়, শেষ পর্যন্ত পৌঁছাবে দেশের প্রতিটি পরিবারের রান্নাঘরে।



