বাংলাদেশ নদী, খাল, বিল, পুকুর ও জলাশয়ের দেশ। এ দেশের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে পানির সম্পর্ক যেমন গভীর, তেমনি পানিই হয়ে উঠছে অসংখ্য পরিবারের জন্য মৃত্যুর কারণ। প্রতিবছর দেশে হাজার হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই মৃত্যুর বড় অংশই শিশুদের। অর্থাৎ যে বয়সে একটি শিশুর স্কুলে যাওয়ার কথা, খেলাধুলা ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার কথা, সেই বয়সেই অনেকের জীবন থেমে যাচ্ছে পানিতে ডুবে।
সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণা ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর যে চিত্র উঠে এসেছে, তা নিছক একটি দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও শিশু সুরক্ষার একটি বড় সংকেত। বিভিন্ন সূত্রে দেশে প্রতিবছর প্রায় ১৭ থেকে ১৮ হাজার মানুষের পানিতে ডুবে মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে শিশুদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। কোনো কোনো গবেষণায় দেখা গেছে, এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। আবার গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নয় বছরের কম বয়সী শিশুরাই পানিতে ডুবে মৃত্যুর বড় অংশজুড়ে রয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই মৃত্যুর কতটা সত্যিই অনিবার্য?
পানিতে ডুবে মৃত্যু অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য। একটি শিশু যদি পানিতে পড়ে যায় এবং ভেসে থাকার ন্যূনতম কৌশল জানে, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কিছুটা সুযোগ তৈরি হয়। সাঁতার জানা থাকলে ঝুঁকি কমে। তার সঙ্গে যদি পানির নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা, বড়দের নজরদারি এবং জলাশয়ের চারপাশে নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকে, তাহলে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও কমানো সম্ভব।
তাহলে স্কুলে সাঁতার শেখানো হবে না কেন?
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় শিশুরা বছরের পর বছর ধরে নানা বিষয় শেখে। বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোলসহ বহু বিষয়ে তাদের দক্ষ করে তোলার চেষ্টা করা হয়। এগুলো অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু নিজের জীবন রক্ষার একটি মৌলিক দক্ষতা যদি সেই শিক্ষার অংশ না হয়, তাহলে আমাদের শিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
সাঁতারকে শুধু খেলাধুলা হিসেবে দেখলে বিষয়টির গুরুত্ব কমে যায়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় সাঁতার একটি জীবনরক্ষাকারী দক্ষতা। যেমন আগুন লাগলে কী করতে হবে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলে কীভাবে সাহায্য করতে হবে কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে নিরাপদে সরে যেতে হবে, এসব বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা থাকা দরকার। তেমনি পানির সঙ্গে বসবাস করা একটি দেশের শিশুদের পানিতে নিরাপদ থাকার দক্ষতাও থাকা জরুরি।
তবে এখানে একটি বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে। দেশের সব স্কুলে সুইমিং পুল নেই। প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক বিদ্যালয়ের অবকাঠামোও সীমিত। ফলে আগামীকাল থেকেই প্রতিটি স্কুলে সুইমিং পুল বানিয়ে সাঁতার শেখানো বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা কোনো উদ্যোগ না নেওয়ার কারণ হতে পারে না।
প্রথমে প্রয়োজন একটি বাস্তবসম্মত জাতীয় নীতি।
যেসব বিদ্যালয়ের নিজস্ব পুল আছে, সেখানে নিয়মিত সাঁতার শিক্ষা চালু করা যেতে পারে। যেসব এলাকায় পুকুর বা জলাশয় নিরাপদভাবে ব্যবহার করা সম্ভব, সেখানে স্থানীয় প্রশাসন, বিদ্যালয় ও প্রশিক্ষিত সংগঠনের সহযোগিতায় নির্ধারিত স্থানে সাঁতার শেখানো যেতে পারে। ইউনিয়ন, উপজেলা বা পৌরসভা পর্যায়ে কয়েকটি বিদ্যালয়কে নিয়ে একটি কমিউনিটি সুইমিং বা জলনিরাপত্তা প্রশিক্ষণকেন্দ্রও গড়ে তোলা সম্ভব।
একই সঙ্গে সাঁতার শেখানোর অর্থ শুধু পানিতে হাত-পা ছোড়া নয়। শিশুদের বয়স উপযোগীভাবে পানিতে ভেসে থাকা, বিপদে শান্ত থাকা, নিরাপদে পানি থেকে বের হওয়ার চেষ্টা, অন্য কেউ ডুবে গেলে নিজের জীবন ঝুঁকিতে না ফেলে কীভাবে সাহায্য চাইতে হবে এবং জরুরি অবস্থায় প্রাথমিক চিকিৎসার মতো বিষয়ও শেখানো প্রয়োজন।
কারণ সাঁতার জানলেও সবাই যে ডুবে মরবে না, এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রবল স্রোত, গভীর পানি, নৌযান দুর্ঘটনা কিংবা সমুদ্রে ঢেউয়ের মতো পরিস্থিতি সাঁতার জানা মানুষের জন্যও বিপজ্জনক হতে পারে। তাই সাঁতার শিক্ষার পাশাপাশি পানিতে নিরাপত্তা শিক্ষা জরুরি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বয়স।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত গবেষণার তথ্য বলছে, খুব অল্প বয়সী শিশুরাই পানিতে ডুবে সবচেয়ে বেশি মারা যায়। এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুরা বিশেষ ঝুঁকিতে থাকলেও এই বয়সে তাদের জন্য বাধ্যতামূলক স্কুলভিত্তিক সাঁতার শিক্ষা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তাই শুধু স্কুলের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না।
এ ক্ষেত্রে পরিবার ও কমিউনিটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি শিশু কোথায় খেলছে, বাড়ির আশপাশে কোনো পুকুর বা জলাশয় আছে কি না, জলাশয়ের চারপাশে নিরাপত্তাব্যবস্থা আছে কি না, এসব বিষয় পরিবারকে গুরুত্ব দিতে হবে। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে বড়দের নজরদারি সবচেয়ে জরুরি। বিশেষ করে যেসব বাড়ির পাশে পুকুর, খাল বা ডোবা রয়েছে, সেখানে শিশুদের নিরাপত্তাকে দৈনন্দিন পারিবারিক অভ্যাসের অংশ করতে হবে।
তবে সব দায়িত্ব পরিবারের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও ঠিক নয়। পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর পেছনে সামাজিক ও অবকাঠামোগত কারণও রয়েছে। একটি বাড়ির পাশে বিপজ্জনক পুকুর থাকলে সেটি ঘিরে নিরাপত্তাবেষ্টনী নেই কেন, ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয় চিহ্নিত করা হয়নি কেন, স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক ব্যবস্থা নেই কেন, এসব প্রশ্নও করতে হবে।
বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অনেক বাড়ির কাছেই পুকুর। অনেক ক্ষেত্রে এসব জলাশয়ই গোসল, মাছ চাষ, গৃহস্থালির কাজসহ নানা প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়। তাই প্রতিটি জলাশয় ঘিরে স্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি করা সহজ নয়। কিন্তু অন্তত ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখানে একটি বড় ভূমিকা নিতে পারে।
স্কুলে সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট ক্লাস বা নির্দিষ্ট সময় পানিতে নিরাপত্তা শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে। শারীরিক শিক্ষার অংশ হিসেবে ধাপে ধাপে সাঁতার শেখানো যেতে পারে। যেসব বিদ্যালয়ে সাঁতারের সুযোগ নেই, সেখানে কাছাকাছি নিরাপদ প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সঙ্গে বিদ্যালয়ের সমন্বয় করা যেতে পারে। প্রশিক্ষক তৈরির জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
একই সঙ্গে শিক্ষকদেরও মৌলিক জলনিরাপত্তা ও উদ্ধার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। কারণ কোনো শিশু পানিতে পড়ে গেলে আতঙ্কিত হয়ে একসঙ্গে অনেক মানুষ পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়া উল্টো আরও প্রাণহানির কারণ হতে পারে। নিরাপদ উদ্ধারকৌশল জানা থাকলে একটি দুর্ঘটনার পরিণতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্বও কম নয়।
যদি সাঁতারকে জাতীয় শিক্ষার অংশ করার কথা বলা হয়, তাহলে শুধু পাঠ্যবইয়ে একটি অধ্যায় যুক্ত করলেই হবে না। প্রয়োজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক, নিরাপদ প্রশিক্ষণস্থান, অর্থায়ন এবং পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, যুব ও ক্রীড়া এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষার ফলাফল ও সনদকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। ফলে জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় অনেক দক্ষতা শিক্ষার বাইরে থেকে গেছে। অথচ একজন শিক্ষিত মানুষ কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করবে, এমন নয়; তাকে নিজের জীবন ও অন্যের জীবন রক্ষার মৌলিক জ্ঞানও জানতে হবে।
সাঁতার সেই মৌলিক দক্ষতাগুলোর একটি।
এটি কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, পানির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত বিশ্বের বহু দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা আরও ভিন্ন। এখানে বর্ষা আসে, নদী-নালা-পুকুর আছে, বন্যা হয়, বাড়ির কাছেই জলাশয় থাকে। ফলে পানির ঝুঁকি এ দেশের শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতার অংশ।
এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে শিক্ষা পরিকল্পনা করা কতটা যুক্তিসংগত, সেই প্রশ্ন এখন সামনে আনা দরকার।
তবে সাঁতারকে বাধ্যতামূলক করার আগে আরেকটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। এটি যেন কাগজে-কলমে বাধ্যতামূলক কোনো বিষয় হয়ে না থাকে। দেশের বহু বিদ্যালয়ে এমনিতেই শিক্ষক ও অবকাঠামোর সংকট রয়েছে। নতুন একটি বাধ্যতামূলক বিষয় যোগ করে যদি বাস্তবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না করা হয়, তাহলে সেটি আরেকটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হবে।
তাই প্রয়োজন ধাপে ধাপে এগোনো।
প্রথম ধাপে বিদ্যালয়গুলোতে পানিতে নিরাপত্তা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। দ্বিতীয় ধাপে উপজেলা বা স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপদ সাঁতার প্রশিক্ষণকেন্দ্র তৈরি করা যেতে পারে। তৃতীয় ধাপে নির্দিষ্ট বয়সের শিশুদের জন্য সাঁতার শেখার ন্যূনতম দক্ষতা অর্জনকে শিক্ষার অংশ করা যেতে পারে। পাশাপাশি প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড ও সাঁতার প্রশিক্ষকের একটি স্থানীয় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যেতে পারে।
এর সঙ্গে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার। দেশে পানিতে ডুবে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়। ফলে নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ জরুরি। কোথায়, কোন বয়সী শিশু, কোন সময়ে এবং কী পরিস্থিতিতে পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে, এসব তথ্য জানা গেলে প্রতিরোধমূলক পরিকল্পনাও আরও কার্যকর হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুকে ‘দুর্ঘটনা’ বলে মেনে নিয়ে থেমে না যাওয়া।
যে মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব, সেটিকে প্রতিরোধের চেষ্টা করাই সমাজের দায়িত্ব। একটি শিশুকে সাঁতার শেখাতে কিছু সময় ও অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু একটি শিশুর জীবন হারানোর ক্ষতি কোনো অর্থ দিয়ে পূরণ করা যায় না।
আমরা যদি শিক্ষাকে শুধু চাকরির প্রস্তুতি হিসেবে না দেখে জীবন প্রস্তুতির মাধ্যম হিসেবে দেখি, তাহলে সাঁতার শেখানোর প্রশ্নটি আর বিলাসিতা মনে হবে না। বরং প্রশ্নটি হওয়া উচিত, বাংলাদেশের মতো জলবেষ্টিত একটি দেশে প্রতিটি শিশুকে জীবন রক্ষার এই মৌলিক দক্ষতা শেখাতে আমরা আর কতদিন অপেক্ষা করব?
স্কুলে সাঁতার শেখানো বাধ্যতামূলক করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে বাস্তবতা ও সক্ষমতার বিচার অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সাঁতার ও জলনিরাপত্তাকে শিক্ষাব্যবস্থার অংশ করা উচিত কি না, এই প্রশ্নটি আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
লেখক- সম্পাদক ও প্রকাশক, সাপ্তাহিক জনজীবন চিত্র



