মুসলিম ইবনে রবি, জাবিপ্রবি প্রতিনিধি
জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে নিয়োজিত বাসে জ্বালানি তেল ক্রয়ে ব্যাপক জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৭ শতাংশ শিক্ষার্থীর নিয়মিত যাতায়াতের মূল ভরসা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবহন পুলের বাস সার্ভিস।
তেলের স্লিপে অতিরিক্ত তেলের পরিমাণ লিখে সংশ্লিষ্ট পেট্রোল পাম্প থেকে তেল না নিয়ে, সমপরিমাণ নগদ অর্থ অসাধু উপায়ে ভাগ-বাটোয়ারা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি সাংবাদিকদের হাতে আসা একটি গোপন অডিও রেকর্ডিংয়ে বাসের চালক, হেলপার এবং পাম্প ম্যানেজারের যোগসাজশে চলা এই আর্থিক অনিয়মের বিবরণ উঠে এসেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিবহন সংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তি বলেন,”বাসে প্রতিবার তেল নেওয়ার সময় বা চালানে নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে অন্তত ২০ লিটার পর্যন্ত তেল কম নিয়ে তা নথিপত্রে অতিরিক্ত হিসেবে দেখানো হতো।”
তিনি আরো বলেন,”বাসে প্রকৃতপক্ষে ১৩৪ বা ১৩৫ লিটার তেল দেওয়া হলেও খাতায় বা রেজিস্টার স্লিপে ১৫৫ লিটার হিসেবে জমা দেখানো হতো।” অর্থাৎ, প্রতি চালানে প্রায় ২০ লিটার তেল বাস্তবে সরবরাহ না করেই কাগজে-কলমে ভুয়া হিসাব দেখিয়ে তা উত্তোলন করা হতো বলে তার বক্তব্যে উঠে আসে৷
পূর্বে তেলের বাজারদর অনুযায়ী, প্রতি লিটার আনুমানিক ১১৬ টাকা ধরে, প্রতি টিপে প্রায় ২০ লিটার অতিরিক্ত তেলের বিপরীতে অনৈতিকভাবে নগদ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। ওই কথোপকথনের তথ্যমতে, ২০ লিটার অতিরিক্ত তেলের বিপরীতে পাম্প থেকে পাওয়া যায় আনুমানিক ১৬০০ থেকে ১৮০০ টাকা পর্যন্ত। এই অর্থের একটি অংশ স্লিপ লেখা ও ঘটনা গোপন রাখার বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট সহকারীকে (হেলপার) দেওয়া হতো এবং অবশিষ্ট প্রধান অংশটি সরাসরি চালকের পকেটে যেত৷
প্রাপ্ত তথ্য ও নথির হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পরিবহন পুলের চারটি সচল বাসের ক্ষেত্রে যদি এক মাসে প্রতি গাড়িতে গড়ে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লিটার করে তেল কাগজ কলমে অতিরিক্ত লিখে, বাস্তবে কম নেওয়া হয়, তবে মাসে মোট প্রায় ২০০ লিটার জ্বালানির সমপরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। বাজারদরে যার আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় প্রতি মাসে আনুমানিক ২০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে বছরে আড়াই লক্ষাধিক টাকা পর্যন্ত।
গোপন রেকর্ডিং সূত্রে, সংশ্লিষ্ট বাস চালক সরাসরি পেট্রোল পাম্পের ম্যানেজারের সাথে যোগাযোগ ও সমঝোতা বজায় রেখে এই কারচুপি চালিয়ে আসছিলেন। পাম্পের মূল মালিকপক্ষ এই কারচুপির সাথে সংশ্লিষ্ট কিনা তিনি জানেন না ৷ মুলত ম্যানেজারের সহায়তায় স্লিপের বিপরীতে সরাসরি নগদ টাকা লেনদেন করা হতো বলে দাবি করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি।
তেল চুরির ঘটনা প্রসঙ্গে পরিবহন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী (মেকানিক্যাল) মোঃ শামীম আহমেদ বলেন,” বড় কোন ব্যবধান দেখলে আমরা সেগুলো যাচাই করি৷ তেল আনতে আমিও কয়েকবার গিয়েছিলাম৷ তবে আমাকে কাগজগুলো আরেকবার দেখতে হবে৷”
এদিকে গত ২৪ আগস্ট জালিয়াতির ঘটনাটি সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তাৎক্ষণিক প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থী। তিনি ঘটনার বর্ণনায় এবং ছবি তোলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “১টার বাসটি ক্যাম্পাস থেকে ছেড়ে দুপুর আনুমানিক ২টা ৮ মিনিটে পাম্পে তেল নিতে থামলে আমি কাছেই অবস্থান করছিলাম। ডিজিটাল মিটারে স্পষ্ট ১৩৪ লিটার উঠতে দেখলেও পরে রিসিপ্ট এবং ভাউচারে ১৫৫ লিটার লেখার বিষয়টি লক্ষ্য করি। সঙ্গে সঙ্গে পাম্পের মিটার রিডিং ভাউচারের ছবি তুলে রাখি, যাতে পরবর্তীতে প্রমাণ মুছে ফেলা না যায়।”
পরিবহন প্রশাসনের নজরদারির বিষয়েও উঠে এসেছে মারাত্মক গাফিলতির তথ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন খাতে এই ধরনের অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে, যা পূর্ববর্তী বিভিন্ন যানবাহনের সময়েও কার্যকর ছিল। সঠিক তদারকি ও নিয়মিত অডিটিংয়ের অভাবেই সরকারি তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ বছরের পর বছর ধরে এভাবে হাতবদল হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষক ও সচেতন মহল মনে করছেন৷




