সামির হাবাশনেহ
জর্ডানের রাজনীতিক ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ।।
বর্তমান উপসাগরীয় যুদ্ধকে অন্য যুদ্ধগুলোর সঙ্গে সহজে মেলানো যায় না। সাধারণত যুদ্ধ দুটি পরিণতির একটিতে গিয়ে শেষ হয়। হয় কোনো এক পক্ষ প্রতিপক্ষের ওপর নির্ণায়ক বিজয় অর্জন করে এবং পরাজিত পক্ষকে আত্মসমর্পণ চুক্তিতে যেতে হয়, বিজয়ী পক্ষের শর্ত মেনে নিতে হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিণতি ছিল এমনই, দুটিতেই মিত্রশক্তি বিজয়ী হয়েছিল।
অথবা যুদ্ধ শেষ হয় এমন এক সমঝোতার মধ্য দিয়ে, যার মূলনীতি হলো, “কেউ বিজয়ী নয়, কেউ পরাজিতও নয়”। উভয় পক্ষ নিজেদের সামরিক সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে লড়াই চালিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষই যখন নির্ণায়ক ফল অর্জন করতে পারে না, তখন উভয়েই ক্লান্ত হয়ে যুদ্ধ থামিয়ে এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছায়, যেখানে দুই পক্ষের স্বার্থই কিছুটা বিবেচনায় থাকে। যুদ্ধ তখন এমনভাবে শেষ হয় যেন তা কখনো শুরুই হয়নি, শুধু রেখে যায় মানুষের প্রাণহানি ও বিপুল বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি।
এর একটি উদাহরণ ইরান-ইরাক যুদ্ধ। আট বছর ধরে চলা সেই যুদ্ধে ইরান বা ইরাক কেউই তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। ইরাক আরবিস্তান মুক্ত করতে পারেনি, আবার ইরানও ইরাকের বাথ পার্টির সরকার উৎখাত করতে পারেনি।
আমেরিকার আধুনিক যুদ্ধগুলোর দিকে তাকালেও একই বাস্তবতা দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো কোনো যুদ্ধে সরাসরি পরাজিত হয়নি, কিন্তু যে লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিল, সেগুলোও শেষ পর্যন্ত অর্জন করতে পারেনি। সাইগন থেকে হেলিকপ্টারে আমেরিকানদের সরিয়ে নেওয়ার দৃশ্য এখনো স্মৃতিতে উজ্জ্বল। একইভাবে কাবুল বিমানবন্দরের সেই ঐতিহাসিক দৃশ্যও ভুলে যাওয়ার নয়, যখন আমেরিকার মিত্ররা মরিয়া হয়ে একটি শেষ আশ্রয়ের পথ আঁকড়ে ধরেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা তাদের রক্ষা করতে পারেনি।
ভিয়েতনাম যুদ্ধে প্রায় ৬০ হাজার মার্কিন সামরিক সদস্য প্রাণ হারান। শেষ পর্যন্ত প্যারিসে একটি চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ দেওয়া হয়। আমেরিকানরা ভিয়েতনাম থেকে সরে যায় এবং দেশটি ভিয়েতনামের নিজস্ব শর্তে একীভূত হয়।
আফগানিস্তানেও একই ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে হাজার হাজার টন বোমা ফেলেছে, অথচ শেষ পর্যন্ত হঠাৎ ও বিশৃঙ্খলভাবে সেখান থেকে সরে যেতে হয়েছে। সেই দৃশ্য অনেকের কাছেই বিপর্যয় থেকে পালিয়ে যাওয়ার মতো মনে হয়েছিল। এরপর আসে ইরাক আক্রমণ। সেই যুদ্ধকে অনেক সময় এমন মনে হয়েছে যেন তা ইরানের স্বার্থেই পরিচালিত হয়েছিল। আট বছরের যুদ্ধে তেহরান যা অর্জন করতে পারেনি, আমেরিকা তা করে দিয়েছে ইরাককে ইরানের প্রভাববলয়ের হাতে তুলে দিয়ে। আমেরিকা হয়তো যুদ্ধ হারে, কিন্তু পরবর্তী যুদ্ধ শুরু করার আগে আগের যুদ্ধগুলোর শিক্ষা নেয় না।
আজকের এই উপসাগরীয় যুদ্ধ তাই একেবারেই ভিন্ন ধরনের।
গত বছর আমরা অবাক হয়ে দেখেছিলাম ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একটি যুদ্ধ, যা দুই সপ্তাহও স্থায়ী হয়নি। এর ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা। কিন্তু হঠাৎ করেই যুদ্ধ থেমে গেল। মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো সরে গেল, ইসরায়েলি বিমানও তেহরানের আকাশ থেকে চলে গেল, আর তাদের হাতে থাকা অস্ত্র ব্যবহার না করেই তারা ফিরে গেল। এর পেছনে ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত। অথচ যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জিত না হলেও উভয় পক্ষই নিজেদের বিজয়ী বলে দাবি করেছিল।
এরপর কয়েক মাস পরিস্থিতি অপরিবর্তিত ছিল। তারপর হঠাৎ আবার যুদ্ধ শুরু হলো। সেই সময় ওমানের মধ্যস্থতায় আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলছিল। এমনকি ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরুর ঠিক পরদিনই দুই পক্ষের আলোচনা আবার বসার কথা ছিল। কিন্তু তার বদলে শুরু হলো ইরানের শহরগুলোর ওপর ব্যাপক বোমাবর্ষণ। মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও ইসরায়েলি বিমান দিনরাত একটানা হামলা চালাতে থাকল।
দ্বিতীয় বিস্ময় ছিল, এই যুদ্ধও কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই থেমে গেল। এরপর শুরু হলো আবার যুদ্ধ শুরু করার হুমকি। আমেরিকা ও ইসরায়েলের হুমকির জবাবে ইরানও পাল্টা হুমকি দিতে থাকল। এক ধরনের থেমে থেমে চলা যুদ্ধ শুরু হলো, যেখানে আমেরিকার একটি হামলার জবাব আসে ইরানের হামলায়, তারপর আবার পাল্টা আঘাত। আর এই ইচ্ছাশক্তির লড়াইয়ে ইসরায়েল, যে এই যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ, কার্যত বাইরে রাখা হয়েছে।
এটি তাই প্রচলিত অর্থে কোনো যুদ্ধ নয়। বরং একে মোরগের লড়াইয়ের সঙ্গে তুলনা করা যায়। আবার এটিকে “কেউ বিজয়ী নয়, কেউ পরাজিতও নয়” ধরনের যুদ্ধও বলা যায় না। কারণ উভয় পক্ষই এখনো দাবি করছে যে তাদের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ও সক্ষমতা রয়েছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিটি মার্কিন হামলার জবাব ইরান দিচ্ছে, যদিও ইরানের পাল্টা হামলার প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। কিন্তু এর অর্থ হলো, ইরান আত্মসমর্পণ করেনি, তাদের মনোবল ভেঙে পড়েনি এবং প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করার মতো কিছুটা হলেও সক্ষমতা এখনো তাদের রয়েছে।
এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের ওপর অবরোধ বহাল রাখার পাশাপাশি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি এসব নিষেধাজ্ঞাকে নজিরবিহীন ও ধ্বংসাত্মক বলে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু মনে রাখা দরকার, ইরানের ওপর গত ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
এখানে ইরাকের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। কুয়েত আক্রমণের পর ইরাকের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ আরোপ করা হয়েছিল, তাতে খাদ্য ও ওষুধের সংকটের মধ্যে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে বিভিন্ন হিসাব রয়েছে। ইরাকের মানুষ এতটাই দরিদ্র হয়ে পড়েছিল যে, দৈনন্দিন জীবনের খরচ মেটাতে তাদের মূল্যবান সম্পদ পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছিল।
অবশ্য অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা ইরাকিদের জীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছিল। কিন্তু ইরানের পরিস্থিতি কি ইরাকের সঙ্গে তুলনীয়? আমার মতে, একেবারেই নয়। এই তুলনা সঠিক নয়।
ইরান ইরাকের চেয়ে কয়েক গুণ বড় দেশ। ইরাক এমন কয়েকটি দেশ দিয়ে ঘেরা ছিল, যেগুলো তার রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বৈরী ছিল। এর মধ্যে ইরান ও সিরিয়াও ছিল। ইরাকের একমাত্র কার্যকর জীবনরেখা ছিল জর্ডান। কিন্তু আকাবা বন্দরে জর্ডানকেও এমনভাবে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা হয়েছিল, যাতে অবরোধ ভেঙে কোনো কিছু ইরাকে পৌঁছাতে না পারে।
ইরানের পরিস্থিতি ভিন্ন। দেশটির পাকিস্তান, আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আজারবাইজান ও ইরাকের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এসব দেশের সঙ্গে ইরানের এমন কোনো স্পষ্ট বৈরিতা নেই, যার কারণে তারা ইরানের ওপর অবরোধ আরও কঠোর করবে কিংবা আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে মেনে চলবে। বিশেষ করে ইরাক কার্যত এমন একটি উন্মুক্ত সীমান্ত তৈরি করে রেখেছে, যার মাধ্যমে ইরান প্রয়োজনীয় বহু কিছু সংগ্রহ করতে পারে।
এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ক্যাস্পিয়ান সাগরের সঙ্গে ইরানের প্রায় ৭০০ কিলোমিটার উপকূল রয়েছে। এই জলপথ দিয়ে ইরান কয়েকটি দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাশিয়া, যার সঙ্গে ইরানের সুসম্পর্ক রয়েছে এবং যে দেশটি ক্যাস্পিয়ান সাগরের অপর তীর ভাগ করে নেয়।
এই কারণে আমার বিশ্বাস, অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা যত কঠোরই করা হোক না কেন, তা ইরানিদের পিছু হটতে বা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করবে না।
আমার দৃষ্টিতে, ইরানিদের সামনে যদি আত্মসমর্পণ অথবা আরেকটি যুদ্ধের মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, তারা হয়তো যুদ্ধকেই বেছে নেবে। তাদের মধ্যে এখনো শক্তির একটি নির্দিষ্ট মাত্রা রয়েছে বলে মনে হয়, এবং তারা নিজেদের সামরিক সক্ষমতা আবারও গড়ে তোলার ক্ষমতা রাখে বলেও ধারণা করা যায়।
সবশেষে বলা যায়, ইরানের বিরুদ্ধে এই মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের পেছনে যে তিনটি প্রধান লক্ষ্য ছিল, সেগুলো হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির অবসান ঘটানো, দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ধ্বংস করা অথবা অন্তত এর পাল্লা সীমিত করা এবং ইরানের সরকারকে উৎখাত করা।
এই তিনটির কোনোটিই অর্জিত হয়নি।
এটা সত্য যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং দেশটির অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতা নিহত হয়েছেন। দেশের বিশাল অংশের অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও বর্তমান ইরানি নেতৃত্ব আগের নেতৃত্বগুলোর তুলনায় আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতার প্রশ্নটি। যুদ্ধ শুরুর সরাসরি কারণ এটি ছিল না। কিন্তু যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি হিসেবে এটি সামনে এসেছে।
পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মনে হচ্ছে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের মূল লক্ষ্যগুলো অর্জিত না হলেও এখন হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করাই সবচেয়ে জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এটি না হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে মন্দা এবং বড় ধরনের আর্থিক ও অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিতে পারে।
ফলে এখন প্রায় সব প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালির এই সংকট। আর যুদ্ধের যে মূল কারণগুলো সামনে রেখে সংঘাত শুরু হয়েছিল, সেগুলো নিয়ে আলোচনা ক্রমেই পেছনে সরে যাচ্ছে।
সবশেষে, মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা আরও জোরদার করতে হবে। পাকিস্তান, ওমান ও কাতার ইতিমধ্যে যে প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিচ্ছে, তার সঙ্গে ইউরোপ ও চীনের মতো প্রভাবশালী শক্তিগুলোকেও যুক্ত হতে হবে।
তাদের অংশগ্রহণ মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে তারা সংঘাতের উভয় পক্ষের ওপর প্রভাব বিস্তার করে তাদের সমঝোতার দিকে এগিয়ে নিতে পারে।
এমন একটি সমঝোতা প্রয়োজন, যা সবার স্বার্থের কিছুটা হলেও সুরক্ষা দেবে, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেবে, বিশ্বকে একটি ভয়াবহ আর্থিক ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে রক্ষা করবে এবং আরব দেশগুলোকে এমন একটি যুদ্ধের বোমাবর্ষণ ও নিরাপত্তা লঙ্ঘন থেকে রক্ষা করবে, যে যুদ্ধে তারা নিজেরা কোনো পক্ষই নয়।
সামির হাবাশনেহ
জর্ডানের রাজনীতিক ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি কৃষিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে জর্ডানে বিভিন্ন একাডেমিক ও নাগরিক সমাজভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের দায়িত্বে রয়েছেন।
আল জাজিরা থেকে বাংলায় রুপান্তরিত




