Skip to content
৫ নভেম্বর ২০২৬ (২০ কার্তিক ১৪৩৩)
সর্বশেষ
এমপি মামুনের উদ্যোগে চার লেনে উন্নীত হচ্ছে টাঙ্গাইল-জামালপুর মহাসড়ক জামালপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার দায়ে মাদ্রাসাশিক্ষকের ৮ বছরের কারাদণ্ড নাব্যতা রক্ষায় সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের গাজীপুরে সংঘর্ষে প্রাণ গেল পোশাকশ্রমিক তৌফিকের, দুধ আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না জামালপুরে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ইসলামপুরে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই ভেকু জব্দ বাবাকে হারানোর শোক পেরিয়ে শোভার জিপিএ-৫, স্বপ্ন আইন নিয়ে পড়ার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি, বাজারে শৃঙ্খলা জরুরী প্রথম কলাম ।। ৫ নভেম্বর হেমন্তের কুয়াশায় শীতের আগমনী সুর
আন্তর্জাতিক

কেন বিদ্রোহ করছে জেন-জি?

কেন বিদ্রোহ করছে জেন-জি?

অস্কার বার্গলুন্ড ।। ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন বিক্ষোভের ঢেউ চলছে। এসব আন্দোলনের অনেকগুলোই ‘জেন-জি বিক্ষোভ’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। আনুমানিক ১৩ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণেরাই এসব বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে এমন কিছু সংকট, যার প্রভাব তাঁদের প্রজন্মের ওপর বিশেষভাবে পড়ছে।

ফ্রান্সে কয়েক সপ্তাহ আগে শিক্ষাব্যবস্থার অবনতিশীল পরিস্থিতি এবং দীর্ঘদিনের অর্থসংকটে ধুঁকতে থাকা বিদ্যালয়গুলোর দুরবস্থা নিয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলন আরও জোরালো হয়েছে। গত সপ্তাহান্তে দেশজুড়ে এসব বিক্ষোভে পাঁচ লাখ থেকে আট লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ‘ককরোচ আন্দোলন’। গত সপ্তাহে এই আন্দোলনের নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটিরও বেশি মানুষের নাম বাদ দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ আরও বেড়েছে।

স্পেনে আবাসনব্যবস্থার সংকট এবং উচ্ছেদের মুখে পড়া পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ আইন নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। প্রথমে ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাসকালকে জোরপূর্বক তাঁর বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। এরপর সংসদে এমন একটি বহুল সমর্থিত আইন পাসের প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায়, যার লক্ষ্য ছিল পরিবারগুলোকে উচ্ছেদের হাত থেকে রক্ষা করা। এর জেরে আগাম নির্বাচনের ডাক দেন প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। উচ্ছেদের দুই সপ্তাহ পর মারা যান মারিকারমেন।

দেশভেদে বিক্ষোভের প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও সাম্প্রতিক এই আন্দোলনগুলোর কেন্দ্রে রয়েছে বৈষম্য। এই বৈষম্যের দুটি প্রধান দিক আছে। একটি শ্রেণিগত, অন্যটি প্রজন্মগত।

২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর থেকে ইউরোপজুড়ে বৈষম্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আয়বৈষম্যের পাশাপাশি সম্পদের বৈষম্যও ক্রমাগত বাড়ছে। একসময় ইউরোপের কল্যাণরাষ্ট্রগুলো সবার জন্য উন্নত মানের সরকারি সেবা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, প্রত্যেক নাগরিকের জীবনযাপনের একটি ন্যূনতম মান নিশ্চিত করা এবং এমন একটি মেধাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে সবার সামনে উন্নতির সমান সুযোগ থাকবে।

কিন্তু বছরের পর বছর কৃচ্ছ্রসাধনমূলক নীতি ও সরকারি ব্যয় সংকোচনের ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে রাষ্ট্রের সক্ষমতা ক্ষয়ে গেছে। রাষ্ট্র যখন ধীরে ধীরে এসব দায়িত্ব থেকে সরে আসে, তখন আয় ও সম্পদের বৈষম্য আরও প্রকট হয়ে ওঠে। যাঁদের সামর্থ্য আছে, তাঁরা অর্থ ব্যয় করে উন্নত সেবা নিতে পারেন। কিন্তু বিপুলসংখ্যক মানুষের পক্ষে সেই সুযোগ পাওয়া সম্ভব হয় না।

এই ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের অভিঘাত তরুণদের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁদের নিজেদের জীবনের নানা সংকট। একের পর এক ক্ষেত্রে রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতা তরুণদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে হতাশ করে তুলছে। তাঁদের সামনে যে সুযোগ ও সম্ভাবনা থাকার কথা, বাস্তবে তা আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক সংকুচিত।

অর্থসংকটে থাকা শিক্ষাব্যবস্থা এর একটি বড় উদাহরণ। সাম্প্রতিক পিআইএসএ (PISA) পরীক্ষার ফলাফলে শিক্ষার্থীদের পড়ার দক্ষতা ও গণিতের পারদর্শিতায় যে উল্লেখযোগ্য অবনতি দেখা গেছে, তার পেছনে বিদ্যালয়গুলোর পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হয়।

এই অবনতির একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো, তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে এবং এর ফলে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতিও বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে প্রায়ই অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

তবে শিক্ষার মান কমে যাওয়ার পেছনে আরেকটি কারণ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিস্তার। এ ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের নীতিগত ব্যর্থতা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এআইয়ের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ ধীরগতির। প্রযুক্তি খাতের বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালী লবিংয়ের কারণে এসব উদ্যোগ আরও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এআই বিপুলসংখ্যক তরুণের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করছে। শ্রমবাজারে এআইয়ের পূর্ণ প্রভাব এখনো স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। তবে ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরিগুলোর অনেক কাজ যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হচ্ছে। ফলে কর্মজীবন শুরু করতে চাওয়া তরুণদের জন্য প্রবেশের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

আবাসনও এমন একটি মৌলিক ক্ষেত্র, যেখানে তরুণেরা অন্য প্রজন্মের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছেন। বর্তমানে তরুণদের আয়ের অনেক বড় অংশ বাড়িভাড়া পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। অতীতের কোনো প্রজন্মকে আবাসনের জন্য আয়ের এত বড় অংশ ব্যয় করতে হয়নি। এটিও রাষ্ট্রের নীতিগত ব্যর্থতারই প্রতিফলন।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু সংকট, যা সম্ভবত রাষ্ট্র পরিচালনা ও বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণের ব্যর্থতাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর। জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক জাতিসংঘের আন্তসরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) সর্বশেষ প্রতিবেদন দেখিয়েছে, ২০২০ সালে জন্ম নেওয়া শিশুদের জীবন তাদের মা-বাবা ও দাদা-দাদিদের জীবনের তুলনায় কতটা অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

অধিকতর সমতাভিত্তিক সমাজ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট অস্থিরতা মোকাবিলায় অনেক বেশি সক্ষম হতো। কারণ, এমন সমাজে সংকটের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার দায়িত্ব ব্যক্তি বা পরিবারের ওপর এককভাবে চাপিয়ে না দিয়ে সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে তা মোকাবিলা করা সম্ভব।

কিন্তু বর্তমানে যে বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠছে, সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সামাল দেওয়ার দায় ক্রমেই ব্যক্তি ও পরিবারের ওপর বর্তাবে। যাদের আর্থিক সামর্থ্য বেশি, তারা নিজেদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে পারবে। অন্যদিকে সীমিত আয়ের মানুষকে আরও বেশি ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হবে।

সব মিলিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় ধারাবাহিক ব্যর্থতা এবং জনসেবায় রাষ্ট্রের সক্ষমতা হ্রাস তরুণদের মধ্যে বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। প্যারিস, নয়াদিল্লি, রোম ও মাদ্রিদের রাজপথে যে ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে এই বাস্তবতা।

আন্দোলনের মুখে সরকারগুলোর প্রধান প্রতিক্রিয়া হয়ে উঠেছে দমন-পীড়ন। প্রতিবাদের অধিকার সংকুচিত করা এবং বিক্ষোভকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার যে বৈশ্বিক প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তারই অংশ এটি। কোথাও কঠোর বিক্ষোভবিরোধী আইন করা হচ্ছে, কোথাও আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, আবার কোথাও তাঁদের ওপর পুলিশি সহিংসতা চালানো হচ্ছে।

দমন-পীড়ন কখনো কখনো আন্দোলনকে স্তিমিত করতে পারে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তা উল্টো আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ বাড়িয়ে দেয় এবং প্রতিবাদকে আরও তীব্র করে তোলে। ফ্রান্স ও ভারতে এখন পর্যন্ত তেমন পরিস্থিতিই দেখা গেছে।

তবে প্রকৃত সমাধান দমন-পীড়নের মধ্যে নেই। তরুণদের রাজপথে নামতে বাধ্য করছে যেসব বৈষম্য, বঞ্চনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতা, সেগুলোর মোকাবিলায় আন্তরিক উদ্যোগ নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।

শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং প্রযুক্তির পরিবর্তনকে জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

তরুণদের ক্ষোভের পেছনে থাকা বাস্তব সমস্যাগুলো উপেক্ষা করে কেবল আন্দোলন দমনের চেষ্টা চলতে থাকলে রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হবে। আর সেই সংকটের মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হবে পুরো সমাজকেই।

React:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Theme by Jhinai Technologies