স্টিফেন কলিনসন, সিনিয়র রিপোর্টার ,সিএনএন
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কৌশলে আবারও বড় পরিবর্তন আনছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার তাঁর অস্ত্র সরাসরি সামরিক হামলা নয়, বরং ইরানের অর্থনীতিকে এমনভাবে চাপে ফেলা, যাতে দেশটির সরকার শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়।
বুধবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে এমন একটি অর্থনৈতিক অভিযান চালানো হবে, যা তাঁর ভাষায়, “যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে নেওয়া সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ” হবে।
তবে ট্রাম্পের এই নতুন কৌশলকে অনেকেই আগের ব্যর্থতার পর একটি রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক পথ হিসেবে দেখছেন। কারণ, সামরিক হামলা চালিয়েও ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায়নি। আবার বিভিন্ন প্রণোদনা ও সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েও দেশটিকে পারমাণবিক আলোচনায় ফেরানো সম্ভব হয়নি।
এর মধ্যে ইরান যুদ্ধের গতিপথও বারবার বদলেছে। কয়েক মাসের এই সংঘাতে ওয়াশিংটনের অবস্থান একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় ট্রাম্প যুদ্ধকে প্রায় শেষ বলে ঘোষণা করেছিলেন। এখন সেই যুদ্ধ ষষ্ঠ মাসে গড়িয়েছে এবং নতুন করে অর্থনৈতিক যুদ্ধের দিকে মোড় নিচ্ছে।
ট্রাম্প ইতোমধ্যে ইরানের সঙ্গে সব ধরনের আলোচনা বন্ধ করেছেন। মার্কিন প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্রদের তিনি জানিয়েছেন, এখন তাঁর লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতিকে ভেঙে দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত তেহরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা।
বুধবার যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, “এই মুহূর্তে পরিস্থিতি খুবই ভালো।”
এর পর আরেকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে তিনি আরও কঠোর অবস্থানের কথা জানান। ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে টিকিয়ে রাখতে যেসব দেশ বা প্রতিষ্ঠান সহায়তা করছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
তাঁর লক্ষ্য ইরানের তেল পাচার, আর্থিক লেনদেন, নগদ অর্থ স্থানান্তর, মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান, জাহাজ নিবন্ধন এবং বিভিন্ন ভুয়া বা আড়াল করা কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালিত ব্যবসা বন্ধ করা।
অর্থাৎ শুধু ইরানকে নয়, ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাখা তৃতীয় দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকেও চাপের মুখে ফেলতে চায় ওয়াশিংটন।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই চাপ কি সত্যিই ইরানের শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে পারবে?
অনেক বিশ্লেষক এ বিষয়ে যথেষ্ট সন্দিহান। কারণ, ইরান বহু বছর ধরে বিশ্বের অন্যতম কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং সাধারণ মানুষের ওপর ব্যাপক চাপ সত্ত্বেও দেশটির শাসনব্যবস্থা টিকে আছে।
ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থায় দীর্ঘদিন কাজ করা ড্যানিয়েল সিত্রিনোভিচ মনে করেন, অর্থনৈতিক চাপ ইরানকে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে, কিন্তু তাতে দেশটির কৌশল বদলে যাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
তাঁর মতে, তেহরান যে চাপের মুখে আছে, তা স্পষ্ট। কিন্তু এই চাপের কারণে ইরানের নেতৃত্ব তাদের বর্তমান অবস্থান থেকে সরে আসবে, এমন কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
শুধু ইরানকে চাপ দিলেই হবে না
ট্রাম্পের পরিকল্পনা সফল করতে হলে প্রথমে তাঁকেই নিজের রাজনৈতিক ও কৌশলগত আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে।
ইরানের অর্থনীতি ধ্বংস করতে কয়েক সপ্তাহ নয়, বরং কয়েক মাস কিংবা কয়েক বছর পর্যন্ত ধারাবাহিক চাপ চালিয়ে যেতে হতে পারে। আর এখানেই ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
দীর্ঘমেয়াদি কোনো কৌশল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধৈর্য দেখানো ট্রাম্পের রাজনৈতিক চরিত্রের সঙ্গে খুব একটা মেলে না। ফলে ইরানও ধরে নিতে পারে, অর্থনৈতিক চাপ কার্যকর হওয়ার আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়তো তাঁর অবস্থান বদলে ফেলবেন।
এ ছাড়া শুধু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়েই ইরানকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হবে না। এর জন্য উপসাগরীয় দেশগুলো, ইউরোপ এবং এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বড় ধরনের কূটনৈতিক সমন্বয় প্রয়োজন।
বিশেষ করে ইরানের তেল বিক্রি, অর্থ স্থানান্তর এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে পরিচালিত বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে তার মিত্রদের সক্রিয়ভাবে পাশে পেতে হবে।
কিন্তু এখানেও ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে সমস্যা রয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্রই নিজেদের জাতীয় ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এই যুদ্ধে সরাসরি জড়াতে চায়নি। বরং ওয়াশিংটনের ওপরই তারা অসন্তুষ্ট হয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া ওমানকেও সম্প্রতি কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন ট্রাম্প। এমনকি ওমানের অবস্থান পরিবর্তন না হলে সামরিক হামলার হুমকিও দিয়েছেন তিনি।
ফলে ইরানকে সম্পূর্ণ অর্থনৈতিকভাবে অবরুদ্ধ করার মতো একটি আন্তর্জাতিক জোট গড়ে তোলা ট্রাম্পের জন্য সহজ হবে না।
চীনের প্রশ্নে বড় পরীক্ষা
ইরানের অর্থনীতিতে সত্যিকারের বড় ধাক্কা দিতে হলে চীনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।
চীন ইরানের তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা। তাই ইরানের অবৈধ বা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে পরিচালিত তেল বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত চীনা ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারলে তেহরানের ওপর চাপ অনেকটাই বাড়তে পারে।
এ ধরনের পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন হাডসন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো লুডোভিক হুড। তাঁর মতে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের অর্থের উৎস এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সহযোগী সশস্ত্র নেটওয়ার্কগুলোর ওপরও চাপ বাড়ানো দরকার।
ইরানের অর্থনৈতিক চাপকে আরও কার্যকর করতে ইরাক ও লেবাননের মতো দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক শক্তিশালী করার কথাও তিনি বলেছেন।
তাঁর ধারণা, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ ইরানে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াতে পারে, দেশ থেকে মূলধন বেরিয়ে যেতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে ইরানের শাসনব্যবস্থার ওপর চাপও বাড়তে পারে।
কিন্তু এখানেই ট্রাম্পের সামনে আরেকটি রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব।
ইরানের তেল বাণিজ্যে জড়িত চীনা ব্যাংকগুলোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর তার বড় প্রভাব পড়তে পারে। অথচ সেপ্টেম্বরেই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্রে স্বাগত জানানোর পরিকল্পনা রয়েছে ট্রাম্পের।
এমন গুরুত্বপূর্ণ সফরের ঠিক আগে বেইজিংয়ের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাতে জড়ানো ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে কতটা সুবিধাজনক হবে, সেটিই এখন প্রশ্ন।
ট্রাম্প কি শেষ পর্যন্ত এই পথে থাকবেন?
ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলার পরিকল্পনার সাফল্য শুধু ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে না। তেহরান কীভাবে পাল্টা জবাব দেবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ইরান জানে, যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন আর মাত্র দুই মাসের কিছু বেশি সময় দূরে। ফলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক দুর্বলতার জায়গাগুলোও তেহরানের অজানা নয়।
১৯৮০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে জিমি কার্টারের জন্য ইরানের জিম্মি সংকট যে রাজনৈতিক বিপর্যয় তৈরি করেছিল, সেই ইতিহাসও তেহরানের কাছে অচেনা নয়। ফলে এবারের যুদ্ধেও ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলার একটি সুযোগ ইরান দেখতে পারে।
এর একটি বড় ক্ষেত্র হতে পারে হরমুজ প্রণালি।
এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়তে পারে। জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর।
অর্থাৎ ইরান যদি নতুন করে জাহাজে হামলা চালায় কিংবা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আরও ব্যাহত করে, তাহলে ট্রাম্প কঠিন এক পরিস্থিতিতে পড়বেন।
তিনি যদি সামরিক জবাব দেন, তাহলে যুদ্ধ আরও বাড়বে। আর যদি জবাব না দেন, তাহলে তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীরা তাঁকে দুর্বল হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পাবে।
এর প্রভাব পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও। জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়লে যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান জেমস ওয়াকিনশ বলেছেন, তিনি ইরানের সঙ্গে এমন অর্থনৈতিক যুদ্ধে যেতে চান না, যেখানে শেষ পর্যন্ত এর মূল্য দিতে হবে মার্কিন জনগণকে—পেট্রল পাম্পে বেশি দাম দিয়ে এবং বাজারে বেশি দামে পণ্য কিনে।
শেষ পর্যন্ত কার ধৈর্য আগে ফুরাবে?
ট্রাম্পের নতুন অর্থনৈতিক যুদ্ধের পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত এর সময়কাল।
ইরানের অর্থনীতি দুর্বল করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যাতে তার রাজনৈতিক নেতৃত্ব আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়, সেটি দীর্ঘ ও অনিশ্চিত প্রক্রিয়া।
ইরান ইতোমধ্যেই দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করে টিকে থাকার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল বিক্রি, বিকল্প বাণিজ্যপথ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করার নিজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে দেশটি।
অন্যদিকে ট্রাম্পের সামনে রয়েছে মার্কিন জনগণের ধৈর্য, তেলের দাম, আন্তর্জাতিক মিত্রদের অবস্থান এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন।
তাই এখন প্রশ্নটা শুধু ইরানের অর্থনীতি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা নয়।
মূল প্রশ্ন হলো, ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আগে নাকি আমেরিকান জনগণের যুদ্ধ সহ্য করার ক্ষমতা শেষ হয়ে যাবে?
ট্রাম্পের সামনে এখন সেই পুরোনো রাজনৈতিক ফাঁদই নতুন রূপে ফিরে এসেছে। অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু সেই যুদ্ধের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য বহন করে শেষ পর্যন্ত একই অবস্থানে অটল থাকা কতটা সম্ভব, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
*সিএনএন থেকে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা মডেল ব্যবহার করে বাংলায় রুপান্তরিত।




