চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ায় নিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধে পাঠানো হয়েছিল ৩০ বাংলাদেশি যুবককে। তাঁদের মধ্যে ২০ জন নিহত হয়েছেন। যুদ্ধের গুরুতর ক্ষত নিয়ে দেশে ফিরেছেন আরও দুজন। স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) তদন্তে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে এসআরবি জানায়, জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনাল, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওই ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। এ ঘটনায় জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মিজানুর রহমান ও আবু তাহের লেন্টু নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের বেশির ভাগই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। বিদেশে যাওয়ার জন্য তাঁরা বিভিন্নভাবে ঋণ করেছিলেন।
এ ঘটনায় মানব পাচারচক্রের অন্য কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে এসআরবি।
নির্মাণশ্রমিকের চাকরির কথা বলে প্রতারণা
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চলতি বছরের ৭ মে তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩০ বাংলাদেশি ‘ওয়ার্ক পারমিট ভিসা’ নিয়ে রাশিয়ায় যান। তাঁদের বলা হয়েছিল, সেখানে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতে হবে। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁদের আটকে রাখা হয়।
প্রথমে স্থানীয় একটি হোটেলে তাঁদের রাখা হয়। এ সময় পাসপোর্ট, মুঠোফোনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কেড়ে নেওয়া হয়। পরে তাঁদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
এরপর ভুক্তভোগীরা বুঝতে পারেন, তাঁরা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। মুক্তির জন্য আকুতি-মিনতি করেও লাভ হয়নি। মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
আসাদুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ থেকে যাঁদের নেওয়া হয়েছিল, তাঁদের কারও যুদ্ধ করার মতো শারীরিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ কিংবা কৌশলগত প্রস্তুতি ছিল না। এরপরও স্বল্প সময়ের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের সম্মুখযুদ্ধে পাঠানো হয়।
প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্তে ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহারের সন্দেহ
এসআরবির কর্মকর্তাদের ধারণা, বাংলাদেশি যুবকদের রাশিয়ার সেনাবাহিনী প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার কাজে একধরনের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করে থাকতে পারে।
আসাদুজ্জামান বলেন, প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, তাঁদের ওপর ড্রোন হামলা হলে সেই হামলার মাধ্যমে প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হতো।
তবে এ বিষয়ে তদন্তের সব তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
প্রথম দিনেই নিহত ১৭ জন
এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক আসাদুজ্জামান জানান, যুদ্ধক্ষেত্রে ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে ২০ জন নিহত হয়েছেন। দেশে ফিরে আসা দুজনের নাম রাজন ও আদনান। তাঁরা দুজনই গুরুতর আহত ও মুমূর্ষু অবস্থায় বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে দেশে ফেরেন।
ফিরে আসা রাজনের কাছ থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের মোতায়েন ও হতাহতের বিষয়ে তথ্য পেয়েছে এসআরবি। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জনকে যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখ, মধ্য ও পেছনের অংশে তিন ভাগে মোতায়েন করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে সম্মুখভাগে ১৬ জন, মধ্যভাগে ছয়জন এবং পেছনের অংশে আটজন ছিলেন।
রাজনের তথ্য অনুযায়ী, ড্রোন হামলায় সম্মুখভাগের ১২ জন, মধ্যভাগের চারজন এবং পেছনের অংশের চারজন নিহত হন। যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে আরও তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২০ জনে।
হামাগুড়ি দিয়ে চার কিলোমিটার পাড়ি
সংবাদ সম্মেলনে রাজনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন আসাদুজ্জামান। তিনি জানান, যুদ্ধক্ষেত্রে রাজনের পিঠের ওপর ড্রোন আছড়ে পড়ায় তাঁর কোমর ভেঙে যায়। একপর্যায়ে কোমরের নিচের অংশ অবশ হয়ে আসতে থাকে।
তখন পাশের একজনের ওয়াকিটকি ব্যবহার করে তাঁকে উদ্ধারের অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু সেখান থেকে তাঁকে উদ্ধার করার কোনো উপায় নেই বলে জবাব দেওয়া হয়।
পরে বুকের ওপর ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার দূরের একটি ক্যাম্পে হামাগুড়ি দিয়ে পৌঁছান রাজন। বর্তমানে তাঁকে ক্রাচের সাহায্যে হাঁটতে হচ্ছে।
মানব পাচারচক্রের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখছে এসআরবি
চাকরির আশ্বাস দিয়ে বিদেশে নিয়ে গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর ঘটনায় মানব পাচারের অভিযোগ সামনে এসেছে। বিদেশে কাজের আশায় যাওয়া এসব যুবকের পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা ও ঋণগ্রস্ততার তথ্যও উঠে এসেছে তদন্তে।
এসআরবি জানিয়েছে, তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশিদের রাশিয়ায় পাঠানোর ঘটনায় অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং দেশে ফিরে আসা ভুক্তভোগীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে ঘটনার আরও তথ্য জানার চেষ্টা চলছে।




